Ajker Patrika

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ায় বাংলা: নতুন পৃথিবীর জন্য আমরা কি প্রস্তুত

ওমর শেহাব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ায় বাংলা: নতুন পৃথিবীর জন্য 
আমরা কি প্রস্তুত
ন্যানো ব্যানানা দিয়ে তৈরি জামদানি শাড়ি ও মডেল

পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত আমাদের বাংলা ভাষা। সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র, গবেষণা—সবকিছুর ভেতর দিয়ে বাংলা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, পরিচয় ও সৃজনশীলতার ভিত্তি।

বাংলাদেশে ২০২০ সালে জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল প্রণয়ন করা হয় ‘এআই ফর ইনোভেটিভ বাংলাদেশ’ স্লোগান ঘোষণার মধ্য দিয়ে। ২০২৪ সালের খসড়া জাতীয় এআই নীতিতে স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ বাস্তবায়নে এআইকে কেন্দ্রীয় প্রযুক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই নীতিতে উচ্চাকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট—ডেটা গভর্ন্যান্স, নৈতিকতা, বৌদ্ধিক সম্পত্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবন—সবই সেখানে রয়েছে।

এই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ২০১৭ সালের ‘তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প’। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো ব্যক্তিত্বদের অনুপ্রেরণায় বাংলা করপাস তৈরি, স্পিচ রিকগনিশন, টেক্সট-টু-স্পিচ এবং ভাষা প্রযুক্তির ভিত্তি শক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সে সময়। দুইভাবে এই প্রকল্প আমাদের কাজে এসেছে। প্রথমত, এই প্রকল্প প্রথম আমাদের আত্মবিশ্বাস দেয় যে আমরা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে নতুন প্রযুক্তি তৈরি করতে পারি। দ্বিতীয়ত হলো, সর্বশেষ জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা অনেকে এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে।

যদিও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বেশির ভাগ কাজকে এই সাফল্য প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং তারা ঐতিহাসিকভাবে দুর্নীতি ও অদক্ষতার অভিযোগে তীব্রভাবে দুষ্ট। এটাই এআই যুগে আমাদের ভাষার জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই করপোরেশনগুলো; যেমন ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক এবং গুগলের জেমিনাই—তাদের মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল অনলাইন কনটেন্ট ব্যবহার করছে। সেই কনটেন্টের ভেতরে রয়েছে বাংলা ভাষার সাহিত্য, সংবাদ, গবেষণা, ব্লগ, শিল্পকর্ম, লোকসংস্কৃতি ও মোটিফ; যা সৃষ্টি করেছেন বাংলাদেশের শিল্পী, লেখকেরা। প্রশ্ন হলো, এই সৃষ্টিশীল শ্রমের বিনিময়ে তাঁরা কী পাচ্ছেন?

যদি একটি এআই মডেল লাখ লাখ বাংলা লেখা পড়ে ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করে, নতুন লেখা তৈরি করে, অনুবাদ করে, বিশ্লেষণ দেয় বা বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়; তাহলে সেই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত কনটেন্ট নির্মাতাদের স্বীকৃতি, অনুমতি কিংবা পারিশ্রমিক কোথায়?

জাতীয় এআই নীতিতে বৌদ্ধিক সম্পত্তি এবং ডেটা গভর্ন্যান্সের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কি আমরা দৃশ্যমানভাবে দাবি তুলেছি যে বাংলা ভাষার কনটেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ক্ষতিপূরণের কাঠামো থাকা উচিত?

ব্যাপারটি পরিষ্কার করার জন্য গুগলের ন্যানো ব্যানানা ও ওপেনএআই দিয়ে তৈরি জামদানি শাড়ির ছবি দিলাম। পয়সা খরচ করে এই ছবি দুটি বানাতে হয়েছে। কিন্তু সেই টাকার ভাগ কি আমাদের জামদানি কারিগরেরা পেলেন? আমি নিশ্চিত, তাঁরা পাননি।

আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নেতৃত্বদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে অ্যাসপায়ার টু ইনোভেটকে (এটুআই) ঘিরে বিভিন্ন সময়ে অস্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়; কিন্তু ডিজিটাল রূপান্তরের নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা জরুরি।

একইভাবে, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের সম্পদের দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে, যা জনমনে প্রশ্ন তুলেছে। সম্পদ বৃদ্ধি নিজেই দুর্নীতির প্রমাণ নয়; কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা ও স্বাধীন যাচাই অপরিহার্য।

সম্প্রতি সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে নিয়েও বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণের বিষয় আদালতের; কিন্তু ক্ষমতার অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের আচরণ, স্বচ্ছতা ও নীতিগত দৃঢ়তা জন-আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

আরেকটি দীর্ঘদিনের জন-আলোচিত বিষয়, সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি জায়ান্টদের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, করপোরেট স্পন্সরড বিদেশ সফর বা সম্মেলনে অংশগ্রহণ। আন্তর্জাতিক সংযোগ প্রয়োজনীয়; কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব সম্পর্ক কি নীতিগত দৃঢ়তা দুর্বল করছে? রাষ্ট্র কি নাগরিকের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, নাকি বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকেই বড় করে দেখছে?

আজ ইউরোপে লেখক সংগঠনগুলো এআই প্রশিক্ষণে কপিরাইট ব্যবহারের প্রশ্নে আদালতে যাচ্ছে। লাইসেন্সিং চুক্তি করছে সংবাদমাধ্যমগুলো। অথচ বাংলাদেশে আমরা কি গুছিয়ে দাবি তুলেছি, বাংলা ভাষার কনটেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে?

সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, আগের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব থেকে আমাদের শিশু-কিশোরদের পর্যাপ্তভাবে সুরক্ষা দিতে পারেনি। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি সতর্কবার্তা। যদি আমরা এখনই স্বচ্ছ নীতি, জবাবদিহি এবং সৃজনশীল শ্রমের ন্যায্য সুরক্ষার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান না নিই, তাহলে একই ধরনের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি হবেই; বিশেষ করে যখন ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক এবং গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে বিপুল কনটেন্ট ব্যবহার করছে, তখন যথাযথ নীতিগত সুরক্ষা না থাকলে বাংলাদেশের শিল্পী, নির্মাতা, লেখকসহ আমাদের সাংস্কৃতিক মোটিফগুলোও অনিরাপদ থেকে যেতে পারে।

তবে দুর্নীতি এবং অদক্ষতার অভিযোগে জর্জরিত আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই নতুন পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত কি না, আমি ঠিক নিশ্চিত নই!

লেখক: তত্ত্বীয় কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিজ্ঞানী, যুক্তরাষ্ট্র

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত