Ajker Patrika

রূপকথার রেশ টানতে পারবে তো স্কটিশরা

ক্রীড়া ডেস্ক    
আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ১০: ৩৫
রূপকথার রেশ টানতে পারবে তো স্কটিশরা
‘সি’ গ্রুপে পড়েছে স্কটল্যান্ড। ছবি: এএফপি

গ্লাসগোর ডালমারনক এলাকায় অবস্থিত ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে গত ১৮ নভেম্বরের রাতটি ছিল কিছুটা রহস্যময়। ঘড়িতে তখন রাত ৯টা বেজে ৪৮ মিনিট। সিসমোগ্রাফ যন্ত্রে ধরা পড়ল মৃদু কম্পন, যা অনেকটা ছোটখাটো ভূমিকম্পের মতো। অথচ সেই কম্পনের উৎস কোনো ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ ছিল না; উৎস ছিল মাত্র এক মাইল দূরে অবস্থিত হ্যাম্পডেন পার্ক স্টেডিয়াম। কেনি ম্যাকলিনের বুট থেকে ৫০ গজ দূর দিয়ে উড়ে আসা একটি বল যখন ডেনমার্কের জালে আছড়ে পড়ল, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার স্কটিশ সমর্থকের গগনবিদারী চিৎকার আর উন্মাদনায় আক্ষরিক অর্থেই কেঁপে উঠেছিল গ্লাসগোর মাটি। সেই কম্পন শুধু একটি গোলের ছিল না, তা ছিল দীর্ঘ ২৮ বছরের হাহাকার আর অপেক্ষার অবসানের আনন্দধ্বনি।

স্কটল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাস মানেই যেন এক ‘অম্লমধুর’ ট্র্যাজেডি। সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত যারা বিশ্বকাপের নিয়মিত মুখ ছিল, সেই দেশটি ১৯৯৮ সালের পর থেকে বিশ্বমঞ্চে ছিল ব্রাত্য। টানা ছয়টি বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ব্যর্থ হওয়ার পর ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া ছিল তাদের কাছে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। কোচ স্টিভ ক্লার্ক যখন ২০১৯ সালে দায়িত্ব নেন, তখন স্কটিশ ফুটবল ছিল দিকভ্রান্ত। সেই ক্লার্কের হাত ধরেই বদলে গেছে দেশটির ফুটবলের মানচিত্র। ভাবলেশহীন চেহারার এই কোচ স্কটল্যান্ডকে শুধু ২০২৪ ইউরোতেই নিয়ে যাননি, বরং প্রায় তিন দশক পর বিশ্বকাপের মূল পর্বেও পৌঁছে দিয়েছেন।

বাছাইপর্বের সেই শেষ রাতটি ছিল কোনো থ্রিলার সিনেমার চেয়েও নাটকীয়। গ্রিসের কাছে হেরে যখন স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসছিল, তখনই ভাগ্যের ছোঁয়ায় অন্য সমীকরণে বেঁচে ফেরে স্কটল্যান্ড। আর ডেনমার্কের বিরুদ্ধে সেই ফয়সালার ম্যাচে স্কট ম্যাকটোমিনের অবিশ্বাস্য সেই ‘ওভারহেড কিক’ থেকে শুরু করে কিয়েরান টিয়ার্নির বুলেট গতির গোল—সবই ছিল রূপকথার মতো। ম্যাকটমিনের সেই শূন্যে ভাসা কিকটি এতটাই নান্দনিক ছিল যে তার উচ্চতা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিখ্যাত বাইসাইকেল কিকের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সেই গোলগুলোর পেছনে শুধু পেশিশক্তি নয়, ছিল আবেগ আর বন্ধুত্বের মেলবন্ধন।

তবে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে লড়াইটা সহজ হবে না। ব্রাজিল ও মরক্কোর মতো শক্তিশালী দলগুলোর সঙ্গে একই গ্রুপে থাকা স্কটিশদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে ৯ বার বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কখনোই গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে পারেনি তারা। কিন্তু এবার তাদের সঙ্গে আছে ‘টার্টান আর্মি’খ্যাত সেই পাগলপ্রায় সমর্থকদের ভালোবাসা এবং হ্যাম্পডেনের সেই জাদুকরি রাত থেকে পাওয়া আত্মবিশ্বাস। উত্তর আমেরিকার মাটিতে স্কটল্যান্ড কি পারবে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার তকমা মুছে নতুন ইতিহাস গড়তে? কেনি ম্যাকলিনের সেই ৫০ গজের অবিশ্বাস্য শটটি যদি সম্ভব হয়, তবে এই স্কটল্যান্ডের কাছে অসম্ভব বলে হয়তো আর কিছুই নেই। বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে নীল জার্সিধারীদের এই পুনর্জন্ম শুধু মাঠের জয় নয়, বরং একটি জাতির ধৈর্য আর লড়াকু মানসিকতার জয়।

clarke

কোচ: স্টিভ ক্লার্ক

স্টিভ ক্লার্ক স্কটল্যান্ড ফুটবলের আলোকবর্তিকা। ২০১৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময় যে দলটি ছিল দিকভ্রান্ত, তার বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী কৌশলে আজ তারা বিশ্বমঞ্চে। গম্ভীর ও প্রচারবিমুখ এই কোচ নিজের আবেগকে আড়াল করলেও মাঠের সাফল্যে সমর্থকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। ২৩ বছরের খরা কাটিয়ে দলকে ইউরো ও বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়া ক্লার্ক এখন দেশটির ইতিহাসের সফলতম কোচ। একদল বিশ্বস্ত খেলোয়াড়কে নিয়ে গড়ে তোলা তাঁর এই ‘ফুটবল পরিবার’ এখন অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন দেখছে।

mctominay

স্কট ম্যাকটমিনে

স্কট ম্যাকটমিনে বর্তমান স্কটল্যান্ড দলের প্রাণভোমরা। ডেনমার্কের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক জয়ের রাতে ২.৫৩ মিটার উচ্চতায় লাফিয়ে তিনি যে ‘ওভারহেড কিক’ গোলটি করেছিলেন, তা বিশ্ব ফুটবলের বিস্ময় হয়ে আছে; যা উচ্চতার বিচারে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর রেকর্ডকেও ছাপিয়ে গেছে। ইতালির সিরি-এ মাতানো এই মিডফিল্ডার মাঠের লড়াইয়ে যেমন অদম্য, ড্রেসিংরুমে তেমনই জনপ্রিয়। স্মিথের ভাষায় তিনি দলের ‘সুপার মারিও’, যিনি বড় ম্যাচে ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হন এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন।

র‍্যাঙ্কিং: ৪৩

অংশগ্রহণ: ৯

ডাকনাম: টার্টান আর্মি

সর্বোচ্চ সাফল্য: গ্রুপ পর্ব

বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ড

ম্যাচ জয় হার ড্র

২৩ ৪ ১২ ৭

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত