নিরামিষ খেয়ে হীনবল, পাঁচ বছর পর ফের মাংস খাওয়া শুরু করলেন বেয়ার গ্রিলস

বেয়ার গ্রিলস। বিশ্বখ্যাত এই ব্রিটিশ অভিযাত্রী ও সারভাইভাল এক্সপার্ট জনপ্রিয় টেলিভিশন শো ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’-এর উপস্থাপক হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। চরম প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার চিত্র দেখিয়েছেন এই টেলিভিশন শোতে।
এছাড়া ‘রানিং ওয়াইল্ড উইথ বেয়ার গ্রিলস’ এবং ‘দ্য আইল্যান্ড’-এর মতো জনপ্রিয় শোতেও তাঁকে উপস্থাপনা করতে দেখা গেছে। এসব শোতে তাঁকে হলিউড তারকা ও বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে দুর্গম প্রান্ত ঘুরতে দেখা গেছে।
নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে বেশ সচেতন বেয়ার গ্রিলস সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে জানিয়েছেন, পাঁচ বছর ভেগান বা নিরামিষাশী জীবনযাপন করেছিলেন তিনি। এরপর শারীরিক শক্তি অনেকটাই কমে যাওয়ায় ফের কলিজা, হৃদ্যন্ত্র ও বৃক্কের মতো প্রাণীর বিভিন্ন অঙ্গের মাংস খাওয়া শুরু করেছেন।
বেয়ার গ্রিলস লিখেছেন, ‘৫২ বছর বয়সে এখন নিজেকে ১০ বছর আগের চেয়ে বেশি ফিট, শক্তিশালী ও সুস্থ মনে হচ্ছে। যদিও নিজেকে পুরোপুরি অজেয় মনে করি না, এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই, তবে নিজের মধ্যে পরিবর্তন এনেছি।’
বেয়ার গ্রিলসের দীর্ঘদিন ধরে নিরামিষ খাবার খাওয়ার পর হঠাৎ করে মাংস খাওয়া শুরু করলে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাভাবিকভাবেই ভেগান জীবনযাপনের পর বেয়ার গ্রিলসের শারীরিক শক্তি কমে যাওয়া এবং পরে মাংস খাওয়ার মাধ্যমে সেই সমস্যার সমাধান করার দাবি পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। পুষ্টিবিদ গরিমা গোয়াল বলেন, ‘কেবল খাদ্যাভ্যাস উদ্ভিদভিত্তিক নাকি প্রাণিজ এটি দিয়ে পুষ্টির মান নির্ধারিত হয় না। বরং পুষ্টি উপাদানের গুণগত মান, পরিমাণ ও ভারসাম্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রাণীর বিভিন্ন অঙ্গের মাংসে প্রচুর পুষ্টি উপাদান থাকে। বিশেষ করে কলিজায় ভিটামিন বি১২, আয়রন, ভিটামিন এ ও ফোলেট প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। অন্যদিকে হৃদ্যন্ত্রের মাংসে থাকে প্রোটিন, আয়রন ও বি-ভিটামিনের বিভিন্ন উপাদান। এসব পুষ্টি উপাদান লোহিত রক্তকণিকা তৈরি, শরীরে অক্সিজেন পরিবহন, শক্তি উৎপাদনের বিপাকীয় প্রক্রিয়া এবং পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।’
গরিমা গোয়ালের মতে, ভেগান খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে সবারই শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেবে, কিংবা শক্তি ধরে রাখতে প্রাণীর বিভিন্ন অঙ্গের মাংস খাওয়া অপরিহার্য এমনটাও নয়। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘পরিকল্পিত নিরামিষ বা ভেগান খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমেও পেশির শক্তি ও শারীরিক কর্মক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ক্যালরি, যথেষ্ট প্রোটিন এবং প্রয়োজনীয় অণুপুষ্টি উপাদান নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রোটিনসমৃদ্ধ নিরামিষ খাবারের মধ্যে রয়েছে দুধ, দই, পনির, গ্রিক ইয়োগার্ট, সয়া দিয়ে তৈরি খাবার, মসুর ডাল, ছোলা, রাজমা, বাদাম ও বিভিন্ন বীজ।
গরিমা গোয়াল বলেন, ‘ভেগান খাদ্যাভ্যাস অনুসরণকারীরা বিশেষ করে টোফু, টেম্পে, সয়া দুধ এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার থেকে উপকৃত হতে পারেন। এসব খাবারের সঙ্গে ধীরে ধীরে প্রতিরোধমূলক ব্যায়ামের মাত্রা বাড়ানো এবং শরীরকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়ার মাধ্যমে পেশির বিকাশে সহায়তা করা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘যাঁরা সীমিত ধরনের খাবার খান, তাঁদের ভিটামিন বি১২, আয়রন, ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম ও জিঙ্কের মতো পুষ্টি উপাদানের দিকে নজর দেওয়া উচিত। ভেগান খাদ্যাভ্যাসে ভিটামিন বি১২ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভিটামিন বি১২-সমৃদ্ধ নয় এমন উদ্ভিদজাত খাবার এই ভিটামিনের নির্ভরযোগ্য উৎস নয়। আয়রনের ঘাটতিও ক্লান্তি, দুর্বলতা এবং ব্যায়াম করার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ব্যক্তির চাহিদার ওপর নির্ভর করে ভিটামিন ও খনিজ উপাদানসমৃদ্ধ খাবার কিংবা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।’
তবে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পর কারও শারীরিক শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে বা দীর্ঘ সময় ধরে ক্লান্তি থাকলে নিরামিষ খাবার ছেড়ে দেওয়া কিংবা প্রাণীর বিভিন্ন অঙ্গের মাংস খাওয়া শুরু করাই একমাত্র সমাধান নয় বলে জানান তিনি।
গরিমা গোয়ালের ভাষ্য, ‘পর্যাপ্ত ক্যালরি না পাওয়া, প্রোটিনের ঘাটতি, আয়রনের অভাব, ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং অতিরিক্ত ব্যায়ামের কারণে এমন সমস্যা হতে পারে। মূল কারণ শনাক্ত করতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা সহায়তা করতে পারে।’
শারীরিক শক্তি নির্ভর করে পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিয়মিত ব্যায়াম, বিশ্রাম ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর, কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার ওপর নয়। পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রেখে এবং ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করলে নিরামিষ ও আমিষ উভয় ধরনের খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমেই শারীরিক শক্তি ধরে রাখা সম্ভব।









