রোববার, ২৪ অক্টোবর ২০২১

সেকশন

 

জঙ্গি শায়খ আবদুর রহমান ধরা পড়ার পর স্ত্রীর প্রশ্ন

আষাঢ়ে নয়

কই শহীদ হলেন না যে

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২১, ১১:০২

শায়খ আবদুর রহমান দুই মাস ধরে চলছিল চোর-পুলিশ খেলা। জেএমবির প্রধান শায়খ আবদুর রহমান তাঁর স্ত্রী আর চার সন্তানকে নিয়ে দিব্যি এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু বাঘা বাঘা গোয়েন্দা তাঁর টিকিটিও ছুঁতে পারছিলেন না। অথচ আবদুর রহমানকে ধরা না গেলে জেএমবিকে কোনোভাবে বাগে আনা যাবে না।

টানেলের মুখে আলোর দেখা মেলে ২০০৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর সকালে। ঢাকার তেজগাঁও পলিটেকনিকের হোস্টেল থেকে গ্রেপ্তার হন আবদুর রহমানের আপন ভাই, জেএমবির সামরিক প্রধান আতাউর রহমান সানি। সানিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পাওয়া যায় সেই গুরুত্বপূর্ণ ক্লু—জেএমবির মজলিশে শুরার সদস্য হাফেজ মাহমুদ জানেন আবদুর রহমান কোথায় আছেন। ব্যস, শুরু হয়ে যায় হাফেজ মাহমুদকে পাকড়াওয়ের অভিযান। টানা দুই মাস চেষ্টার পর র‍্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান লে. কর্নেল গুলজার উদ্দিনের পাতা ফাঁদে পা দেন হাফেজ মাহমুদ। তাঁকে ধরা হয় ২০০৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পাঠাগার থেকে।

শুরু হয় ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ। কিন্তু হাফেজ অটল। শায়খ রহমানের অবস্থান কিছুতেই বলবেন না। একপর্যায়ে শায়খের ফোন নম্বর জানাতে রাজি হন। র‍্যাবের আইটি শাখার মেজর জোহা খোঁজ নেন, নম্বরটি সিলেটের এমসি কলেজ টাওয়ারের আওতায়। শুরু হয়ে গেল জেএমবির প্রধান শায়খ আবদুর রহমানকে পাকড়াওয়ের অভিযান। মঙ্গলবার, বেলা পড়তে না পড়তেই ১০-১২টি গাড়ির বহর পথের লোকজনকে দু-পাশে সরিয়ে দিয়ে ঝড়ের গতিতে ছুটতে থাকে সিলেট হাইওয়ে ধরে। গাড়ি থেকে কর্নেল গুলজার আমাকে ফোন করেন। চেনা আওয়াজ : ‘ওস্তাদ, ব্যাগ রেডি করেন। বড় কিছু হবে।’ যেকোনো বড় খবরে এভাবেই তিনি আগাম ক্লু দিয়ে রাখতেন। তাঁর ফোন পেয়ে তৈরি হয়ে থাকি। নতুন অভিযান, নতুন খবরের প্রত্যাশা।

তার আগে বলে রাখি, এই ভয়ংকর জঙ্গি নেতাকে ধরার অভিযানটি ছিল শ্বাসরুদ্ধকর। অভিযানের আগেও ছিল দীর্ঘ গোয়েন্দা তৎপরতা। গোয়েন্দাকাহিনির মতোই সেই অভিযানের পরতে পরতে ছিল চমকপ্রদ সব তথ্য। তবে সেই সব কাহিনি বলার আগে শায়খ আবদুর রহমানের ব্যক্তিগত তথ্যটা একটু ঝালিয়ে নিতে পারি।

মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের মূলনীতি ও ধর্মপ্রচার বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া শায়খ আবদুর রহমানের দিনকাল ভালোই চলছিল। ব্যবসাও করছিলেন বেশ। ১৯৯৮ সালে রিভাইভাল অব ইসলামিক হেরিটেজ সোসাইটির পরিচালক আকরামুজ্জামানের সঙ্গে আলাপের পর তিনি তথাকথিত জিহাদের স্বপ্ন দেখেন। এ জন্য পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার নেতা আবদুল করিম টুন্ডার সঙ্গেও বৈঠক করেন। এরপর ১৯৯৮ সালের এপ্রিলে ছয় সঙ্গী নিয়ে গঠন করেন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ—জেএমবি। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট একযোগে সারা দেশের ৬৩ জেলায় বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় জেএমবি। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৬টি হামলায় তাদের হাতে ৭৩ জন নিহত আর আহত হয় প্রায় ৮০০ লোক। পরে দেশ-বিদেশের চাপে চারদলীয় জোট সরকার জেএমবিকে নিষিদ্ধ করে।

 এবার অভিযানে ফিরে আসি। সিলেটে ততক্ষণে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। র‍্যাব-৯-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মোমিন সদর দপ্তরের নির্দেশ পেয়ে এমসি কলেজ টাওয়ারের আওতায় ৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা ঘিরে ফেলছেন। লে. কর্নেল গুলজারের নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের দলটি সিলেটে পৌঁছায় ২৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাত ৮টায়। মেজর আতিক, মেজর মানিক, মেজর জাভেদ, মেজর ওয়াসি, ক্যাপ্টেন তানভির ও ক্যাপ্টেন তোফাজ্জলের মতো একঝাঁক সাহসী অফিসার সেই দলে। সবার হাতে ভারী অস্ত্র, যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি সবাই।

র‍্যাবের আড়াই শ সদস্য সিলেট নগরীর টিলাগড় ও শিবগঞ্জ এলাকার ৮ বর্গকিলোমিটারের প্রতিটি সড়ক ও অলিগলিতে অবস্থান নেন। রাত ১০টা থেকে শুরু হয় বাড়ি বাড়ি চিরুনি তল্লাশি। কোনো কিছুই যেন তল্লাশি থেকে বাদ না পড়ে। আস্তে আস্তে তল্লাশির পরিধি কমিয়ে এনে টিলাগড়, শাপলাবাগ, কল্যাণপুর, কালশি ও বাজপাড়া এলাকায় কেন্দ্রীভূত করা হয়।

সবার হাতে হাতে শায়খ রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের ছবিসংবলিত লিফলেট। রাত ১২টার দিকে সিলেট নগরী থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে টুলটিকর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব শাপলাবাগ আবাসিক এলাকায় আবদুস সালাম সড়কের ২২ নম্বর বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে প্রথম বাধা পায় র‍্যাব। এক ব্যক্তি ছুরি হাতে তেড়ে এসে বলে : ‘এগোলে খারাপ হবে।’ এরপর যা বোঝার বুঝে যায় সবাই। অভিযান তখন কেন্দ্রীভূত হয় এই বাড়ি ঘিরে। বাড়ির নাম ‘সূর্য্য দীঘল বাড়ী’।

দ্রুত বাড়িটি ঘিরে ফেলা হয়। আশপাশের বাড়িতেও অবস্থান নেন অনেকে। নিয়ে আসা হয় ভারী অস্ত্র ও লাইফ সাপোর্ট জ্যাকেট। রাত পৌনে ১টার দিকে মাইকে সূর্য্য দীঘল বাড়ীর লোকজনকে বেরিয়ে আসতে বললেও কেউ সাড়া দেয় না। তাদের নীরবতায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। আশপাশের বাড়ির লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়। রাত দেড়টার দিকে বাড়ির মালিক লন্ডনপ্রবাসী আবদুল হকের ছোট ভাই মইনুল হককে বাইরে থেকে ডেকে আনা হয়। তিনি মুখে মাইক লাগিয়ে ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া হৃদয়ের নাম ধরে ডেকে দরজা খুলতে বলেন। তাতেও কাজ হয় না। এরপর স্থানীয় ইউপি সদস্য নূরুন নবীকে দিয়ে ডাকানো হয়; কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না।

রাত ২টার দিকে একবার বাড়ির পেছনে দরজা খোলার শব্দ হয়। র‍্যাব সদস্যরা সচকিত হয়ে ওঠেন। সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধও হয়ে যায়। রাত ২টা ১০ মিনিটে হঠাৎ করে বাড়ির ভেতর থেকে একজন বয়স্ক মানুষ ভারী গলায় দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করেন। কর্নেল গুলজার তখন ডাক দেন : ‘আবদুর রহমান বেরিয়ে আসুন।’ বাড়ির ভেতর থেকে ভারী গলার আওয়াজ : ‘ওই কাফের! তোর মুখে আমার নাম মানায় না, আমাকে মুজাহিদ বল।’

বুঝতে বাকি থাকে না, এটাই শায়খ আবদুর রহমানের কণ্ঠ। শেষ হয় প্রথম রাত। পরদিন বুধবার সকাল থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় দফার চেষ্টা। আবার রাত আসে। কথা বললেও আত্মসমর্পণে রাজি হন না শায়খ রহমান। ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটে গেছে। সকাল ৯টা ৭ মিনিটে বাড়ির ভেতরে হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পরপর চার-পাঁচটা বিস্ফোরণ ঘটে। দ্রুত নিয়ে আসা হয় দালান ভাঙার যন্ত্রপাতি। সাড়ে ৯টার দিকে ভাঙা হয় দক্ষিণের একটি জানালা। বৈদ্যুতিক কাটার এনে ছাদ ফুটো করা হয়। প্রথমে আয়না লাগিয়ে, পরে রশি দিয়ে ক্যামেরা নামিয়ে দেখা হয়—ভেতরে কী আছে। দেখা যায়, একটা বিছানা থেকে তার বেরিয়ে আছে। শুরু হয় হইচই—নিশ্চয়ই সারা বাড়িতে বোমা পাতা আছে। বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা নিয়ে আসেন বড় বড় বড়শি। ফুটো দিয়ে নামিয়ে বিছানা টেনে তুলে দেখেন, সব ভুয়া যন্ত্রপাতিতে সাজানো।

দুপুরের দিকে একের পর এক কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয় বাড়ির ভেতরে। সেই গ্যাসে টিকতে না পেরে বেরিয়ে আসেন শায়খের স্ত্রী নূরজাহান বেগম রূপা, ছেলে নাবিল (১৬), মাহমুদ (১৩), ফুয়াদ (১০) ও দেড় বছরের আহাম্মদ। সিলেটের তখনকার জেলা প্রশাসক এম ফয়সল আলম শায়খের স্ত্রীকে বলেন, ‘আপনি আপনার স্বামীকে বেরিয়ে আসতে বলেন।’ রূপা বলেন, ‘আমার কথা তিনি শুনবেন না। আসলে উনি কারও কথা শোনেন না।’ জেলা প্রশাসক পীড়াপীড়ি করেন। এবার শায়খের স্ত্রী মুখে মাইক লাগিয়ে বলেন: ‘শুনছেন, ওনারা আপনাকে বের হতে বলছেন, আপনি বের হয়ে আসেন।’ স্ত্রীর কথায়ও কান দেন না শায়খ।

আবার রাত আসে। হঠাৎ শোরগোল পড়ে যায়। চারদিকে আতরের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। একজন র‍্যাব সদস্য সে খবর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানান। তিনি জানান তাঁর ঊর্ধ্বতনকে। সন্দেহ জাগে—শায়খ কি তবে আতর-গোলাপ মেখে আত্মঘাতী হলেন? আলোচনা শুরু হয়, অভিযান ব্যর্থ হবে? শুরু হয় গন্ধের উৎস খোঁজা। দেখা যায়, সিলেটের এক ফটোসাংবাদিকের কানে আতরমাখা তুলা গুঁজে রাখা। হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন সবাই। ২০০৬ সালের ২ মার্চ বৃহস্পতিবার সকালে সিলেটের জেলা প্রশাসক চূড়ান্ত হুমকির সুরে কঠোর সিদ্ধান্তের কথা জানান। এখনই বের না হলে অভিযান হবে। এরপর জানালায় এসে উঁকি দেন শায়খ রহমান। উপায় না দেখে হাত উঁচু করে বেরিয়ে আসেন।

শায়খের স্ত্রীকে জানানো হয়, আপনার স্বামী বের হয়ে এসেছেন। স্ত্রী অবাক চোখে তাকিয়ে বলেন : ‘উনি না শহীদ হতে চেয়েছিলেন! কই শহীদ হলেন না যে!’ আবদুর রহমান তাঁর জবানবন্দিতে সে কথার জবাব দেন। বলেছিলেন, তাঁর পরিকল্পনা ছিল একটি বোমা দিয়ে দুই সঙ্গীসহ আত্মঘাতী (ফেদায়ি) হবেন। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের ছোড়া পানিতে সেই বোমা ভিজে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। শেষমেশ বিচারে ফাঁসিতেই প্রাণ দেন শায়খ আবদুর রহমান।

 আরও পড়ুন:

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

    মামলা নিষ্পত্তিতে দেরি হলে খরচ ও জট বাড়ে: প্রধান বিচারপতি 

    সাম্প্রতিক ইস্যুতে সরকারের পদক্ষেপকে ‘অত্যন্ত উত্তম’ বলেছে ভারত: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

    চলতি অক্টোবরে ডেঙ্গু রোগী ছাড়াল ৪ হাজার

    রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত গেলেন নৌবাহিনী প্রধান

    শাহবাগে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের গণ অবস্থান, বিশেষ ট্রাইব্যুনালসহ ৮ দফা দাবি

    কুমিল্লার ঘটনার বিচার ট্রাইব্যুনালে হবে: আইনমন্ত্রী

    মুছে যাক চোখের কোণের দাগ

    মান্নার কান্না

    মাস্টার আপা

    বান্টু তুমি এত কলা খাচ্ছ কেন?

    খুনের নেপথ্যে মাদ্রাসা দখল

    ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা

    রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৬ খুনের ঘটনায় উখিয়া থানায় মামলা