Ajker Patrika

পোরোর জন্য একটি সুযোগই যথেষ্ট

আনোয়ার সোহাগ, ঢাকা
পোরোর জন্য একটি সুযোগই যথেষ্ট
ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে স্পেনের দ্বিতীয় গোলের পর গোলদাতা পেদ্রো পোরোর উদ্‌যাপন। ছবি: এএফপি

নায়ক হওয়ার জন্য পেদ্রো পোরোর নাম কেউ আগে থেকে লিখে রাখেনি। এমন মঞ্চে আলোটা সাধারণত ফরোয়ার্ডদের জন্যই তোলা থাকে। গোল করলে তাঁদের নিয়ে কথা হয়, ম্যাচ জিতলে তাঁদের মুখই ছাপা হয় পরদিনের পত্রিকায়। রাইটব্যাকের কাজ বরং উল্টো; তাঁদের পারফরম্যান্সে পূর্ণতা মেলে তখনই, যখন আলাদা করে কাউকে কথা বলতে হয় না। নিজের কাজটা নিঃশব্দে করতেই ভালোবাসেন তাঁরা।

ডালাসের রাতে পোরোও শুরু করেছিলেন ঠিক সেই কাজ দিয়েই। সামনে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, ব্রাডলি বারকোলার মতো ফুটবলার। বিশেষ করে শিল্পীর তুলির আঁচড়ের মতো পাস দেওয়া ওলিসেকে সামলানোই ছিল গুরুদায়িত্ব। এমন এক ম্যাচে, যেখানে এক মুহূর্তের ভুল পুরো টুর্নামেন্ট শেষ করে দিতে পারে। সেখানে পোরো নিজের সহজাত খেলা উপহার দিয়ে এনে দিলেন সোনালি মুহূর্ত।

৫৮ মিনিটে দানি অলমোর চমৎকার লে-অফ থেকে পোরো দারুণভাবে বলটা নিলেন নিজের কাছে। নিচু শটে ফরাসি গোলরক্ষক মাইক ম্যানিয়াঁকে পরাস্ত করতে কোনো অসুবিধাই হয়নি তাঁর। জার্সির বুকে থাকা স্পেনের লোগাতে চুমু খেয়ে ছুটলেন কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে। সতীর্থরা এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। ম্যাচ তখনো শেষ হয়নি, কিন্তু মনে হচ্ছিল স্পেন ঠিক সেই জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে তারা পৌঁছাতে চেয়েছিল।

এমনটাই যেন হওয়ার কথা ছিল। পেদ্রো পোরো একবার বলেছিলেন, ‘আমাকে কোনো কারাগারে ছেড়ে দিন, আর দেখবেন শেষমেশ পুরো কারাগারটাই আমার দখলে চলে গেছে।’ কথাটি ছিল আত্মবিশ্বাসের, নিজের ওপর অগাধ বিশ্বাসের। ডালাসে সেটি যেন ফুটবলের ভাষা পেল। তাঁকে একবার ফ্রান্সের পেনাল্টি বক্সে ঢোকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, আর সেই মুহূর্তটুকুই তিনি নিজের করে নিলেন; যা কখনো কল্পনা করতে পারেননি। যে ম্যাচে তাঁর প্রথম কাজ ছিল প্রতিপক্ষের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগকে আটকে রাখা, সেখানে তিনিই লিখলেন আক্রমণের শেষ শব্দটি।

রক্ষণ ও আক্রমণের ভারসাম্য নিয়ে পোরো বলেন, ‘এটি নির্ভর করে আপনি কার বিপক্ষে খেলছেন, তার ওপর। বেলজিয়ামের বিপক্ষে আমি মূলত পুরো ম্যাচে জেরেমি ডকুকে বোতলবন্দী করে রেখেছিলাম। আমি সত্যি বলতে পুরো ম্যাচে মাত্র একবারই ওপরে উঠেছিলাম এবং ওটাই ছিল আমাদের গোল।’

পেদ্রো পোরোর আজকের নায়ক হয়ে ওঠার গল্পটা কিন্তু শুধু এই ৯০ মিনিটের নয়। ২০১০ বিশ্বকাপে স্পেন যখন চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, পোরো তখন ১০ বছরের শিশু। ছোট্ট দন বেনিতো শহরে নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে বাবা-মা যখন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতেন, তখন তাঁর দাদা আন্তোনিও ছোট্ট পোরোকে জোগাতেন ফুটবলের প্রেরণা।

প্রতিভার কারণে ১৪ বছর বয়সেই পোরো সুযোগ পান রায়ো ভায়েকানো একাডেমিতে। এরপর জিরোনা, ম্যানচেস্টার সিটি, স্পোর্টিং লিসবন ঘুরে এখন তিনি সামলাচ্ছেন টটেনহামের রক্ষণ। ক্যারিয়ারের পথটা সহজ ছিল না। কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাস কখনো হারাননি, ‘আমার কাউকে কিছু প্রমাণ করার দরকার নেই। ছোটবেলা থেকেই বিনয়ের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করেছি।’ একই সঙ্গে স্বীকারও করেছেন, এমন বিশ্বকাপের স্বপ্ন তিনি নিজেও দেখেননি।

ম্যাচ শেষে ক্লান্ত শরীরে ডাগআউটে বসে পোরো যখন গ্যালারির ‘ওলে’ ‘ওলে’ ধ্বনি শুনছিলেন, তখনো তাঁর পা মাটিতেই ছিল, ‘স্পেন এবং দলের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়াই আমার কাজ। তবে আমার মনে হয়, আজ আমার গোলের কথা নয়; আজ আমাদের সবার, ২৬ জন খেলোয়াড়ের পরিশ্রমের দিন। যারা দেশে আছে, যারা এখানে আছে, আমাদের পরিবার সবাই এই যাত্রার অংশ। এখন আমাদের শুধু ফাইনালের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।’

ফাইনালে বরাবরের মতো রক্ষণেই মনোযোগ থাকবে পোরোর। তবে গোল করে ফেললেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। মানুষ তাঁর স্বপ্নের চেয়েও বড়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত