Ajker Patrika

তারেক রহমান, এক রাজনীতিকের পুনর্জন্মের গল্প

রেজা করিম, ঢাকা 
আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০: ০৭
তারেক রহমান, এক রাজনীতিকের পুনর্জন্মের গল্প
তারেক রহমান। ছবি: আজকের পত্রিকা

দীর্ঘ নির্বাসনের ধুলোমাখা পথ পেরিয়ে একদিন তিনি ফিরলেন। ফিরলেন শুধু একজন রাজনীতিক হিসেবে নয়—ফিরলেন এক পুত্র, এক উত্তরাধিকার, এক অসমাপ্ত ইতিহাসের বাহক হয়ে।

বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে বহু নক্ষত্র উঠেছে-নিভেছে। শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা—প্রথম প্রজন্মের ঝোড়ো সময়ের কেন্দ্রীয় চরিত্রেরা। আর এখন, দ্বিতীয় প্রজন্মের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন তারেক রহমান—যেন সময়ের দীর্ঘ নদী পেরিয়ে উঠে আসা একটি নাম।

বাংলাদেশের রাজনীতি কখনো নিছক ক্ষমতার গল্প ছিল; ছিল পরিবার, ট্র্যাজেডি, সংগ্রাম ও প্রত্যাবর্তনেরও গল্প। সেই গল্পের সাম্প্রতিকতম অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে আছেন তারেক রহমান—একজন মানুষ, যিনি জন্মেছিলেন রাজনীতির ভেতরে, বড় হয়েছেন অস্থিরতার মধ্যে, নির্বাসনে কাটিয়েছেন দীর্ঘ দেড় যুগ, আর ফিরে এসে দাঁড়িয়েছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের দোরগোড়ায়।

১৯৬৫ সালে জন্ম নেওয়া শিশুটি বড় হয়েছিল এমন এক ঘরে, যেখানে রাজনীতি ছিল নিত্যদিনের বাতাস। ছোটবেলা থেকেই ক্ষমতার উত্থান-পতন, আন্দোলন, সমাবেশ, ষড়যন্ত্র, নিরাপত্তা শঙ্কা—সবকিছুই ছিল তাঁর পরিচিত।

১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর যে শূন্যতা নেমে আসে, তা ছিল কেবল পারিবারিক নয়—ছিল রাষ্ট্রীয় ট্র্যাজেডি। খুব কাছে থেকে ছেলে তারেক রহমান দেখেছেন সদ্য বিধবা এক মায়ের লড়াই; গৃহকোণ থেকে জনসমুদ্রের কেন্দ্রে উঠে আসা এক নারীর দৃঢ়তা। পিতার রক্তাক্ত অধ্যায়ের পর তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন সদ্য বিধবা এক নারীর সংগ্রাম। গৃহকোণের নীরবতা ভেঙে খালেদা জিয়ার জনজীবনে প্রবেশ—একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক ধীরে ধীরে রূপ নেয় রাজনৈতিক দায়বদ্ধতায়।

সেই ধারাবাহিকতার ভেতরেই বড় হয়েছেন তারেক রহমান—দ্বিতীয় প্রজন্মের উত্তরাধিকার হিসেবে। তাঁর রাজনৈতিক পথ কখনো মসৃণ ছিল না। ৯০-এর দশকে সংগঠক হিসেবে উত্থান, তৃণমূল পুনর্গঠন, তরুণ নেতৃত্বের উন্মেষ—সবই তাঁকে দ্রুত আলোচনায় আনে। আবার অভিযোগ, মামলা, সমালোচনা—সব মিলিয়ে পথ হয়ে ওঠে কণ্টকময়। ১৯৯০-এর দশকে সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। অনেকের চোখে তিনি ছিলেন প্রথমে পুত্র, পরে নেতা; কিন্তু তৃণমূলের রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা তাঁকে আলাদা পরিচয় দেয়।

বিএনপির সাংগঠনিক পুনর্গঠন, কমিটি পুনর্বিন্যাস, তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা—এসব উদ্যোগ তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এলে তিনি কৌশল নির্ধারণে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন। তবে ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান সব সময় প্রশংসা বয়ে আনে না। সমালোচনা, প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগ, নানা মামলা—তাঁর রাজনৈতিক পথ হয়ে ওঠে কণ্টকাকীর্ণ। তারেক রহমানকেও তা সইতে হয়েছে।

২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা তাঁর জীবনে এক বড় মোড়। গ্রেপ্তার, কারাবাস, শারীরিক অসুস্থতা—সব মিলিয়ে জীবন যেন অন্য খাতে বয়ে যায়। পরে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া, আর সেখানেই শুরু দীর্ঘ নির্বাসন। তারপর বিদেশে চিকিৎসা। শুরু হয় দীর্ঘ নির্বাসন—তা-ও প্রায় দেড় যুগ।

নির্বাসন মানে কি শুধু দূরত্ব? নাকি আরও গভীর কোনো পরীক্ষা? সেই কঠিন সময়ে যুক্তরাজ্যের আকাশের নিচে থেকেও তিনি দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—ভার্চুয়াল বৈঠক, সাংগঠনিক নির্দেশনা, প্রযুক্তিনির্ভর রাজনীতির এক নতুন ধারা। দূরত্ব তাঁকে বিচ্ছিন্ন করেনি; বরং একধরনের নীরব প্রস্তুতির সময় এনে দিয়েছিল। যুক্তরাজ্যে অবস্থানের সময়টি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। আজকের জামানায় যে ভার্চুয়াল রাজনীতি খুব স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। তিনি অনেক আগে সেই পথ ধরেছিলেন। দূরদেশে বসেও তিনি দলের কৌশল, মনোনয়ন প্রক্রিয়া, আন্দোলন-সংগ্রামের নির্দেশনায় যুক্ত ছিলেন। এরপর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, পরিবর্তনের আবহ—সব মিলিয়ে দেশে ফেরার পথ সুগম হয়।

তারপর দেশে ফেরা। সেই ফেরাও ছিল নাটকীয়। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপট যেন তাঁকে ডাকছিল। ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫—বিমানবন্দর থেকে রাজপথ—মানুষের ঢল। বিমানবন্দর থেকে রাজপথ—সমর্থকদের ঢল। যেন বহু প্রতীক্ষার অবসান।

কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেও ছিল ব্যক্তিগত শোক। দেশে ফেরার অল্প সময়ের মধ্যেই মাকে হারানো—এক ব্যক্তিগত বেদনা, যা কোনো রাজনৈতিক ভাষণে ধরা যায় না। মাতৃশোকের মধ্যেই তিনি নিলেন দলের পূর্ণ দায়িত্ব। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে পূর্ণ চেয়ারম্যান। তারপরই যুদ্ধ শুরু, সরাসরি ভোটযুদ্ধ।

তাঁর ভাষণে ছিল রাষ্ট্র সংস্কার, জবাবদিহি, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। প্রচারে ছিল নতুনত্ব—তরুণ প্রার্থী, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, জোটকে এক রাখা, তৃণমূলকে পুনরুজ্জীবিত করা। তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন—যা তার আগের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন এক বাস্তবতা তৈরি করল। প্রচারাভিযানে তাঁর ভাষণে ছিল তৃণমূলকে পুনরুজ্জীবিত করা, জোটকে এক রাখা, তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জন, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রার্থী বাছাই—সব মিলিয়ে প্রচারে ছিল নতুনত্ব। সবচেয়ে বড় বিষয়—তিনি সামনে থেকে নির্বাসিত এক নেতার বদলে মাঠের নেতা হিসেবে নিজেকে হাজির করেন।

ফলাফল—নিরঙ্কুশ জয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি নির্বাচনী ফল নয়; এটি তারেক রহমানের রাজনৈতিক পুনর্জন্মের স্বীকৃতি। দেড় দশকেরও বেশি সময় পর বিএনপি আবার রাষ্ট্রক্ষমতার দুয়ারে। কিন্তু এই জয় কেবল একটি নির্বাচনী ফল নয়।

এ এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান, এক নির্বাসিত সময়ের পরিশুদ্ধি, এক বিতর্কিত অধ্যায়ের পর পুনর্জন্ম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রথম প্রজন্মের নেতৃত্ব ইতিহাস রচনা করেছে। এখন দ্বিতীয় প্রজন্মের এক নেতা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বের দিকে এগোচ্ছেন। তাঁর যাত্রা ছিল সরলরেখায় নয়—বরং ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে ওঠার মতো। একসময় যে মানুষকে ঘিরে ছিল প্রশ্ন, আজ তাঁকেই ঘিরে প্রত্যাশা। একসময় যে ছিলেন দূরে, আজ তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের দোরগোড়ায়। ইতিহাস কখনো সরলরেখায় হাঁটে না। তারেক রহমানের পথও তেমনই—ভাঙা, বাঁকানো, আলো-অন্ধকারে ভরা। তবু আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন এক নতুন অধ্যায়ের সামনে—যেখানে একজন মানুষ, যিনি জন্মেছিলেন রাজনীতির কেন্দ্রে, বড় হয়েছেন ঝড়ের মধ্যে, নির্বাসনে কাটিয়েছেন দীর্ঘ সময়।

শৈশবের ট্র্যাজেডি, যৌবনের উত্থান, বিতর্কের ঝড়, কারাবাস, নির্বাসন, মাতৃশোক—সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ প্রস্তুতি। আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন এক নতুন অধ্যায়ের সামনে। যে মানুষটি একসময় ছিলেন নির্বাসিত, আজ তিনিই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের পথে দিকে। যে পুত্র একদিন দেখেছিলেন মায়ের সংগ্রাম, আজ তিনিই হয়তো রাষ্ট্রের দায় কাঁধে নিতে চলেছেন। এ যেন প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্য, সময়ের কবিতা। আর এক রাজনীতিকের পুনর্জন্মের গল্প।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত