Ajker Patrika

সিজিইপির সংলাপ

শিশুর প্রকৃত পরিচর্যাকারীকে অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৩: ৩৬
শিশুর প্রকৃত পরিচর্যাকারীকে অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি
রাজধানীর দৃকপাঠ ভবনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স, ইকুয়ালিটি অ্যান্ড পলিসি আয়োজিত সংলাপে বক্তারা। ছবি: আজকের পত্রিকা

বাংলাদেশে প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় বাবাকে শিশুর স্বাভাবিক অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করার ফলে অনেক ক্ষেত্রে শিশুর প্রকৃত পরিচর্যাকারী মা স্কুলে ভর্তি, জরুরি চিকিৎসা কিংবা বিদেশভ্রমণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সন্তানের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে ও প্রয়োজনীয় নথিতে সই করতে সমস্যার মুখে পড়েন। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করতে প্রকৃত পরিচর্যাকারী মা বা অন্য উপযুক্ত ব্যক্তির অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি প্রয়োজন।

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর দৃকপাঠ ভবনে চিলড্রেনস গার্ডিয়ানশিপ এক্সপ্যানশন প্রপোজিশন (সিজিইপি) আয়োজিত সংলাপে বক্তারা এ কথা বলেন।

সিজিইপির আহ্বায়ক দিলরুবা শরমিন উদ্বোধনী বক্তব্যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও জবাবদিহি এবং বিদ্যমান আইনের পরস্পরবিরোধী বিধান ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অভিভাবকত্বের যেকোনো প্রশ্নে শিশুর সর্বোত্তম কল্যাণই হতে হবে প্রধান বিবেচনা।

আয়োজকদের মতে, বিদ্যমান পারিবারিক আইন প্রতিস্থাপন বা চ্যালেঞ্জ করা এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য নয়। বরং বর্তমান আইনি কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেই শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে প্রকৃত পরিচর্যাকারীর অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি নিশ্চিত করার কার্যকর পথ খুঁজে বের করাই এ সংলাপের লক্ষ্য।

সংলাপের আলোচনায় উঠে আসে—আদালতের আদেশ পাওয়ার পরও তা কার্যকর না হওয়া, মামলা দীর্ঘায়িত হওয়া এবং অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার পরও সামাজিক অসহযোগিতা ও মানসিক চাপ মোকাবিলার মতো সমস্যার কথা।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, শিশুর অভিভাবকত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তা অনেক সময় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

শিশুর পরিচর্যাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সঙ্গে তুলনা করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, এ ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নিতে বর্তমানে রাজনীতিতে সক্রিয় ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ঔপনিবেশিক ও পিতৃতান্ত্রিক আইনি বিধান পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। সংসদ ও আদালতের মাধ্যমে আইনি সংস্কারের বিভিন্ন পথ খোলা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি শিশুদের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত-সংক্রান্ত বিদ্যমান পরিবর্তনগুলোর মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি অভিভাবকত্বের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও বিচারকদের প্রশিক্ষণ এবং গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির প্রস্তাব দেন।

আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, ‘শিশু অধিকার সনদে সই করা প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। সেই দেশে আজও আমাদের এসব সমস্যার সমাধান খুঁজতে হচ্ছে, যা ভাবনার বিষয়।’

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, শিশুর পরিচর্যা ও বেড়ে ওঠায় রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকা দরকার। পথশিশু, অনাথ, রোহিঙ্গা ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শিশুদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ক্লাব ও খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট রেহনুমা আহমেদ শিশুদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি এবং সেখানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ফস্টার কেয়ার বা বিকল্প পরিচর্যাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সম্পৃক্ত করা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম বিধবা মায়ের পুনর্বিবাহের পর সন্তানের অভিভাবকত্বের প্রশ্নটি সামনে আনেন। তিনি বলেন, অভিভাবকত্ব হারানোর আশঙ্কায় কোনো নারীকে পুনর্বিবাহ না করার মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হলে তা তাঁর স্বাধীনতার জন্য অন্যায্য হতে পারে।

সংলাপে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সিজিইপির গবেষণাপ্রধান ও সমন্বয়ক তৃষিয়া নাশতারান। আরও অংশ নেন গবেষক মীর হুযাইফা আল মামদূহ, দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন, উপস্থাপক দীপ্তি চৌধুরী, নারী প্রয়াসের সেক্রেটারি ড. ফেরদৌস আরা খানম, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ প্রমুখ।

সংলাপে বক্তারা সৎবাবার অভিভাবকত্বের সুযোগ, দত্তক নেওয়ার অধিকার ও দত্তক সন্তানের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা এবং কোনো শিশুকে অভিভাবকহীন না রাখার বিষয়ে প্রস্তাব দেন। বিচ্ছেদ বা মৃত্যুর পর শিশুর জীবন যাতে অনিশ্চয়তার মধ্যে না পড়ে, সে জন্য অভিভাবকত্বের পরিসর সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত