Ajker Patrika

ঘরে কন্যাসন্তান থাকলে পুরুষ সিইওরা নারী কর্মী নিয়োগে আগ্রহী হন: গবেষণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ০০
ঘরে কন্যাসন্তান থাকলে পুরুষ সিইওরা নারী কর্মী নিয়োগে আগ্রহী হন: গবেষণা
ঘরে কন্যা সন্তানের উপস্থিতি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিতে পারে। ছবি: প্রতীকী

একজন সিইও বা শীর্ষ নির্বাহী প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারণ, বাজার বিশ্লেষণ এবং বাজেট তৈরিতে বছরের পর বছর সময় ব্যয় করতে পারেন। কিন্তু নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ সিইও বা ব্যবস্থাপকদের করপোরেট সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কেবল বোর্ডরুমের অভিজ্ঞতাই নয়, ঘরের খাবার টেবিলে থাকা নিজের কন্যাসন্তানও একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের সিইওদের কন্যা সন্তান রয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি’ বা সিএসআর (সামাজিক দায়বদ্ধতা) কার্যক্রমের মান তুলনামূলকভাবে বেশ উন্নত। বিষয়টিকে গবেষকেরা ‘ডটার ইফেক্ট’ বা ‘কন্যা প্রভাব’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

জার্নাল অব ফাইন্যান্সিয়াল ইকোনমিকস-এ ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘শেপড বাই দেয়ার ডটার্স: এক্সিকিউটিভস, ফিমেল সোশালাইজেশন, অ্যান্ড করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি’ শীর্ষক এক গবেষণায় এ সংক্রান্ত বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। ড্যাভিডের গবেষক হেনরিক ক্রনকভিস্ট এবং ফ্রাঙ্ক ইউ ১৯৯২ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পাবলিক কোম্পানিগুলোর সিইওদের ওপর এই পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা চালান।

গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো ব্যবস্থাপকের প্রথম কন্যাসন্তানের জন্মের পর ওই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারী কর্মীদের আপেক্ষিক আয় গড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

একই সঙ্গে, ব্যবস্থাপকের ঘরে মেয়ে সন্তান আসার পর থেকে প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মী নিয়োগের বা কর্মসংস্থানের হারও প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে।

গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কন্যাসন্তান থাকা সিইওদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সিএসআর রেটিং সাধারণ মধ্যম মানের প্রতিষ্ঠানের তুলনায় প্রায় ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।

বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য (ডাইভারসিটি) বজায় রাখা, পরিবেশগত নীতিমালা এবং কর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্কের জায়গাগুলোতে এই ধরনের সিইওদের ইতিবাচক ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কন্যাসন্তান রয়েছে এমন একজন সিইওর নেতৃত্বাধীন মধ্যম সারির কোম্পানিগুলো তাদের বার্ষিক নিট আয়ের প্রায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ অতিরিক্ত অর্থ সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক নানা নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যয় করে থাকে।

কেন এমন পরিবর্তন আসে?

কিন্তু কেন একজন কন্যাসন্তান থাকা পুরুষ সিইওর করপোরেট আচরণ বদলে যেতে পারে? গবেষকেরা এর ব্যাখ্যায় ‘ফিমেল সোশালাইজেশন’ বা ‘স্ত্রীলোকীয় সামাজিকীকরণ’ ধারণার কথা উল্লেখ করেছেন।

এর মূল কথা হলো—সাধারণত মা-বাবা যেভাবে সন্তানকে মানসিক ও নীতিগতভাবে গড়ে তোলেন, একইভাবে সন্তানও পিতা-মাতার চিন্তাভাবনা ও বিশ্ববীক্ষাকে প্রভাবিত করতে পারে।

একজন বাবা যখন একটি কন্যা সন্তানকে লালন-পালন করেন, তখন দৈনন্দিন পারিবারিক নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি লিঙ্গবৈষম্য বা অসমতার মতো বিষয়গুলোকে অতি নিকট থেকে দেখার সুযোগ পান। ফলে কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য বা নারীদের অধিকারের বিষয়টি তখন আর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক করপোরেট নীতি থাকে না, বরং তা সিইওর কাছে এক আবেগীয় ও ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে ওঠে।

এর ফলে সিইওরা কেবল শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফার কথা না ভেবে কর্মী, নারী, সংখ্যালঘু ও সাধারণ সমাজের কল্যাণ বা স্বার্থ রক্ষায় অধিক মনোযোগ দিতে শুরু করেন।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ঘরে কন্যা সন্তান থাকলেই যে একজন পুরুষ সিইও রাতারাতি পুরোপুরি প্রগতিশীল বা সমাজ সচেতন নেতায় পরিণত হবেন—বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যায় না।

এই গবেষণাটি ছিল মূলত একটি পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য বিশ্লেষণ। ফলে এটি সরাসরি একটি কারণ থেকে অন্য একটি ফল তৈরির নিশ্চিত নিয়ম প্রমাণ করে না, বরং দুটি বিষয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট ইতিবাচক সম্পর্কের উপস্থিতি তুলে ধরে।

একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে বোর্ড অব ডাইরেক্টরস, শেয়ারহোল্ডারদের চাপ, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারি নীতিমালা এবং সিইওর নিজস্ব ব্যক্তিগত মূলবোধের মতো একাধিক অনুঘটক কাজ করে। ফলে কন্যাসন্তান থাকাটাই সংস্কৃতি পরিবর্তনের একমাত্র বা জাদুকরী কোনো চাবিকাঠি নয়।

তা সত্ত্বেও এই গবেষণার ফলাফল বিশ্বজুড়ে বেশ সাড়া ফেলেছে। কারণ এটি প্রকাশ করে—একজন বিশ্বমানের নেতার দৃষ্টিভঙ্গি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি, লিডারশিপ কোর্স কিংবা বড় কোনো বোর্ড সভার আলোচনার মাধ্যমেই তৈরি হয় না।

ঘরে বেড়ে ওঠা একটি ছোট মেয়ে, তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা নানা প্রশ্ন, তার অর্জিত সুযোগ কিংবা সমাজের তৈরি বাধার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে তার বাবার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে।

সাধারণত ধরা হয় মূল্যবোধ পিতা-মাতার কাছ থেকে সন্তানে স্থানান্তরিত হয়। তবে এই ‘ডটার ইফেক্ট’ বা কন্যা প্রভাব প্রমাণ করে, সামাজিক সমতা ও করপোরেট ব্যবস্থার এই পরিবর্তনের স্রোত উল্টো দিকেও প্রবাহিত হতে পারে—যা হয়তো কোনো বোর্ডরুমে নয়, বরং নিজ ঘরেই শুরু হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত