Ajker Patrika

আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনাল আজ: মহারণে শেষ হাসি কার

রানা আব্বাস, নিউইয়র্ক থেকে
আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনাল আজ: মহারণে শেষ হাসি কার

বিশ্বকাপ শুরুর আগের দিন উপস্থিত সাংবাদিকদের নিউইয়র্ক-নিউজার্সি স্টেডিয়াম ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন ফিফার কর্মকর্তারা। সেদিন খুব কাছ থেকে নিউজার্সি স্টেডিয়ামের অন্দর দেখার সুযোগ হয়েছিল। ড্রেসিংরুম, ডাগআউট থেকে শুরু করে ঘন ঘাসের বুননে তৈরি সবুজ মাঠের কাছে দাঁড়িয়ে সেদিন ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন ছিল—এ মাঠেই ১৯ জুলাই শিরোপার লড়াইয়ে নামবে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা আর ইয়ামালদের স্পেন।

তান্ত্রিক কিংবা সুপার কম্পিউটারের ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক হোক বা না হোক—এটা জ্বলন্ত সূর্যের মতো সত্য, নিউজার্সির এই বিকেলে শিরোপার লড়াইয়ে নামছে আর্জেন্টিনা-স্পেন। সেই লড়াই ঘিরে গোটা ফুটবল পৃথিবী তুমুল উন্মাদনা। প্রশ্ন এটাই, মেসিদের হাত ধরে আবারও লাতিন ফুটবলের জয়ধ্বনি নাকি ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম মশালধারী স্প্যানিশ দর্শনেরই জয়—জানা যাবে ১৯ জুলাইয়ে সন্ধ্যায়, যখন মেসি কিংবা রদ্রি সতীর্থদের নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠবেন নিখাঁদ সোনায় তৈরি ঝকঝকে ট্রফি নিয়ে।

বিশ্বকাপের কঠিন সব পথ পেরিয়ে দুই দল মিলেছে যে মাঠে, সেই স্টেডিয়ামের সঙ্গে এক বেদনাদায়ক অধ্যায় লেখা মেসির। এক দশক আগে যে কান্না গোটা ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল, ঠিক সেই মঞ্চেই ভাগ্য এবার তাঁকে এনে দাঁড় করিয়েছে চূড়ান্ত পরীক্ষার সামনে। ফিফার নিয়মে বিশ্বকাপের কোনো ভেন্যুর নামের আগে পৃষ্ঠপোষকের নাম থাকতে পারবে না। না হলে অনায়াসে বলা যেত অতিপরিচিত নামটাই ‘মেটলাইফ স্টেডিয়াম’। এই মেটলাইফ সেই মাঠ, যেখানে মেসি তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন ও হৃদয়বিদারক মুহূর্তের মুখোমুখি হয়েছিলেন। আর্জেন্টিনা অধিনায়ক আবারও ফিরছেন সেই মাঠে, যেখানে একসময় তিনি সবার সামনে ভেঙে পড়েছিলেন। সেই পুরোনো ক্ষত অনেকটাই সেরে উঠলেও এই প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে নতুন করে জাগিয়ে তুলছে বহু স্মৃতি। যে বেদনাময় স্মৃতি ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওর ফাইনালের। সেদিন চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। মেসি নিজে সে ম্যাচে পেনাল্টি মিস করেন।

ম্যাচ শেষে টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল এক অসহায় মেসিকে। নিউজার্সি স্টেডিয়ামের বেঞ্চে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন তিনি। হতাশা ও যন্ত্রণায় বিধ্বস্ত সেই দৃশ্য ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে আছে আজও। পরাজয়ের পর সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে মেসি ঘোষণা করেছিলেন জাতীয় দল থেকে অবসরের। তাঁর এই ঘোষণা পুরো আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল, বিশ্ব ফুটবলে সৃষ্টি করেছিল তুমুল আলোড়ন।

মেসি এবার নিউজার্সি স্টেডিয়ামে ফিরছেন বিদায় জানাতে নয়, বরং আমেরিকার মাটিতে অপূর্ণ থেকে যাওয়া শেষ স্বপ্নটি পূরণ করতে। লিওনেল স্কালোনির দল পুরো টুর্নামেন্টে কঠিন সব প্রতিপক্ষকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে রয়েছে। তবে যে মাঠ একদিন বিশ্বের সেরা ফুটবলারের চোখের জল দেখেছিল, সেখানে মানসিক দৃঢ়তাই হতে পারে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ স্পেন, যার বিপক্ষে খেলোয়াড়দের অনেককেই মেসি দীর্ঘদিন ধরে চেনেন বার্সেলোনায় কাটানো তাঁর গৌরবময় সময়ের সুবাদে।

এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার যাত্রায় বারবার টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্পই বেশি। শারীরিক ও কৌশলগত—দুই দিক থেকেই একাধিকবার কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে তারা। তবু প্রতিবারই সমাধান খুঁজে নিয়ে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে এগিয়ে গেছে লিওনেল স্কালোনির দল।

গ্রুপপর্ব অবশ্য সহজেই পেরিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। নকআউট পর্বে শুরু হয় আসল পরীক্ষা। শেষ ৩২-এর ম্যাচে কেপ ভার্দে আর্জেন্টিনাকে দারুণ চাপে ফেলে। অতিরিক্ত সময়ে এসে খেলোয়াড়দের ক্লান্তিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শেষ ষোলোয় মিসরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে প্রায় বিদায় নিতে বসেছিল আর্জেন্টিনা। শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ম্যাচ জেতে তারা—যদিও সেই ম্যাচে রেফারির কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও বিপদে পড়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। ম্যাচ যখন ১-১, তখন সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এম্বোলো লাল কার্ড দেখলে ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তায় ছিল ম্যাচ। কিন্তু আবারও ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা।

এই পুরো অভিযানে যথারীতি আর্জেন্টিনার কেন্দ্রে মেসি। তবে স্কালোনির দলের আরেকটি বড় শক্তি, শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা। ঝড় সামলে ম্যাচে টিকে থাকা এবং শেষ দিকে গোল করে জয় ছিনিয়ে আনার অসাধারণ ক্ষমতা তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে।

স্পেনের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হয়েছিল বড় এক ধাক্কা দিয়ে। আফ্রিকার নবাগত দল কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করেছিল তারা। তবে দ্বিতীয় ম্যাচেই ঘুরে দাঁড়ায় লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। স্প্যানিশদের শুরুর পরিকল্পনাই ছিল ধীরে ধীরে নিজেদের সেরা ছন্দে ফেরা। শেষ ৩২-এর ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেয় স্পেন। শেষ ষোলোতে পর্তুগালের বিপক্ষে জমাট লড়াইয়ে বদলি হিসেবে নেমে ৯১তম মিনিটে জয়সূচক গোল করেন মিকেল মেরিনো। সেই গোলেই শেষ হয়ে যায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার। কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন আরও দুর্দান্ত। বেলজিয়ামের বদলি গোলরক্ষক সেনে লামেন্সের ভুলের সুযোগ নিয়ে আবারও গোল করেন ‘সুপার সাব’ মেরিনো। স্পেনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা আসে সেমিফাইনালে, টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট ফ্রান্সের বিপক্ষে। আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই বিভাগেই অসাধারণ পারফরম্যান্সে ২-০ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় স্পেন।

বল দখলে আধিপত্য, নিখুঁত সমন্বয় এবং বল হারানোর পর দুর্দান্ত প্রেসিং—এই তিনটিই স্পেনের মূল পরিচয়। প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময় ছুটতে বাধ্য করে মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্লান্ত করে দেওয়াই তাদের অন্যতম কৌশল। তবে শুধু বল ধরে রাখাই নয়, খেলোয়াড়দের ক্রমাগত অবস্থান বদল, দ্রুত দৌড় এবং আক্রমণে ফুল-ব্যাকদের অংশগ্রহণ স্পেনকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে।

বল হারানোর পর তা দ্রুত পুনরুদ্ধারেও স্পেন অসাধারণ। সামনে থেকে প্রেসিং করেন ফরোয়ার্ডরা, আর পাউ কুবারসি ও এমেরিক লাপোর্তে উঁচু লাইনে দাঁড়িয়ে পুরো দলকে সামনে ঠেলে রাখেন। এই কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু রদ্রি। মাঝমাঠে তার অবস্থান, বল পুনরুদ্ধার এবং প্রতি-আক্রমণ নষ্ট করার দক্ষতা স্পেনের সবচেয়ে বড় ভরসা। সুস্পষ্ট কৌশল, নিখুঁত সমন্বয় এবং ইয়ামালের সৃজনশীলতা মিলিয়ে আর্জেন্টিনার কাছ থেকে শিরোপা কেড়ে নিতে তৈরি স্পেন।

আর্জেন্টিনার বড় শক্তি অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতা, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হার না মানা এবং অবশ্যই জাদুকর লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার ১৯ গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে ৭৫ মিনিটের পর। ম্যাচ যত গড়িয়েছে, তত বেশি বিপজ্জনক হয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। প্রতিপক্ষ যদি গভীরে নেমে যায়, তবে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ধীরে ধীরে আক্রমণ গড়ে তোলে আর্জেন্টিনা। প্রতি আক্রমণধারায় গড়ে ৫.৪টি পাস দিয়ে তারা পুরো টুর্নামেন্টে শীর্ষে রয়েছে।

আর্জেন্টিনার আক্রমণের বড় অংশই হয় মাঝমাঠের কেন্দ্র দিয়ে, যেখানে সাধারণত অবস্থান নেন মেসি। স্পেনের মতো সারাক্ষণ উঁচু প্রেসিং করে না আর্জেন্টিনা। বরং মাঝমাঠে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে বল কেড়ে নেওয়ার কৌশলই বেশি ব্যবহার করে তারা। তুলনামূলক ‘খাটো দল’ হওয়ার পরও এয়ারেও কার্যকর আর্জেন্টিনা। চারটি হেড থেকে গোল করেছে তারা, যার তিনটিই এসেছে মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে। মেসি অবশ্যই দলের কেন্দ্রবিন্দু। তবে পুরো দলকে শুধু তাঁর ওপর নির্ভরশীল বললে ভুল হবে। হুলিয়ান আলভারেসের পরিশ্রম, এনসো ফার্নান্দেসের গুরুত্বপূর্ণ গোল ও গোলবারের নিচে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের আত্মবিশ্বাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

স্পেন তুলনামূলক পরিপূর্ণ দল হলেও আর্জেন্টিনার রয়েছে অদম্য মানসিকতা এবং সংকটময় মুহূর্তে অসাধারণ কিছু সৃষ্টি করার বিরল ক্ষমতা। দুই দলের ঐতিহাসিক সম্পর্ক কয়েক শতাব্দীর পুরোনো। ফুটবলে মুখোমুখি হয়েছে ১৪ বার। দুই দলেরই জয় ৬টি করে আর ড্র ২টি ম্যাচ। বিশ্বকাপে তাদের একমাত্র দেখা হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।

এবারের ফাইনালে দুই দলের ৫২ সদস্যের স্কোয়াডের মধ্যে ২৪ জনই স্প্যানিশ ক্লাবে খেলেন। একে অন্যের খেলা সম্পর্কে তাঁদের খুব ভালো ধারণা রয়েছে। দারুণ বন্ধুতা দুই দলের প্রধান কোচের মধ্যেও। চেনা বন্ধুরাই আজ ‘শত্রু’ হয়ে যাবেন। কেউ শত্রু হবেন বুকে ‘চার তারকা’ দেখতে, কেউ চাইবেন ১৬ বছর পর আরেকটি শিরোপা জিতে জার্সিতে ‘দুই তারকা’ বসাতে। আর এ সাফল্যের তারার সন্ধানে ছুটতে থাকা তারকারাজির আলোয় আলোকিত হবে নিউজার্সির আকাশ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত