Ajker Patrika

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি নতুন উপনিবেশবাদী শক্তি হয়ে উঠছে

জগৎপতি বর্মা, ঢাকা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা  কি নতুন উপনিবেশবাদী শক্তি হয়ে উঠছে

‘উপনিবেশ’ শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে এমন এক অঞ্চলের কথা, যেখানে নিজের ভূমিতেই মানুষ পরবাসী হয়ে ওঠে। আর সেসব পরবাসী মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় শক্তিশালী জনগোষ্ঠীর তৈরি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কাঠামো। এর উদ্দেশ্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং নতুন বাজার দখল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিশাল দুনিয়ার সঙ্গে কি সেই উপনিবেশবাদের কোনো সম্পর্ক সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়? উত্তর, হ্যাঁ, যায়।

প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর আড়ালে তৈরি হচ্ছে এক নতুন সংকট। এআই প্রযুক্তির এই জয়জয়কার আসলে ‘ডেটা উপনিবেশবাদ’ কিংবা তথ্যের সাম্রাজ্যবাদ, যা বিশ্বজুড়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে মুছে দিচ্ছে এবং নতুন এক বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে স্থায়ী রূপ দিচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সাধারণত কোনো দেশ জয় করে সেটিকে নিজেদের উপনিবেশ ঘোষণা করে সেখানকার জমি ও সম্পদের মালিক হয়ে বসত। বর্তমানে বড় বড় টেক জায়ান্ট বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ঠিক একই কাজ করছে তথ্যের ক্ষেত্রে। তারা অনুমতি বা সত্যতা যাচাই ছাড়াই ইন্টারনেট থেকে বিশ্বজুড়ে শতকোটি মানুষের তৈরি ডেটা বা তথ্য চুরি করছে এবং তা দিয়ে নিজেদের তৈরি এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আর এই চুরি করা তথ্য দিয়ে তৈরি প্রযুক্তি বিক্রি করে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মুনাফা লুটছে।

ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জুলিয়ান পসাদা বলেন, ‘আমরা পাঠ্যবইতে পড়ি উপনিবেশবাদ বহু আগে শেষ হয়ে গেছে এবং দেশগুলো স্বাধীনতা পেয়েছে। কিন্তু আধুনিক যুগের এই ডিজিটাল উপনিবেশবাদ যে এখনো টিকে আছে, তা মানুষ বুঝতে পারছে না।’

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় প্রায় সব লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (যেমন চ্যাটজিপিটি বা অন্যান্য এআই) তৈরি হয়েছে তথাকথিত ‘উইয়ার্ড’ অর্থাৎ পশ্চিমা, উচ্চশিক্ষিত, শিল্পোন্নত, ধনী ও গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায়।

ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সংবাদ আর্কাইভ থেকে তথ্য নেওয়ার কারণে এই এআই মডেলগুলো মূলত শ্বেতাঙ্গ এবং পশ্চিমা মানুষের মূল্যবোধ, লেখার শৈলী, দৃষ্টিভঙ্গি আর পক্ষপাতিত্বকেই অন্ধের মতো অনুকরণ করে। ফলে কোনো একটি সংস্কৃতির নিজস্ব বিষয়গুলো এখানে পুরোপুরি থাকে না।

কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আদিত্য বশিষ্ঠ উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছেন, এআই মডেলগুলোকে যদি ভারতীয় খাবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে তারা ঢালাওভাবে বলে দেয়—সব ভারতীয় খাবারই তেল-মসলা, নানা সুগন্ধি ও ঝালযুক্ত। অথচ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবার বিভিন্ন রকম। একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মসলার ব্যবহারও খুবই পরিমিত। কিন্তু এআই এই বৈচিত্র্যকে একাকার করে দিচ্ছে।

কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটির ফেলো ও কানাডার পিকওয়াকানাগান ফার্স্ট নেশনের অ্যালগনকুইন সম্প্রদায়ভুক্ত গবেষক মাইকেল শারবার্ট মনে করেন, আমেরিকান এআই কোম্পানিগুলো চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে বসে তাদের জ্ঞান এবং সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। ফলে কোম্পানিগুলো পিছিয়ে পড়ার ভয়ে আদিবাসীদের মতামত নেওয়ার কোনো তোয়াক্কাই করছে না।

তা ছাড়া অনেক আদিবাসী সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য লিখিত রূপের চেয়ে মুখে মুখে বা ‘ওরাল হিস্ট্রি’ হিসেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। যেহেতু এআই শুধু ইন্টারনেটে থাকা লিখিত ডেটা পড়তে পারে, তাই এই বিশাল মৌখিক ইতিহাস এআইয়ের জগৎ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক আদিবাসী সংস্কৃতি তাদের কিছু জ্ঞানকে পবিত্র মনে করে এবং সেগুলো গোপন রাখতে চায়। কিন্তু এআই ডেটা স্ক্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে সেগুলো জোর করে সবার সামনে নিয়ে আসছে।

অন্টারিওর শ্যাপলো ক্রি ফার্স্ট নেশনের সদস্য এবং কামা ডট এআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ব্রায়ান রিচি জানান, তিনি বহুবার আদিবাসী নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। রিচি আরও বলেন, ‘এআই প্রশিক্ষণের কাজে আদিবাসী মানুষদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে—এমন কোনো উদাহরণ ব্যক্তিগতভাবে আমি দেখিনি।’

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাটি শুধু ভুল তথ্য বা মিথ্যা সংবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বড় বিপদ হলো, এই এআই মডেলগুলো যেভাবে উত্তর দিচ্ছে, তা ভবিষ্যতে মানুষের সংস্কৃতি, ইতিহাস, নিজস্ব পরিচয় এবং ‘কোনটি সত্য ও বৈধ’, তা নির্ধারণ করার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠবে। ফলে পশ্চিমা বিশ্বের তৈরি একটি নির্দিষ্ট অ্যালগরিদমই ভবিষ্যতে পুরো পৃথিবীর সত্য

ও মিথ্যা বলে নিয়ন্ত্রিত হবে, যা মানব সভ্যতার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। এর অর্থ, তথ্যনির্ভর এই নতুন যুগে উপনিবেশবাদ আর ভূমি দখলের মাধ্যমে নয়, ডেটা, অ্যালগরিদম এবং জ্ঞান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নতুনরূপে ফিরে আসছে।

তথ্যসূত্র: অ্যাক্সিওস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত