Ajker Patrika

ডাক্তার যদি হন নারী, কম ব্যথা অনুভব করেন পুরুষ রোগী: গবেষণা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ডাক্তার যদি হন নারী, কম ব্যথা অনুভব করেন পুরুষ রোগী: গবেষণা
প্রতীকী ছবি

কোনো ব্যক্তি কতটা ব্যথা অনুভব করছেন, তা কেবল আঘাতের মাত্রার ওপরই নয়, বরং চিকিৎসকের বা পরীক্ষা পরিচালনাকারীর লিঙ্গের ওপরও কিছুটা নির্ভর করতে পারে—এমনই এক ব্যতিক্রমী তথ্য সামনে এনেছেন সুইডেনের গবেষকেরা। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ রোগীরা কোনো নারী চিকিৎসকের উপস্থিতিতে তুলনামূলক কম ব্যথা অনুভব করেন।

লুন্ড ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানীর পরিচালিত এই গবেষণায় উঠে এসেছে, পুরুষদের ব্যথাবোধের সীমায় পৌঁছাতে একজন নারী পরীক্ষকের উপস্থিতিতে তুলনামূলক শক্তিশালী উদ্দীপনা বা আঘাতের প্রয়োজন হয়।

বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি ডক্টরাল থিসিসে এই চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যথার মূল্যায়ন এবং লিঙ্গভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গবেষণা কীভাবে পরিচালিত হলো?

লুন্ড ইউনিভার্সিটির অ্যানেস্থেসিওলজি ও নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং গবেষক আন্না সেলগ্রেন এংস্কভ এবং তাঁর সুপারভাইজার অধ্যাপক জোনাস একেসনের তত্ত্বাবধানে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। তাঁরা মূলত মানুষের শরীরে বিভিন্ন কলার (টিস্যু) ক্ষতির কারণে তৈরি হওয়া ‘নসিসেপ্টিভ পেইন’ বা শারীরিক ব্যথাবোধ নিয়ে কাজ করছিলেন।

গবেষণার প্রথম ধাপে সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকদের পায়ে লেজার উদ্দীপনা দিয়ে ব্যথার মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, যে ক্ষেত্রে পরীক্ষা পরিচালনাকারী ব্যক্তি ছিলেন একজন নারী, সেখানে পুরুষ অংশগ্রহণকারীদের ব্যথার অনুভূতি নির্দিষ্ট সীমানায় পৌঁছাতে শক্তিশালী লেজার উদ্দীপনার প্রয়োজন হয়েছিল।

পরবর্তী ধাপে, অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাই একটি বোতাম চেপে বৈদ্যুতিক শক নেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের ব্যথাবোধ পরীক্ষা করেন। সেখানে দেখা যায়, একজন নারী বিজ্ঞানী কক্ষে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে উপস্থিত থাকলে পুরুষ ও নারী—উভয় অংশগ্রহণকারীই ব্যথা অনুভব করতে তুলনামূলক শক্তিশালী বৈদ্যুতিক শকের প্রয়োজনবোধ করেছেন। অথচ পরীক্ষা চলাকালীন গবেষকেরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পোশাক পরিহিত ছিলেন এবং সবার সঙ্গে হুবহু এক ভাষায় কথা বলেছিলেন।

গবেষণাগারের এই অভিজ্ঞতার পর আন্না সেলগ্রেন এংস্কভ পোস্ট-অপারেটিভ বা অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগীদের ওপর পরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

অস্ত্রোপচারের পর পুরুষ রোগীদের অনুভূতি

তৃতীয় ধাপে, মালমোর স্ক্যান ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের ২৪৫ জন অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগীর ওপর এই পরীক্ষা চালানো হয়। অস্ত্রোপচারের পর প্রতি রোগীর কাছে ১৫ মিনিটের ব্যবধানে একজন পুরুষ এবং একজন নারী গবেষক গিয়ে তাঁদের ব্যথার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চান।

গবেষক আন্না সেলগ্রেন এংস্কভ বলেন, ‘আমরা এখানে আমাদের আগের ফলাফলের সত্যতা আংশিকভাবে নিশ্চিত করতে পেরেছি। পুরুষ রোগীরা নারী গবেষকের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সময় কম ব্যথার কথা প্রকাশ করেছেন, যদিও নারী রোগীদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন দেখা যায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সামগ্রিক বা দলগত পর্যায়ে এই পার্থক্যের প্রভাব খুব বড় মনে না হলেও, রোগীর ব্যক্তিগত চিকিৎসকের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন ব্যথা তীব্র রূপ নেয় এবং রোগী ব্যথানাশক ওষুধ চাইতে শুরু করেন, তখন এই পার্থক্যটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়।’

কেন এমন ঘটে?

গবেষকেরা এখনো নিশ্চিত নন যে কেন নারী চিকিৎসকের উপস্থিতিতে পুরুষদের ব্যথাবোধ কম অনুভূত হয়। তবে গবেষকদের মতে, এটি নারীদের তুলনামূলক বেশি সহানুভূতিশীল আচরণের ফল হতে পারে। চোখ মেলানো বা মৃদু হাসির মতো অমৌখিক যোগাযোগের কারণে রোগীদের ওপর ইতিবাচক মানসিক প্রভাব পড়তে পারে।

বিজ্ঞানী দলের প্রধান জোনাস একেসন বলেন, ‘আন্নার এই গবেষণার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিক হলো প্রথম পরীক্ষার পর্যবেক্ষণ থেকেই তিনি পরবর্তী বিষয়গুলো অনুসন্ধানে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ব্যথার মূল্যায়নে এই লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হলে ভবিষ্যতে রোগীরা আরও উন্নত চিকিৎসা ও ব্যথা উপশম সেবা পাবেন বলে আশা করা যায়।’

এ ছাড়া, গবেষণায় দেখা গেছে যে রোগীরা বিভিন্ন গতির স্নায়ু সিগন্যাল (Aδ-ফাইবার এবং C-ফাইবার) থেকে তৈরি ব্যথার বিবরণ দিতে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেন। গবেষকদের মতে, রোগীদের নিজস্ব ভাষায় বলা ব্যথার এই বিবরণগুলোও চিকিৎসকদের দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত