Alexa
সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১

সেকশন

 

প্যাঁচের পাঁচালিতে মসলা

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২১, ১০:০০

মাংসের বিশেষ পদ তৈরি করতে কিছু বিশিষ্ট মসলাপাতির ব্যবহার রয়েছে, যেগুলোর ফ্লেভার সম্পর্কে সবারই আগ্রহ রয়েছে। ছবি: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান পৃথিবীর কোনো কিছুই সোজা নয়। সবকিছুতেই আছে প্যাঁচ। প্যাঁচ আছে বলেই তার পাঁচালি আছে। পাঁচালি আছে বলেই না ঘ্রাণটা ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। থাক অত কথা আর না বলি। বলি কী, এই কোরবানির পশুর মাংস রান্না করতে, কাবাব বানাতে যে জিনিসটি আগে দরকার সেটি কী, জানেন? মসলা। 

জিরার সুগন্ধ না এলে যেন মাংসের পদ পরিপূর্ণতাই পায় না। ছবি: উইকিপিডিয়া আদা–রসুন–পেঁয়াজ বাটা, কুচি করা পেঁয়াজ, হলুদ–মরিচ–জিরা–ধনে, আস্ত এলাচি, দারুচিনি, তেজপাতা—এই আটপৌরে মাংসের মসলাগুলোর স্বাদ, গন্ধ, আর ব্যবহারের উপযোগিতা আমরা সবাই কম–বেশি জানি। কিন্তু মাংসের বিশেষ পদ তৈরি করতে কিছু বিশিষ্ট মসলাপাতির ব্যবহার রয়েছে, যেগুলোর ফ্লেভার সম্পর্কে সবারই আগ্রহ রয়েছে। বিশেষত স্কুলে পড়া বাংলা ব্যাকরণের প্রায় সমোচ্চারিত শব্দগুলোর মতো কিছু মসলা স্বাদ,  গন্ধের দিক থেকে খুবই কাছাকাছি; অথচ একেবারেই আলাদা। সাধে কী আর বলেছিলাম, প্যাঁচ সবখানে আছে। যেমন ধরুন, পেঁয়াজ কুচি করে দিলে এক স্বাদ আবার একটা পেঁয়াজ চার ভাগ করে দিলে পাবেন আরেক স্বাদ। রসুনও গোটা কোয়ার এক স্বাদ, তো একটু থেঁতলে দিলে সেটা বদলে যাবে। সব মসলারই তাই। 

শাহিজিরা দুনিয়ার সবচেয়ে দামি ও দুষ্প্রাপ্য মসলাগুলোর একটি। ছবি: উইকিপিডিয়া জিরা, শাহিজিরা, কালো জিরা আর মিষ্টিজিরা (মৌরি) 
আমাদের দেশের রান্নায় জিরার সুগন্ধ না এলে যেন মাংসের পদ পরিপূর্ণতাই পায় না।  বীজ জাতীয় মসলা জিরা (cumin) কিন্তু যুগ যুগ ধরে প্রাচীন মিসর, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও আরব দেশগুলোতেও খুব গুরুত্বপূর্ণ মাংস রান্নার জন্য। এর এক ধরনের সোঁদা-মেটে ফ্লেভার আছে, যা মাংসের সঙ্গে খুব সুন্দরভাবে খাপ খেয়ে যায়। আমাদের কোর্মা, রেজালা, ঝাল করে রাঁধা মাংস, কাবাব—সবকিছুতেই জিরার উষ্ণ স্বাদ অপরিহার্য। আবার বিরিয়ানি মসলাতেও জিরা থাকবেই। আস্ত জিরার ফোড়নে মাংসের ঝাল ফ্রাই, কড়াই, দোপিঁয়াজা অন্য মাত্রা পায়। আবার অন্য সব মসলার সঙ্গে জিরা বাটায় কষিয়েই মাংসের ভুনা, কষা, ঝোলের পদ জমে ভালো।  এদিকে, টালা বা ভাজা জিরা শেষে ছড়িয়ে মাংসের পদে আনা যায় অনন্য স্বাদ–গন্ধ। বিশেষত খাসি বা ভেড়ার মাংসে এভাবে জিরার ব্যবহার জরুরি। 

কালোজিরা। ছবি: উইকিপিডিয়া অন্যদিকে শাহিজিরা বা caraway seeds দুনিয়ার সবচেয়ে দামি ও দুষ্প্রাপ্য মসলাগুলোর একটি। এটি জিরার চেয়ে কালচে,  সরু,  মসৃণ একটু বাঁকানো আকৃতির।  শাহিজিরা সাধারণত মাংসের পদে আস্ত ফোড়নে বা বিরিয়ানির চাল ভাপাতে বেশি ব্যবহার হয়।  আমাদের দেশি রোস্ট, রেজালা, কালিয়া আর কড়াই মাংসেও আস্ত শাহিজিরা ব্যবহার হয়। বেশি দিলে তিতকুটে লাগবে বলে গুঁড়ো শাহিজিরা আবার খুব অল্প পরিমাণে দেওয়া হয় অনেক ইউরোপীয় মাংস রান্নায়। এর উদাহরণ বিফ গোলাশ।  এদিকে কিছু কাবাব মসলায় খুব অল্প পরিমাণে শাহিজিরা গুঁড়া দেওয়া হয়। কারণ, বেশি দিলে এর মুলেথি বা লিকরিশ। এর মতো কড়া ফ্লেভার আর কোনো মসলার গন্ধই পাওয়া যাবে না। 

কালো জিরা আর কালিজিরা কিন্তু একেবারেই আলাদা। ছবি: উইকিপিডিয়া কালো জিরা আর কালিজিরা কিন্তু একেবারেই আলাদা। কালো রঙের জিরায় অনেক সময় সাধারণ জিরা মিশিয়ে ব্যবহার করা হয় ইউরোপের কোনো কোনো দেশে ও তুর্কিস্তানে। সেখানে আমাদের চিরচেনা জিরাকে রোমান কিউমিন বলে। এই কালো রঙের জিরার স্বাদ–গন্ধ জিরার মতোই; তবে কিছুটা মৃদু। 

মিষ্টি জিরা নাম দেওয়া হলেও মৌরি একেবারেই আলাদা জগতের মসলা। ছবি: উইকিপিডিয়া জিরার মতো দেখতে বলে মিষ্টি জিরা নাম দেওয়া হলেও মৌরি (Fennel seeds) একেবারেই আলাদা জগতের মসলা। মৌরির বীজে এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ আছে। স্বাদও মিঠে ধাঁচের।  আস্ত মৌরির মুখশুদ্ধি হিসেবে যেমন ব্যবহার আছে, তেমনি মালপোয়া বা অন্যান্য মিষ্টান্নে এর তুলনাহীন স্বাদ–গন্ধ মন কেড়ে নেয়। চাইনিজ ফাইভ স্পাইসে যেমন মৌরি গুঁড়া আছে, তেমনি এর আস্ত ব্যবহার হয় পাঁচফোড়নে। তাই মাংসের চাইনিজ পদ বা আচারী মাংসে এই মসলা দিতে হয়। খাসির গেলাসি হোক আর গরুর মেজবানি রান্না—মৌরি বাটা লাগবেই। 

ছোট, সবুজ, ফলসুলভ গন্ধের এলাচি তার সুবাসের জন্য বিখ্যাত। ছবি: উইকিপিডিয়া এলাচি আর বড় এলাচ
ছোট, সবুজ, ফলসুলভ গন্ধের এলাচি তার সুবাসের জন্য বিখ্যাত পৃথিবীর সবখানে।  সব ধরনের মিষ্টান্ন ছাড়াও মাংসের যেকোনো পদেই ছোট এলাচি দিতে হয়।  গরম মসলা, কাবাব মসলা বা বিরিয়ানি মসলার ভিত্তি যে ক’টি মসলা, তার একটি এই এলাচি। কোর্মার প্রধান ফ্লেভারটিই এই এলাচির, গেলাসিরও। 

বড় এলাচ বা কালো এলাচের আছে এক গুরুগম্ভীর কর্পূরের মতো গন্ধ। ছবি: উইকিপিডিয়া এদিকে বড় এলাচ বা কালো এলাচ আসলেই বড়সড় আর কালো রঙের। এর আছে এক গুরুগম্ভীর কর্পূরের মতো গন্ধ। এই মসলা সব সময় আস্ত অবস্থায় বিরিয়ানি,  দই দিয়ে তৈরি মাংসের ডিশ, রোগান জোশ ইত্যাদি পদে খুবই অন্যরকম এক স্মোকি ফ্লেভার দেয়। 

কালো আর সাদা গোলমরিচ কিন্তু একই গাছের বীজ। ছবি: উইকিপিডিয়া কালো ও সাদা গোলমরিচ আর কাবাবচিনি
গোলমরিচ বহু যুগ ধরেই পৃথিবীর এ প্রান্তে রান্নায় ঝালের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। মাংস রান্নায় এটি ব্যবহার হয়ে আসছে। কালো আর সাদা গোলমরিচ কিন্তু একই গাছের বীজ।  ফল পাকতে শুরু করলেই তুলে নিয়ে অক্সিডাইজ বা ভাঁপিয়ে শুকিয়ে নিলে কুঁচকে থাকা ত্বকের কড়া স্বাদের ঝাল ও ঝাঁজালো কালো গোলমরিচ পাওয়া যায়। এই গোলমরিচ বাটায় দক্ষিণী কায়দায় বিফ কারি খুব জনপ্রিয় ভারতে। গরম মসলা, কাবাব মসলায় কালো গোলমরিচ অপরিহার্য। 

আমাদের দেশে কালো আর সাদা গোলমরিচের ব্যবহার বেশি হলেও ছয় ধরনের গোলমরিচের অস্তিত্ব আছে পৃথিবীতে। ছবি: উইকিপিডিয়া আবার মসৃণ সাদা গোলমরিচ একই গাছের সুপক্ক ফল। এটি পানিতে ভিজিয়ে আবরণ তুলে ফেলে সাবধানে রোদে শুকিয়ে বানানো হয়। আস্ত সাদা গোলমরিচ মাংসের পদ এবং কাচ্চি বা পাক্কি বিরিয়ানিতে ব্যবহার হয়।  এর স্বাদ–গন্ধ খুবই রাজকীয় ও মৃদু ধরনের।  মুসাল্লাম, আফগানি পোলাও, উজবেক প্লভ,  আরব কাবসা, মান্দি,  পার্সি মালাই কোফতা,  আমাদের মালাই বা রেশমি কাবাবে এর গুঁড়ো বেশ ব্যবহার হয়।  এতে করে ঘি, তেল, চর্বির মধ্যে এক ধরনের চনমনে স্বাদ–গন্ধ আসে ঝালের মাত্রা না বাড়িয়েই এবং রঙে মখমলী ঘিয়ে ভাব রেখেই। আমাদের দেশে কালো আর সাদা গোলমরিচের ব্যবহার বেশি হলেও ছয় ধরনের গোলমরিচের অস্তিত্ব আছে পৃথিবীতে। 

কাবাবচিনি কিন্তু একেবারেই আলাদা স্বাদ–গন্ধের মসলা। ছবি: উইকিপিডিয়া কাবাবচিনি কিন্তু একেবারেই আলাদা স্বাদ–গন্ধের মসলা। এর ব্যবহারও বিচিত্র। তারপরও এর আকার–আকৃতির সঙ্গে কালো গোলমরিচের মিল রয়েছে। তবে এর ছোট্ট শুঁড়টির দিকে খেয়াল করলে আর গন্ধ বুঝলে গুলিয়ে যাবে না এ দুটো। এই মসলাটিকে ইংরেজিতে অলস্পাইস বলে। কারণ, এর বিশিষ্ট সুবাসটি লবঙ্গ, গোলমরিচ,  দারুচিনি আর জায়ফলের সম্মিলিত ঘ্রাণের মতো। আরব,  তুর্কি আর মরক্কোসহ আফ্রিকার বহু দেশের প্রিয় মাংসের মসলা এই কাবাবচিনি। মাংসের তাজিন, বিভিন্ন কাবাব তৈরি করতে এই মসলার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। দমপোখত বা হান্ডি গোশত–এর আটার বাঁধন খুললে প্রথমেই এই মসলার সুবাস নাকে আলোড়ন জাগায়। এ ক্ষেত্রে অবশ্য টেলে গুঁড়ো করে দিলে বেশি ভালো ফল পাওয়া যায়। 

রাঁধুনি নামের এ ছোট খসখসে দানাবিশিষ্ট মসলা মাংস রান্নায় জাদুকরী ভূমিকা রাখে। ছবি: উইকিপিডিয়া রাঁধুনি আর জোয়ান
রাঁধুনি নামের এক ছোট খসখসে দানাবিশিষ্ট মসলা মাংস রান্নায় জাদুকরী ভূমিকা রাখে।  একে আঞ্চলিকভাবে এ দেশে কোথাও কোথাও ছোট ধনেও বলে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরুর মেজবানি মাংসের অতুলনীয় স্বাদ–গন্ধের ব্যাপারে এ মসলার কৃতিত্ব আছে বলে সেখানকার অভিজ্ঞ রন্ধনশিল্পীদের থেকে জানা যায়। এ ক্ষেত্রে রান্নার শেষ দিকে আলাদা করে জিরা, রাঁধুনি, গরম মসলার মিশ্রণের চূর্ণ দেওয়া হয় নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী। ইংরেজিতে ওয়াইল্ড সেলেরি সিডস বা হিন্দিতে আজমোদা বলে পরিচিত এটি। পাঁচফোড়নেও এর ব্যবহার আছে। মেটে, পাতা গন্ধী—এই আস্ত রাঁধুনির ফোড়ন দিলেও মাংসের ফ্লেভারকে খুলে মেলে ধরে। 

জোয়ান বা আজওয়াইন (Carom seeds) আমাদের উপমহাদেশে আস্ত ফোড়ন হিসেবে নিরামিষ খাবারে বেশি ব্যবহার হয়। ছবি: উইকিপিডিয়া জোয়ান বা আজওয়াইন (Carom seeds) আমাদের উপমহাদেশে আস্ত ফোড়ন হিসেবে নিরামিষ খাবারে বেশি ব্যবহার হয়। মধ্যপ্রাচ্যে ও পারসি রান্নায় এর গুঁড়ো মাংসের এক বিশেষ মসলা হিসেবে খুব সমাদৃত। খেয়াল না করলে একে রাঁধুনির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা বেশ সোজা। এটি কিন্তু আস্ত শুকনো ফল, গাছের বীজ নয়।  থাইম হার্বের সঙ্গে এর বেশ মিল আছে। আর মসলাটি খুব কম করে ব্যবহার করতে হয়। পেশোয়ারি মাংসের পদে এর লক্ষণীয় ব্যবহার দেখা যায়।  আজারবাইজান, ইরান, ইরাক, মধ্যপ্রাচ্যে আস্ত বা বেশ বড় টুকরো করে ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদির মাংস রোস্ট করতে জোয়ানের গুঁড়া খুব ব্যবহার হয়।  হজমী গুণের বদৌলতে জোয়ান খুব উপকারী মাংস প্রেমীদের জন্য। 

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

    আজকের রাশিফল

    ‘অবসর’ নেওয়ার ধারণা আবিষ্কার হলো কবে

    আজকের রাশিফল

    বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় সবজি কোনটি

    ফ্যাশন শিল্প, মাছের চামড়া এবং তিন ফরাসি তরুণের গল্প 

    সুখবর

    স্মরণশক্তি ও মনোযোগ বাড়ায় মেডিটেশন

    ধুনটে ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান হলেন যারা

    দেশে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ বেড়েছে

    ডিএসইতে সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন লেনদেন

    চলতি বছরে ঢাকার সড়কে প্রাণ ঝরেছে ১১৯টি

    নরসিংদীতে নির্বাচনী সহিংসতায় আরও একজনের মৃত্যু  

    উত্তরখানে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও পুলিশ ক্যাম্প তৈরির নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর