Ajker Patrika

শিক্ষকের রিলস নিয়ে ‘অপপ্রচার’: নারীদের স্বাধীনতা সংকুচিত করার চেষ্টা, বলছেন অধিকারকর্মীরা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২: ২৭
শিক্ষকের রিলস নিয়ে ‘অপপ্রচার’: নারীদের স্বাধীনতা সংকুচিত করার চেষ্টা, বলছেন অধিকারকর্মীরা
শিক্ষক বিউটি রাণী পালের রিলস নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। ছবি: ফেসবুক

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের একটি ফেসবুক ভিডিওকে কেন্দ্র করে অনলাইন সমালোচনা ও কটূক্তিকে নারীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও স্বাধীনতা সংকুচিত করার সংগঠিত চেষ্টা হিসেবে দেখছেন নারী অধিকারকর্মীরা।

তাঁদের মতে, একজন শিক্ষকের সাধারণ হাঁটার ভিডিওকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া মূলত সমাজে নারীদের ভয় দেখানোর সংস্কৃতিকে উসকে দিচ্ছে।

উপজেলার পিঠাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও চলতি বছরে জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হওয়া বিউটি রাণী পাল গত ২৩ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কয়েক সেকেন্ডের একটি ‘রিল’ ভিডিও প্রকাশ করেন। নীল রঙের শাড়ি পরিহিত অবস্থায় তাঁর হাঁটার ভিডিওতে পেছনের আবহসঙ্গীত হিসেবে বাজছিল ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটি।

পরবর্তীতে ভিডিওটি স্থানীয় কারও দ্বারা পরিচালিত একটি ফেসবুক পেজে নেতিবাচক তথ্যসহ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং কিছু ব্যবহারকারী সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে তাঁর শাস্তির দাবি জানান।

ঘটনাটি সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের আওতায় পড়ে কি না, তা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হবে বলে জানান জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ। পরবর্তীতে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে নেন বিউটি রাণী পাল।

অভিযোগ রয়েছে, ‘আসিফ ইকবাল ইরন’ নামের একটি ফেসবুক আইডি এবং ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি পেজ থেকে তাঁর ভিডিওটি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে গত শুক্রবার ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ওই শিক্ষক।

ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে নারী অধিকারকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং এটিকে ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘একজন ব্যক্তি বা শিক্ষক তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে কী করবেন, তা নিয়ে এ ধরনের আক্রমণের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটিকে কেন্দ্র করে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু বানানো একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

সামাজিক অস্থিরতা ও বিচারবোধের ক্ষয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য বিস্তারের পাশাপাশি মানুষের সঠিক ও ভুল বিচারের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নারীকে সামাজিকভাবে চাপে রাখা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।’

মানবাধিকার সংগঠন আমরাই পারি জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক মনে করেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

তিনি বলেন, ‘বিউটি রাণী পাল নারী হওয়া এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ায় তাঁকে লক্ষ্যবস্তু বানানো সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর পরিহিত পোশাক—যেটি বাংলাদেশের নারীদের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি—তাকেও বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে নারীরা কী পোশাক পরবেন, কীভাবে চলবেন বা কী করবেন—এসব নিয়েও সামাজিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে। এমনকি শাড়ি পরার ধরন নিয়েও নানা ধরনের মন্তব্য করা হচ্ছে। এতে নারীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

জিনাত আরা হকের মতে, ‘একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছে, যাতে নারীরা ভয় পেয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও স্বাধীনতা থেকে পিছিয়ে আসেন।’

অনলাইনে কটূক্তি ও সমালোচনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবাদের রূপ।

শিক্ষক বিউটি রাণী পালের প্রতি সংহতি জানিয়ে সারা দেশের বহু নারী শিক্ষক একই গান—‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’—ব্যবহার করে নিজেদের ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করছেন। শুধু শিক্ষক নন, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এই ডিজিটাল প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী বিউটি রাণী পাল ২০১৩ সালে শিক্ষকতায় যোগ দেন। গুণগত শিক্ষা প্রদানে তাঁর বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগের জন্য চলতি বছর তিনি জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পান।

শিক্ষার্থীদের পাঠদানে গতি আনতে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাচের মাধ্যমে গণিত শেখানো, শরীরচর্চা, বৃক্ষরোপণ এবং চারা বিতরণের মতো নানা ইতিবাচক উদ্যোগের ভিডিও নিয়মিত প্রকাশ করে আসছিলেন।

নারী অধিকারকর্মীদের মতে, পেশাগত দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, অনলাইন বুলিং রোধে রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সামাজিক পর্যায় থেকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত