মানবসভ্যতার প্রারম্ভ থেকেই গণিতকে একটি অনন্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। গণিত হলো মানুষের বিশুদ্ধ মেধা, যুক্তি ও ভাবনার সর্বোচ্চ স্তম্ভ। জটিল গাণিতিক উপপাদ্য প্রমাণ করা সহজ কাজ নয়। যুগের পর যুগ অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যার সমাধান করাও বেশ কঠিন। এই কাজগুলোকে এত দিন মানুষের মস্তিষ্কের একচ্ছত্র অধিকার বলে মনে করা হতো। কিন্তু ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে এসে আমাদের ভাবনা বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের সেই চিরাচরিত অহংকারকে একটি প্রবল ঝাঁকুনি দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবিশ্বাস্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ওপেনএআইয়ের তৈরি মডেল ‘নেভিয়ার-স্টোকস’ সমস্যার সমাধান করে সবাইকে চমকে দিয়েছে। চ্যাটজিপিটি এবং ক্লড ফেবলের মতো এআই মডেলগুলোও থেমে নেই। একের পর এক গাণিতিক অচলাবস্থা ভেঙে ফেলছে এসব মডেল। এই ঘটনা গণিতবিদদের এক গভীর অস্তিত্বের সংকটে দাঁড় করিয়েছে। বর্তমানে বৈজ্ঞানিক মহল একে আখ্যা দিচ্ছে ‘গণিতের এআই অ্যাপোক্যালিপস’।
ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত সম্মেলনে এই বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়। এটি বিশ্বের গণিতবিদদের সবচেয়ে বড় একটি সম্মেলন। সেখানে বিশিষ্ট গণিতবিদ টেরেন্স তাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, গণিত গবেষণা এখন এক অভূতপূর্ব বিভ্রান্তিকর জটলার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এটি আমাদের গাণিতিক মূল্যবোধ ও অনুশীলনে গভীর সংকট তৈরি করেছে।
এই সম্মেলনের মূল আকর্ষণ থাকে ‘ফিল্ডস মেডেল’ পুরস্কার প্রদান। চার দশকের কম বয়সী সেরা গবেষকদের হাতে এই পদক তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু এবার সেখানে এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। পুরস্কার বিজয়ী তরুণ গণিতবিদ জেকব সিমারম্যান এক নতুন ঘোষণা দেন। তিনি মূল গাণিতিক গবেষণা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন থেকে তিনি এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করবেন। তিনি ওপেনএআই সংস্থায় যোগ দিচ্ছেন। গণিতজগতের সর্বোচ্চ মেধা যখন নিজে অনুভব করেন যে ‘মানুষের চেয়ে এআই গণিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে মানব গবেষকের চেয়ে এআই-ই গবেষণার মূল কাজ করবে’, তখন তিনি গণিত ছেড়ে প্রযুক্তি সংস্থায় চলে যান। এই ঘটনা তরুণ গবেষকদের মনে এই ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে যে ‘যদি ফিল্ডস মেডেলজয়ীর মতো সেরা মেধারই গণিত গবেষণায় ভবিষ্যৎ না থাকে, তবে আমাদের সাধারণ তরুণদের ক্যারিয়ার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?’
ঐতিহাসিকভাবে গণিতবিদেরা প্রযুক্তিকে শত্রু মনে করেননি। তাঁরা প্রযুক্তিকে সব সময় সমাদর করেছেন। তবে তা ছিল কেবল হিসাব-নিকাশের সহায়ক হিসেবে। জটিল ডেটা প্রসেসিং কিংবা চিত্রাঙ্কনে যন্ত্র ব্যবহৃত হতো। কিন্তু যুক্তি প্রমাণের মূল কাজ মানুষ নিজেই করত।
আজ সেই সহায়ক প্রযুক্তি নিজেই সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী হয়ে উঠছে। তাই মূল প্রশ্নটি আর কেবল প্রযুক্তির সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন প্রশ্ন উঠেছে মানুষের বোধগম্যতা ও অনুধাবনক্ষমতা নিয়ে। একজন মানুষ যখন কোনো গাণিতিক প্রমাণ উপস্থাপন করেন, তিনি কেবল ফলাফল প্রকাশ করেন না। তিনি সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সৌন্দর্য প্রকাশ করেন। তিনি প্রমাণের পেছনের কৌশল ও যুক্তির পথটি সবার সামনে উন্মোচন করেন। কিন্তু এআই সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে কাজ করে।
এআই কাজ করে কোটি কোটি অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। এটিকে একটি জটিল ‘ব্ল্যাক বক্স’ বা অন্ধকার ঘরের মতো মনে করা হয়। সেখান থেকে আসা উত্তর হয়তো ১০০ ভাগ নিখুঁত। কিন্তু তা মানুষের অনুভূতির সম্পূর্ণ বাইরে থেকে যায়। প্রযুক্তি যদি আমাদের এমন গাণিতিক সত্য মানতে বাধ্য করে, যা কোনো মানুষের পক্ষে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, তবে সেখানে তৃপ্তি কোথায়? কেবল সঠিক উত্তর পেলেই কি গাণিতিক অনুসন্ধানের মূল উদ্দেশ্য সফল হয়?
এআইয়ের এই ঝোড়ো গতি একাডেমিয়া ও শিক্ষাজগতে বড় পরিবর্তন আনছে। তরুণ গবেষকেরা তাঁদের ক্যারিয়ার নিয়ে দারুণ অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণিত বিভাগের গবেষণা তহবিলের ধরন বদলে যাচ্ছে। ঐতিহ্যগত বিশুদ্ধ গণিত গবেষণার তহবিল এখন এআই প্রজেক্টের দিকে চলে যাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ গণিত গবেষকেরা প্রয়োজনীয় অনুদান পাচ্ছেন না।
এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে গবেষণার বাণিজ্যিকীকরণ। বড় বড় এআই কোম্পানিগুলো গাণিতিক সাফল্যকে তাদের ব্যবসার কাজে লাগাচ্ছে। তারা বাজারজাতকরণ বা মার্কেটিংয়ের অস্ত্র হিসেবে গাণিতিক প্রমাণকে ব্যবহার করছে। এতে করে গণিতের মতো একটি বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র ব্যবসাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। প্রবীণ গণিতবিদেরা এই বাণিজ্যিকীকরণের তীব্র সমালোচনা করছেন।
তরুণ শিক্ষার্থীরা এখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন। তাঁরা ভাবছেন, যে কাজ যন্ত্র নিমেষেই করে দিচ্ছে, তা শিখতে কেন তাঁরা বছরের পর বছর ব্যয় করবেন? এআইয়ের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতা তরুণদের গাণিতিক চিন্তা করার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। তাঁরা কঠিন সমস্যার সঙ্গে লড়াই করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলতে পারেন।
তবে বহু বিজ্ঞানী মনে করছেন, এই সংকটই গণিতের শেষ কথা নয়। ইতিহাসে এর আগেও একাধিকবার গাণিতিক সংকট এসেছে। আজ থেকে এক শতাব্দীরও আগে, ১৯০০ সালে প্রখ্যাত গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট এক অনুরূপ সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই সময়ে গাণিতিক ভিত্তিগুলোর ভেতরে নানা স্ববিরোধী ধারণা পাওয়া গিয়েছিল। সেই সংকট সমাধান করতে গিয়ে গণিত আরও বেশি সুসংগঠিত হয়েছিল।
আজকের এআইয়ের এই ঝড়ও মানুষকে নতুন করে চিন্তা করার সুযোগ দিচ্ছে। এটি গণিতবিদদের বাধ্য করছে নিজেদের মৌলিক উদ্দেশ্য নিয়ে ভাবতে। আমাদের আবার নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কেন গণিত চর্চা করি?
গণিত কেবল কিছু সমীকরণের সঠিক উত্তর বের করার নাম নয়। গণিত হলো মানবজাতির মেধার বিকাশ এবং মহাবিশ্বের নিয়ম বোঝার একটি মাধ্যম। এআই হয়তো মুহূর্তে কঠিন সমস্যা সমাধান করে দিতে পারে। কিন্তু ‘কেন এই নির্দিষ্ট সমস্যাটি মানবজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ’—সেই উত্তর খুঁজে বের করার সক্ষমতা এআইয়ের নেই। এই দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর কেবল মানুষের মন থেকেই আসতে পারে।
ফলাফল অর্জনের দ্রুত ও অন্ধ দৌড়ে আমাদের গাণিতিক যাত্রাপথের সৌন্দর্যকে হারিয়ে ফেলা যাবে না। এআই যদি কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়, তবে মানুষকে রক্ষা করতে হবে গাণিতিক সত্যের ভাবমূর্তি। গাণিতিক আবিষ্কারকে কীভাবে মানবকল্যাণে সঠিক উপায়ে প্রয়োগ করা যায়, তা ঠিক করার দায়িত্ব মানুষের। আজ বিশ্বজুড়ে গণিতবিদদের একজোট হওয়ার সময় এসেছে। এআই ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলি তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তিকে কেবল গবেষণার সহায়ক হিসেবে রাখতে হবে, গবেষণার পরিচালক হিসেবে নয়।
যন্ত্র আমাদের কাজ সহজ করতে পারে, কিন্তু আমাদের চিন্তার স্থান দখল করতে পারে না। যদি আমরা এআইয়ের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তবে এটি কোনো ধ্বংস ডেকে আনবে না। মানব মেধা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে একটি সুষম ও সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন। এই ভারসাম্যই পারে গণিতের বর্তমান সংকটকে দূর করতে। তবেই আমরা তথাকথিত এই ‘এআই অ্যাপোক্যালিপস’-কে অতিক্রম করে এক নতুন গাণিতিক রেনেসাঁ বা নবজাগরণের যুগে পদার্পণ করতে পারব।

রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন শাসক আর শাসিতের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। ক্ষমতার প্রাসাদ যত উঁচু হয়, মানুষের বাস্তব জীবন থেকে নেতৃত্ব তত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক সত্যটি খুবই সরল—ক্ষমতা মানুষের জন্য, মানুষ ক্ষমতার জন্য নয়।
১ দিন আগে
আমাদের এই সমাজেই একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা বছরের পর বছর নীরবে কাজ করে চলে। তাদের শ্রমে-ঘামে আমাদের দেশের অর্থনীতি চলে, আমাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু তাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই। তারা সংঘটিত নয়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সারা বাংলার গ্রামেগঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
১ দিন আগে
‘যে যায় লঙ্কায়, সে-ই হয় রাবণ’—বাংলা প্রবাদটি বহু পুরোনো। রাজনীতির ভাষায় এর নতুন সংস্করণ হতে পারে, ‘যে যায় ক্ষমতায়, সে-ই হয় শব্দের মালিক।’ এখন কোন উৎসবের নাম কী হবে, কোন শব্দ বলা যাবে, কোনটি যাবে না, সেটিও যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ঠিক করে দেন, তাহলে অভিধানের দরকার কী?
১ দিন আগে
আপনি নানা ধরনের অন্যায় করবেন কিন্তু সে অপরাধের জন্য কোনো সাজা হবে না, এটা নিশ্চিত করতে হলে আপনাকে সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। নানা সময় সরকারি দলের নানা লোক এই ‘অধিকার’ ভোগ করে এসেছেন, তাই নতুন বিএনপি সরকারে এ রকম নেতা পাওয়া যাবে না—তা কি হয়?
১ দিন আগে