আজকের পত্রিকা ডেস্ক

একটা নীল রঙের ফুল আছে, যার নাম ফরগেট-মি-নট (Forget-me-not)। এই ফুলের সঙ্গে একটা লোককথা জড়িত। মর্মস্পর্শী ওই কাহিনীটি এমন যে, জার্মানির এক নাইট তাঁর প্রেমিকাকে নিয়ে নদীর ধারে হাঁটছিলেন। নদীর পাড়ে ছোট সুন্দর নীল ফুলের সারি দেখতে পেয়ে ওই নাইট প্রেমিকাকে ফুল দিয়ে খুশি করতে চান। ফুল তুলতে গিয়ে পাড় ভেঙে ভারী বর্মসহ নদীতে পড়ে যান ওই নাইট। ভেসে যেতে যেতে ফুলগুলো প্রেমিকার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আমাকে ভুলে যেও না।’ সেই থেকেই এই ফুলের নাম ‘ফরগেট-মি-নট’। তবে সেই প্রেমিকা নাইটকে আজীবন মনে রেখেছিলেন কি না তা জানা যায়নি।
অনেকে আমাদের মনে থেকে যায়, আবার অনেকের স্মৃতি হারিয়ে যায় সময়ের অতল গহ্বরে। তবে বছরের পর বছর অনেক কিছু স্মৃতিতে ধারণ কিংবা ভুলে যাওয়া কোনটা ভালো এ নিয়ে প্রশ্ন জাগেই। আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিউরোসায়েন্টিস্ট চরণ রঙ্গনাথ।
চরণ তাঁর নতুন বই ‘হোয়াই উই রিমেম্বার’-এ যুক্তি দিয়েছেন, অসম্পূর্ণ স্মৃতি এবং ভুল স্মৃতিচারণ মনের অপরিহার্য উপাদান। তাঁর মতে, ‘স্মৃতি, কেবল একটি আর্কাইভ নয়, বরং এমন একটি প্রিজম, যার মাধ্যমে আমরা নিজেদের, অন্যদের এবং বিশ্বকে দেখি।’
রঙ্গনাথ গত ৩০ বছর ধরে স্মৃতিশক্তি, স্মরণ করা এবং ভুলে যাওয়ার ক্ষমতার পেছনের মস্তিষ্কের প্রক্রিয়াগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি মনে করেন, স্মৃতি সম্পর্কে আমাদের বহু প্রচলিত ধারণাই ভুল। যেসব বিষয়কে আমরা স্মৃতির ত্রুটি বা দুর্বলতা বলে ভাবি, সেগুলোর অনেকটাই আসলে স্মৃতির সবচেয়ে কার্যকর বৈশিষ্ট্য থেকেই জন্ম নেয়। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই আমাদের মানসিক নমনীয়তা তৈরি করে, যা মানবজাতির টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্মৃতি ও মস্তিষ্ক নিয়ে এই আধুনিক গবেষণার ধারণা এবং কীভাবে এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে আমাদের ‘সম্পূর্ণ হলেও অপূর্ণ’ মনকে আরও ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা করেছেন রঙ্গনাথ।
এরর-ড্রাইভেন লার্নিং বা ভুল করার মাধ্যমে শেখা
নিউরনগুলোর মধ্যকার সংযোগের শক্তির পরিবর্তনের মাধ্যমে স্মৃতি তৈরি হয়। এখন, এই সংযোগগুলোর মধ্যে কিছু হয়তো খুব একটা কার্যকর হয় না, আবার কিছু অনেক শক্তিশালী এবং কার্যকর হয়। ত্রুটি-নির্ভর শেখার মূল ধারণা হলো, আপনি যখনই এই স্মৃতিগুলো মনে করার চেষ্টা করবেন, আপনার স্মৃতিচারণ সব সময়ই কিছুটা অসম্পূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ হবে। এই সময় মস্তিষ্ক যখন স্মৃতিটি বের করার চেষ্টা করে এবং আপনি সেটিকে আসল তথ্যের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন নিউরাল নেটওয়ার্কগুলো দুর্বল সংযোগগুলোকে আরও দুর্বল করে দেয় এবং ভালো সংযোগগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
এর অর্থ হলো, আমরা যে বিষয়টি শিখতে চাই, তা বারবার মনে করার চেষ্টা করা সবচেয়ে কার্যকর। কারণ এতে আমাদের দুর্বল দিকগুলো সামনে আসে এবং মস্তিষ্ক স্মৃতিকে আরও উন্নত করার সুযোগ পায়। এ কারণে ‘অ্যাকটিভ লার্নিং’ বা সক্রিয় শেখার পদ্ধতি এত ফলপ্রসূ হয়ে থাকে। যেমন, গুগল ম্যাপে দেখার বদলে নিজে গাড়ি চালিয়ে কোনো এলাকা ঘুরে দেখা, অথবা নাটকের চিত্রনাট্য বারবার পড়ার চেয়ে মঞ্চে অভিনয় করা। এগুলো মস্তিষ্ককে ভুল ধরতে এবং সংযোগগুলো অপটিমাইজ করতে সাহায্য করে।
ভুলে যাওয়া কি আসলেই উপকারী
আমাদের মধ্যে অনেকেই স্মৃতি হাতড়ে কোনো তথ্য না পেয়ে হতাশ হই, কিন্তু কিন্তু রঙ্গনাথ বলেন, ভুলে যাওয়াই প্রায়ই উপকারী। তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘ধরা যাক, আমি আপনার বাড়িতে গিয়েছি। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কেন কোনো জিনিস জমিয়ে রাখেন না? সবকিছু কেন সংরক্ষণ করেন না? এই যে আমরা যদি সব জমিয়ে রাখতাম, তাহলে ঘরে জঞ্জালে ভরে যেত। তেমনি আমরা যদি কোনো কিছুই না ভুলতাম, তবে স্মৃতির স্তূপ জমে যেন। যখন যে তথ্যটি প্রয়োজন, তখন সেটি কখনোই খুঁজে পেতাম না।’
রঙ্গনাথ বলতে থাকেন, ‘ধরুন, আপনি ঘুরতে গিয়ে একটা হোটেলে উঠলেন। দুই দিন থেকে ফিরে আসলেন। দুই সপ্তাহ পর ওই হোটেলের রুম নম্বর মনে রাখা কি আপনার প্রয়োজন? এটা মনে রাখা তো কোনো অর্থ বহন করে না। একইভাবে, রাস্তায় পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া হাজারো মানুষের কথা ভাবুন। আপনার কি সত্যিই তাদের সবার মুখ মনে রাখার প্রয়োজন আছে?

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ভুলোমনা হওয়া
রঙ্গনাথের মতে, ‘বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাটি আসলে এমন নয় যে আমরা স্মৃতি তৈরি করতে পারছি না; বরং সমস্যা হলো আমরা যে তথ্যটি মনে রাখা প্রয়োজন সেটির ওপর মনোযোগ দিতে পারছি না। আমরা খুব সহজেই বিভ্রান্ত বা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি, ফলে অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিষয় আমাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের জায়গা দখল করে নেয়। তাই যখন আমরা কোনো স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করি, তখন আমরা ঠিক যে তথ্যটি খুঁজছি সেটি আর খুঁজে পাই না।’
যেভাবে বাড়াতে পারেন স্মৃতিশক্তি
রঙ্গনাথ স্মৃতির গুণমান উন্নত করার জন্য তিনটি মূল নীতি উল্লেখ করেন—
১. স্বাতন্ত্র্য (Distinctiveness) :
স্মৃতিগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। তাই কিছুই মনে রাখতে চাইলে তা যতটা সম্ভব আলাদা বা চোখে পড়ার মতো হওয়া উচিত। যেসব স্মৃতি বিশেষ কোনো দৃশ্য, শব্দ বা অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত, সেগুলোই বেশি দিন মনে থাকে। কেবল চিন্তার জগতে আটকে না থেকে আমাদের দেখার, শোনার বা স্পর্শের অনুভূতিগুলোতে মনোযোগ দিলে স্মৃতিশক্তি আরও উন্নত হয়।
২. স্মৃতির বিন্যাস (Organisation) :
স্মৃতিগুলোকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে যাতে সেগুলো আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। বইটিতে রঙ্গনাথ ‘মেমোরি প্যালেস’ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে নতুন শিখতে চাওয়া তথ্যকে আগে জানা তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এটি স্মৃতি আরও জোরালো হয় এবং মনে রাখা সহজ হয়।
৩. সূত্র বা ইঙ্গিত তৈরি করা (Creating Cues) :
প্রয়োজনের সময় কোনো স্মৃতি খুঁজে বের করা বেশ কষ্টসাধ্য এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে এর চেয়ে স্মৃতি যদি নিজে থেকেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে তবে তা বেশি কার্যকর। ইঙ্গিত তৈরি করলে এটি ঘটা সম্ভব। যেমন, কোনো গান শুনলে আমাদের কোনো বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে যেতে পারে। আবার প্রতিদিন দরজার কাছে গেলে ময়লার ঝুড়িটি দেখলেই মনে পড়ে যায় ময়লা ফেলার কথা। বিভিন্ন সূত্র বা ইঙ্গিত এভাবেই আমাদের স্মৃতি উন্নত করে থাকে।
স্মৃতিতে ভুল বা অতিরিক্ত তথ্য জায়গা নেয় যেভাবে
খেয়াল করলে দেখবেন, আমাদের মনে থাকা কিছু ঘটনা আসল ঘটনার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না। রঙ্গনাথের মতে, এর কয়েকটি কারণ আছে—
১. ‘স্কিমা’ বা মানসিক কাঠামো:
মস্তিষ্কে ‘স্কিমা’ নামে এক ধরনের কাঠামো আছে যা আমাদের স্মৃতি সংরক্ষণ সহজ করে। ধরা যাক, আপনি ব্যাংকে গিয়েছেন। ব্যাংকে কী ধরনের ঘটনা ঘটে এবং কী ঘটে না, তার একটি পূর্বধারণা আপনার কাছে আগে থেকে থাকে। এই স্কিমাগুলো আমাদের স্মৃতিতে কতটুকু নতুন তথ্য সংরক্ষণ ও সংযুক্ত করতে হবে তা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। তবে কখনো কখনো স্কিমাগুলো স্মৃতিতে থাকা শূন্যস্থানগুলো পূরণ করতে গিয়ে অতিরিক্ত ভুল তথ্য যোগ করে ফেলে।
২. সময়ের সঙ্গে স্মৃতির পরিবর্তন:
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতির পরিবর্তন দেখা যায়। এটা হওয়াও জরুরি। কারণ স্মৃতির হালনাগাদ না হলে সঠিক তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। ধরুন, অনেকদিন পর আপনার কোনো আত্মীয়র সঙ্গে দেখা হলো, স্বাভাবিকভাবেই তার চেহারায় পরিবর্তন এসেছে। এখন আগে স্মৃতিতে তিনি যেমন ছিলেন, সেটার পরিবর্তে নতুন স্মৃতি তৈরি করার প্রয়োজন হয়। তবে এই প্রক্রিয়ায় মাঝে মাঝে আমাদের কল্পনাশক্তি স্মৃতিতে ঢুকে যায়, যা ভুল বা অতিরিক্ত তথ্যের জন্ম দেয়।
এ কারণে আমাদের স্মৃতি কখনো কখনো সম্পূর্ণ নির্ভুল থাকে না, যদিও এটাই আমাদের মস্তিষ্কের তথ্য সংরক্ষণ ও মানিয়ে নেওয়ার একটি প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য।
স্মৃতি সহযোগিতায় পরিবর্তনযোগ্য
রঙ্গনাথ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘যখন আমরা অন্য মানুষের সঙ্গে আমাদের স্মৃতি ভাগ করি, তখন তা আপডেট হওয়ার সুযোগ পায়। ধরুন, আমি আপনাকে একটা গল্প বলছি। আপনাকে বলার জন্য গল্পটি সাজানোর প্রক্রিয়াটিই আমার মনে রাখার ধরনকে বদলে দিতে পারে। আবার গল্পটি শুনে আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল, তা পরবর্তীতে আমার স্মৃতিকে প্রভাবিত করবে; হয়তো ঘটনাটি আমার কাছে আরও বেশি হাস্যকর হয়ে উঠবে।’
‘অথবা কোনো বিষয়ে আপনি হয়তো আমাকে এমন কিছু অতিরিক্ত তথ্য দিলেন, যা আসলে ভুল ছিল। সেটি আমার স্মৃতিতে জায়গা করে নিলে বাস্তবে কী ঘটেছিল আর আপনি বলার সময় কী বলেছিলেন, এই দুইয়ের মধ্যে আমি দ্বিধায় পড়ে যেতে পারি। এক্ষেত্রে বলা যায়, আমাদের অনেক স্মৃতিই এখন আর আমাদের নিজস্ব নয়, সেগুলো সম্মিলিত বা যৌথ স্মৃতি।’
নিজের লেখা ‘হোয়াই উই রিমেম্বার’ বইটি সম্পর্কে রঙ্গনাথ বলেন, ‘এই বইটি লিখতে গিয়ে আমার স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখেছি। স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যাপারে এটি আমাকে উৎসাহ জুগিয়েছে। আমি এখন নিয়মিত ব্যায়াম করার চেষ্টা করছি। খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে অনেক সচেতন হয়েছি, যাতে বৃদ্ধ বয়সে আমার মস্তিষ্ক সুস্থ থাকে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে।’
চরণ রঙ্গনাথের বইটি নিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক ডেভিড রবসন। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই সাক্ষাৎকারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

একটা নীল রঙের ফুল আছে, যার নাম ফরগেট-মি-নট (Forget-me-not)। এই ফুলের সঙ্গে একটা লোককথা জড়িত। মর্মস্পর্শী ওই কাহিনীটি এমন যে, জার্মানির এক নাইট তাঁর প্রেমিকাকে নিয়ে নদীর ধারে হাঁটছিলেন। নদীর পাড়ে ছোট সুন্দর নীল ফুলের সারি দেখতে পেয়ে ওই নাইট প্রেমিকাকে ফুল দিয়ে খুশি করতে চান। ফুল তুলতে গিয়ে পাড় ভেঙে ভারী বর্মসহ নদীতে পড়ে যান ওই নাইট। ভেসে যেতে যেতে ফুলগুলো প্রেমিকার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আমাকে ভুলে যেও না।’ সেই থেকেই এই ফুলের নাম ‘ফরগেট-মি-নট’। তবে সেই প্রেমিকা নাইটকে আজীবন মনে রেখেছিলেন কি না তা জানা যায়নি।
অনেকে আমাদের মনে থেকে যায়, আবার অনেকের স্মৃতি হারিয়ে যায় সময়ের অতল গহ্বরে। তবে বছরের পর বছর অনেক কিছু স্মৃতিতে ধারণ কিংবা ভুলে যাওয়া কোনটা ভালো এ নিয়ে প্রশ্ন জাগেই। আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিউরোসায়েন্টিস্ট চরণ রঙ্গনাথ।
চরণ তাঁর নতুন বই ‘হোয়াই উই রিমেম্বার’-এ যুক্তি দিয়েছেন, অসম্পূর্ণ স্মৃতি এবং ভুল স্মৃতিচারণ মনের অপরিহার্য উপাদান। তাঁর মতে, ‘স্মৃতি, কেবল একটি আর্কাইভ নয়, বরং এমন একটি প্রিজম, যার মাধ্যমে আমরা নিজেদের, অন্যদের এবং বিশ্বকে দেখি।’
রঙ্গনাথ গত ৩০ বছর ধরে স্মৃতিশক্তি, স্মরণ করা এবং ভুলে যাওয়ার ক্ষমতার পেছনের মস্তিষ্কের প্রক্রিয়াগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি মনে করেন, স্মৃতি সম্পর্কে আমাদের বহু প্রচলিত ধারণাই ভুল। যেসব বিষয়কে আমরা স্মৃতির ত্রুটি বা দুর্বলতা বলে ভাবি, সেগুলোর অনেকটাই আসলে স্মৃতির সবচেয়ে কার্যকর বৈশিষ্ট্য থেকেই জন্ম নেয়। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই আমাদের মানসিক নমনীয়তা তৈরি করে, যা মানবজাতির টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্মৃতি ও মস্তিষ্ক নিয়ে এই আধুনিক গবেষণার ধারণা এবং কীভাবে এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে আমাদের ‘সম্পূর্ণ হলেও অপূর্ণ’ মনকে আরও ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা করেছেন রঙ্গনাথ।
এরর-ড্রাইভেন লার্নিং বা ভুল করার মাধ্যমে শেখা
নিউরনগুলোর মধ্যকার সংযোগের শক্তির পরিবর্তনের মাধ্যমে স্মৃতি তৈরি হয়। এখন, এই সংযোগগুলোর মধ্যে কিছু হয়তো খুব একটা কার্যকর হয় না, আবার কিছু অনেক শক্তিশালী এবং কার্যকর হয়। ত্রুটি-নির্ভর শেখার মূল ধারণা হলো, আপনি যখনই এই স্মৃতিগুলো মনে করার চেষ্টা করবেন, আপনার স্মৃতিচারণ সব সময়ই কিছুটা অসম্পূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ হবে। এই সময় মস্তিষ্ক যখন স্মৃতিটি বের করার চেষ্টা করে এবং আপনি সেটিকে আসল তথ্যের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন নিউরাল নেটওয়ার্কগুলো দুর্বল সংযোগগুলোকে আরও দুর্বল করে দেয় এবং ভালো সংযোগগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
এর অর্থ হলো, আমরা যে বিষয়টি শিখতে চাই, তা বারবার মনে করার চেষ্টা করা সবচেয়ে কার্যকর। কারণ এতে আমাদের দুর্বল দিকগুলো সামনে আসে এবং মস্তিষ্ক স্মৃতিকে আরও উন্নত করার সুযোগ পায়। এ কারণে ‘অ্যাকটিভ লার্নিং’ বা সক্রিয় শেখার পদ্ধতি এত ফলপ্রসূ হয়ে থাকে। যেমন, গুগল ম্যাপে দেখার বদলে নিজে গাড়ি চালিয়ে কোনো এলাকা ঘুরে দেখা, অথবা নাটকের চিত্রনাট্য বারবার পড়ার চেয়ে মঞ্চে অভিনয় করা। এগুলো মস্তিষ্ককে ভুল ধরতে এবং সংযোগগুলো অপটিমাইজ করতে সাহায্য করে।
ভুলে যাওয়া কি আসলেই উপকারী
আমাদের মধ্যে অনেকেই স্মৃতি হাতড়ে কোনো তথ্য না পেয়ে হতাশ হই, কিন্তু কিন্তু রঙ্গনাথ বলেন, ভুলে যাওয়াই প্রায়ই উপকারী। তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘ধরা যাক, আমি আপনার বাড়িতে গিয়েছি। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কেন কোনো জিনিস জমিয়ে রাখেন না? সবকিছু কেন সংরক্ষণ করেন না? এই যে আমরা যদি সব জমিয়ে রাখতাম, তাহলে ঘরে জঞ্জালে ভরে যেত। তেমনি আমরা যদি কোনো কিছুই না ভুলতাম, তবে স্মৃতির স্তূপ জমে যেন। যখন যে তথ্যটি প্রয়োজন, তখন সেটি কখনোই খুঁজে পেতাম না।’
রঙ্গনাথ বলতে থাকেন, ‘ধরুন, আপনি ঘুরতে গিয়ে একটা হোটেলে উঠলেন। দুই দিন থেকে ফিরে আসলেন। দুই সপ্তাহ পর ওই হোটেলের রুম নম্বর মনে রাখা কি আপনার প্রয়োজন? এটা মনে রাখা তো কোনো অর্থ বহন করে না। একইভাবে, রাস্তায় পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া হাজারো মানুষের কথা ভাবুন। আপনার কি সত্যিই তাদের সবার মুখ মনে রাখার প্রয়োজন আছে?

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ভুলোমনা হওয়া
রঙ্গনাথের মতে, ‘বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাটি আসলে এমন নয় যে আমরা স্মৃতি তৈরি করতে পারছি না; বরং সমস্যা হলো আমরা যে তথ্যটি মনে রাখা প্রয়োজন সেটির ওপর মনোযোগ দিতে পারছি না। আমরা খুব সহজেই বিভ্রান্ত বা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি, ফলে অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিষয় আমাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের জায়গা দখল করে নেয়। তাই যখন আমরা কোনো স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করি, তখন আমরা ঠিক যে তথ্যটি খুঁজছি সেটি আর খুঁজে পাই না।’
যেভাবে বাড়াতে পারেন স্মৃতিশক্তি
রঙ্গনাথ স্মৃতির গুণমান উন্নত করার জন্য তিনটি মূল নীতি উল্লেখ করেন—
১. স্বাতন্ত্র্য (Distinctiveness) :
স্মৃতিগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। তাই কিছুই মনে রাখতে চাইলে তা যতটা সম্ভব আলাদা বা চোখে পড়ার মতো হওয়া উচিত। যেসব স্মৃতি বিশেষ কোনো দৃশ্য, শব্দ বা অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত, সেগুলোই বেশি দিন মনে থাকে। কেবল চিন্তার জগতে আটকে না থেকে আমাদের দেখার, শোনার বা স্পর্শের অনুভূতিগুলোতে মনোযোগ দিলে স্মৃতিশক্তি আরও উন্নত হয়।
২. স্মৃতির বিন্যাস (Organisation) :
স্মৃতিগুলোকে এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে যাতে সেগুলো আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। বইটিতে রঙ্গনাথ ‘মেমোরি প্যালেস’ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে নতুন শিখতে চাওয়া তথ্যকে আগে জানা তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এটি স্মৃতি আরও জোরালো হয় এবং মনে রাখা সহজ হয়।
৩. সূত্র বা ইঙ্গিত তৈরি করা (Creating Cues) :
প্রয়োজনের সময় কোনো স্মৃতি খুঁজে বের করা বেশ কষ্টসাধ্য এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে এর চেয়ে স্মৃতি যদি নিজে থেকেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে তবে তা বেশি কার্যকর। ইঙ্গিত তৈরি করলে এটি ঘটা সম্ভব। যেমন, কোনো গান শুনলে আমাদের কোনো বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে যেতে পারে। আবার প্রতিদিন দরজার কাছে গেলে ময়লার ঝুড়িটি দেখলেই মনে পড়ে যায় ময়লা ফেলার কথা। বিভিন্ন সূত্র বা ইঙ্গিত এভাবেই আমাদের স্মৃতি উন্নত করে থাকে।
স্মৃতিতে ভুল বা অতিরিক্ত তথ্য জায়গা নেয় যেভাবে
খেয়াল করলে দেখবেন, আমাদের মনে থাকা কিছু ঘটনা আসল ঘটনার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না। রঙ্গনাথের মতে, এর কয়েকটি কারণ আছে—
১. ‘স্কিমা’ বা মানসিক কাঠামো:
মস্তিষ্কে ‘স্কিমা’ নামে এক ধরনের কাঠামো আছে যা আমাদের স্মৃতি সংরক্ষণ সহজ করে। ধরা যাক, আপনি ব্যাংকে গিয়েছেন। ব্যাংকে কী ধরনের ঘটনা ঘটে এবং কী ঘটে না, তার একটি পূর্বধারণা আপনার কাছে আগে থেকে থাকে। এই স্কিমাগুলো আমাদের স্মৃতিতে কতটুকু নতুন তথ্য সংরক্ষণ ও সংযুক্ত করতে হবে তা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। তবে কখনো কখনো স্কিমাগুলো স্মৃতিতে থাকা শূন্যস্থানগুলো পূরণ করতে গিয়ে অতিরিক্ত ভুল তথ্য যোগ করে ফেলে।
২. সময়ের সঙ্গে স্মৃতির পরিবর্তন:
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতির পরিবর্তন দেখা যায়। এটা হওয়াও জরুরি। কারণ স্মৃতির হালনাগাদ না হলে সঠিক তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। ধরুন, অনেকদিন পর আপনার কোনো আত্মীয়র সঙ্গে দেখা হলো, স্বাভাবিকভাবেই তার চেহারায় পরিবর্তন এসেছে। এখন আগে স্মৃতিতে তিনি যেমন ছিলেন, সেটার পরিবর্তে নতুন স্মৃতি তৈরি করার প্রয়োজন হয়। তবে এই প্রক্রিয়ায় মাঝে মাঝে আমাদের কল্পনাশক্তি স্মৃতিতে ঢুকে যায়, যা ভুল বা অতিরিক্ত তথ্যের জন্ম দেয়।
এ কারণে আমাদের স্মৃতি কখনো কখনো সম্পূর্ণ নির্ভুল থাকে না, যদিও এটাই আমাদের মস্তিষ্কের তথ্য সংরক্ষণ ও মানিয়ে নেওয়ার একটি প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য।
স্মৃতি সহযোগিতায় পরিবর্তনযোগ্য
রঙ্গনাথ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘যখন আমরা অন্য মানুষের সঙ্গে আমাদের স্মৃতি ভাগ করি, তখন তা আপডেট হওয়ার সুযোগ পায়। ধরুন, আমি আপনাকে একটা গল্প বলছি। আপনাকে বলার জন্য গল্পটি সাজানোর প্রক্রিয়াটিই আমার মনে রাখার ধরনকে বদলে দিতে পারে। আবার গল্পটি শুনে আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল, তা পরবর্তীতে আমার স্মৃতিকে প্রভাবিত করবে; হয়তো ঘটনাটি আমার কাছে আরও বেশি হাস্যকর হয়ে উঠবে।’
‘অথবা কোনো বিষয়ে আপনি হয়তো আমাকে এমন কিছু অতিরিক্ত তথ্য দিলেন, যা আসলে ভুল ছিল। সেটি আমার স্মৃতিতে জায়গা করে নিলে বাস্তবে কী ঘটেছিল আর আপনি বলার সময় কী বলেছিলেন, এই দুইয়ের মধ্যে আমি দ্বিধায় পড়ে যেতে পারি। এক্ষেত্রে বলা যায়, আমাদের অনেক স্মৃতিই এখন আর আমাদের নিজস্ব নয়, সেগুলো সম্মিলিত বা যৌথ স্মৃতি।’
নিজের লেখা ‘হোয়াই উই রিমেম্বার’ বইটি সম্পর্কে রঙ্গনাথ বলেন, ‘এই বইটি লিখতে গিয়ে আমার স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখেছি। স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যাপারে এটি আমাকে উৎসাহ জুগিয়েছে। আমি এখন নিয়মিত ব্যায়াম করার চেষ্টা করছি। খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে অনেক সচেতন হয়েছি, যাতে বৃদ্ধ বয়সে আমার মস্তিষ্ক সুস্থ থাকে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে।’
চরণ রঙ্গনাথের বইটি নিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক ডেভিড রবসন। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই সাক্ষাৎকারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। চীনা কৃষিবিজ্ঞানীরা এমন এক বৈপ্লবিক হাইব্রিড ধান উদ্ভাবন করেছেন, যা বীজের মাধ্যমে নিজেকে ‘ক্লোন’ বা হুবহু প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে। এই আবিষ্কারের ফলে প্রতিবছর কৃষকদের চড়া দামে নতুন হাইব্রিড বীজ কেনার চিরাচরিত বাধ্যবাধকতা ভেঙে
৩ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি অটোব্রুয়ারি সিনড্রোমে আক্রান্ত রোগীদের ওপর পরিচালিত এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় গবেষণায় নিশ্চিত করা হয়েছে, এই অবস্থার প্রধান হোতা আসলে ব্যাকটেরিয়া। নেচার মাইক্রোবায়োলজি সাময়িকীতে সম্প্রতি প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদন রোগীদের অন্ত্রের অণুজীবের অ্যালকোহল বিপাক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন...
৪ দিন আগে
বাঙালি পাতে এক টুকরা বড় কার্পের পেটি কিংবা মুড়িঘণ্ট না হলে ভোজন যেন অসম্পূর্ণই থেকে যায়। কিন্তু এই সুস্বাদু অভিজ্ঞতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সূক্ষ্ম কাঁটা। কার্প মাছ নিয়ে ভোজনরসিকদের ধৈর্যের পরীক্ষা হয়। এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, একটি সাধারণ কার্পে প্রায় ৮০টির বেশি ক্ষুদ্র ও ওয়াই-আকৃতির...
১৩ দিন আগে
বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী ছিল উত্তপ্ত ম্যাগমায় ঢাকা এক অনাবাসযোগ্য পাথুরে গ্রহ। আজকের নীল-সবুজ, প্রাণে ভরপুর পৃথিবীতে তার রূপান্তরের ইতিহাস এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তবে ২০২৫ সালে একের পর এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা আমাদের এই গ্রহটির অতীত, গভীরতা ও অদ্ভুত আচরণ সম্পর্কে নতুন জানালা খুলে দিয়েছ
১৬ দিন আগে