Ajker Patrika

পারমাণবিক নাকি মানবিক?

মইনুল হাসান 
আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২২, ১২: ৪৯
পারমাণবিক নাকি মানবিক?

পরাশক্তি রাশিয়া ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সৈন্য, ১ হাজার ২০০ ট্যাংক, ২০০ যুদ্ধবিমান, অসংখ্য সাঁজোয়া গাড়ি এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে দুর্বল প্রতিবেশী, স্বাধীন দেশ ইউক্রেনে আগ্রাসন চালিয়েছে। আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ড. আশরাফ গনির মতো সবাইকে অন্ধকারে রেখে রাতের অন্ধকারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পালিয়ে যাননি; বরং যুদ্ধের মাঠে থেকেই এমন ক্রান্তিকালে নিজ দেশের সেনাবাহিনী এবং জনগণকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, পথ দেখাচ্ছেন। বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক, নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ের জন্য প্রাণপাত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বলা চলে তিনি অনেকটাই সফল হয়েছেন। ঠেকিয়ে দিয়েছেন রাশিয়ার অগ্রযাত্রা। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন দুই দিনের মধ্যে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখলের পরিকল্পনা করেছিলেন।

অথচ যুদ্ধ শুরুর পরে মাস অতিক্রান্ত হলেও ইউক্রেনীয় বাহিনীর অপ্রত্যাশিত, তীব্র প্রতিরোধের কারণে পরাশক্তি রাশিয়া এখন পর্যন্ত ইউক্রেনকে বাগে আনতে সমর্থ হয়নি। খুব অল্প সময়ে ইউক্রেনের দখল নিতে এবং সেখানে একটি অনুগত পুতুল সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে পুতিন যে পরিকল্পনা করেছিলেন, আপাতত সেই পরিকল্পনা সফল হচ্ছে না। যুদ্ধে দেশটির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাঁজোয়া যান ও সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে। সঠিক সংখ্যা না জানা গেলেও, যুদ্ধে প্রাণহানি ঘটেছে বিপুলসংখ্যক রাশিয়ান সৈন্যের। তা ছাড়া, পারমাণবিক অস্ত্রে হাত রেখে ইউক্রেন দখলে নিলে দ্বিধাগ্রস্ত এবং বিভক্ত পশ্চিমা দেশগুলো তেমন উচ্চবাচ্য করবে না—পুতিনের এমন ধারণাও মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। সর্বাত্মক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা মাথায় নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া রাশিয়ার পক্ষে এখন অনেকটাই অসাধ্যসাধনের মতো হয়ে উঠছে। এ সময়ে চীন ও ভারত যতটা এগিয়ে আসবে বলে ভাবা হয়েছিল, তা হয়নি। মুষ্টিমেয় কিছু স্বৈরশাসকের বলয়ে খানিকটা প্রশ্রয় পেলেও কূটনীতির মারপ্যাঁচে পুতিন এখন অনেক বেশি একা এবং বিচ্ছিন্ন। রাজনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পুতিন একটি দীর্ঘস্থায়ী, বিশাল ব্যয়বহুল ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন।

পরিকল্পনামাফিক কাজ না হওয়ায়, রাশিয়ান সেনারা ইতিমধ্যে ব্যবহার করেছে ভ্যাকুয়াম বোমা বা থার্মোবারিক ও ‘কিনঝাল’ নামের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ দ্রুতগতিতে ছুটতে পারে এবং ১ হাজার ২০০ মাইলের মধ্যে লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল আঘাত হানতে পারে। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেটাকে আটকাতে পারে না। পুতিন এই ক্ষেপণাস্ত্রকে ‘মোক্ষম অস্ত্র’ বলে অভিহিত করছেন। মস্কোভিত্তিক সামরিক বিশেষজ্ঞ ভ্যাসিলি কাশিন জানিয়েছেন, বিশ্বে এই প্রথম কোনো যুদ্ধে হাইপারসনিক অস্ত্র ব্যবহার করা হলো। অর্থাৎ ইউক্রেনকে বাগে আনতে ব্যবহার করতে হচ্ছে এমন সব ভয়ংকর ‘মোক্ষম অস্ত্র’।

পুতিন যত সহজে যুদ্ধ শুরু করেছেন, ততটা সহজে তিনি তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। যতই দিন যাবে, যুদ্ধের উত্তাপ পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে নিজের ঘরেও পৌঁছে যাবে। পুতিনের তা বুঝতে না পারার কথা নয়। সে কারণেই তিনি বিশ্বকে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দেখিয়েছে। গত বছরের ২১ নভেম্বর ভূপৃষ্ঠ থেকে ৫০০ কিলোমিটার, অর্থাৎ প্রায় ৩১১ মাইল ঊর্ধ্বে, পৃথিবীর কক্ষপথে তাদের নিজেদের একটি পুরোনো কৃত্রিম উপগ্রহ কসমস ১৪০৮-কে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। রাশিয়া জানিয়ে দিয়েছে, তাদের হাতে কৃত্রিম উপগ্রহ বিধ্বংসী অস্ত্রও রয়েছে।

ইউক্রেনে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা সে দেশে অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যসহ সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য ও প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে পশ্চিমাদের সঙ্গে এক হয়ে আরও অনেকগুলো দেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এমনকি ন্যাটোর সদস্য নয়, এমন দেশগুলোর মধ্যে সুইডেন ও ফিনল্যান্ডও ইউক্রেনে সামরিক এবং অর্থ সাহায্য পাঠিয়েছে। জাপান, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াও পুতিনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এখানেই ঘটেছে বিপত্তি। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ইতিমধ্যে কোটি মানুষ ঘর ছেড়েছে। মানবিক বিপর্যয় এখন চরমে পৌঁছে যাচ্ছে।

পুতিন এখন কী করবেন? যুদ্ধ যতই দীর্ঘায়িত হবে, পুতিন ততই বিজয়ী হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবেন। আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে, নিষিদ্ধ অস্ত্র, বিশেষ করে রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র ব্যবহার করতেও দ্বিধা করবেন না। বিশ্বের সর্ববৃহৎ পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত রয়েছে রাশিয়ার হাতে। এর আগে ২০১৮ সালের এক তথ্যচিত্রে পুতিন আস্ফালন করেছিলেন, ‘যদি কেউ রাশিয়াকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়, আমাদের জবাব দেওয়ার আইনি অধিকার রয়েছে। আর এমনটা হলে বিশ্ব ও মানবতার জন্য বিপর্যয় নেমে আসবে।’

পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আগে পুতিনের হাতে অন্য যে বিকল্প আছে, তা হলো সর্বাত্মক সাইবার আক্রমণ এবং বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া। সাগর, মহাসাগরের তলদেশ দিয়ে ৪৪০টি ভিন্ন ভিন্ন সংযোগ বিশ্বকে ঘিরে রেখেছে দীর্ঘ ১৩ লাখ কিমি বা ৮ লাখ মাইল অপটিক্যাল কেব্‌ল। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বের প্রায় তিন গুণ দীর্ঘ এই অপটিক্যাল তারের পুরোটাই প্রায় অরক্ষিত। সংযোগ ছিন্ন করে দিলে ব্যবসা, বাণিজ্য, লেনদেন, ই-মেইল, ইত্যাদি সব ধরনের যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটবে। সাগরের তলদেশ ছাড়িয়ে যুদ্ধ বিস্তৃত হতে পারে মহাশূন্যে। কৃত্রিম উপগ্রহ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র গর্জে উঠতে পারে। আর রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, অস্তিত্বের হুমকিতে পড়লে তাঁর দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারে পিছপা হবে না। সমস্যা হচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া যে অস্তিত্বের সংকট এড়াতে সক্ষম হবে, সেই সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

আর তাই প্রশ্ন উঠেছে, পরাশক্তিগুলো কি পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? পারমাণবিক যুদ্ধ মানেই তৃতীয় এবং শেষ মহাযুদ্ধ। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।

আজ যেসব পরাশক্তি পুতিনকে যে অভিযোগে অভিযুক্ত করছে, তাদের নিজেদের চেহারাটি একবার হলেও আয়নায় দেখা উচিত। তারাও বহুবার আন্তর্জাতিক আইনের নগ্ন বরখেলাপ করে মানবতাকে পদদলিত করেছে। তাদের হাতেও রক্ত লেগে আছে। আজ বিশ্বকে এমন ভয়াবহ যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে তাদের দায় কম নয়। পুতিনকে কোণঠাসা করেই তাদের দায়মুক্তি ঘটবে না এবং বিশ্বশান্তি স্থায়ী হবে না। মানবতাকে খণ্ডিত করা যাবে না। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের আন্তরিক হতে হবে, পৃথিবী এবং পৃথিবীর মানুষকে বাঁচাতে হলে পারমাণবিক নয়, হতে হবে মানবিক।

মইনুল হাসান, ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ঢাবি ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার, শিক্ষক ও বন্ধু পুলিশ হেফাজতে

যুক্তরাষ্ট্রে ২ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার কে এই হিশাম আবুঘারবিয়েহ

হোয়াইট হাউসের ডিনারে হামলা: মেধাবী প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক অ্যালেন কেন অস্ত্র তুলে নিলেন

ট্রাম্পের অনুষ্ঠানে গুলি: আটক যুবক সম্পর্কে যা জানা গেল

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পর্যালোচনার আড়ালে ঢাকাকে কী বার্তা দিল দিল্লি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত