মো. ইমরান হোসেন

যে বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন হয়েছিল আমাদের সামনে, তার কতখানি পূরণের পথে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যৌক্তিক হবে। ফরাসি বিপ্লব স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্বের দাবিতে সংঘটিত হয়েছিল। সেটা কেবল একজন রাজাকে অপসারণ করার উদ্দেশ্যে ছিল না; বরং সমাজকাঠামোকেই নতুন করে গড়ে তোলার ঘোষণা ছিল। এর আগেও আমাদের দেশে জাতীয় জাগরণ আমরা দেখেছি, কিংবা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন এবং ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার হটানোর আন্দোলন হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন—কেন আমরা সেই সব আন্দোলনের ফল ভোগ করতে পারিনি?
১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ কেবল স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল না, তা ছিল মর্যাদা, গণতন্ত্র ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি। তেমনি ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান সামরিক শাসনের অবসান ঘটালেও এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এই বড় পরিবর্তনগুলো সত্ত্বেও, সাধারণ মানুষের জীবন অভিজ্ঞতায় সেই আদর্শগুলোর প্রতিফলন আজও অনুপস্থিত। আমরা গড়ে তুলতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছি নিজেদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। আমলাতন্ত্র রয়ে গেছে আগের মতো। আগের মতো দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য হয়ে উঠেছে নিয়োগ ও পদোন্নতির মানদণ্ড।
আমাদের নেতারা গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই জনতাকে ত্যাগ করার পুরোনো সিলসিলাই জারি রাখলেন। ক্ষমতার একক হিসেবে তাঁরা খুঁজে নিলেন সচিবালয়কে।
ফরাসি বিপ্লব স্পষ্ট করেছিল, প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তন হয় কেবল বাহ্যিক। আমাদের দেশের গণ-অভ্যুত্থানগুলো অনেক সময় সেই বাইরের চাকচিক্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। যেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর আমাদের আসলেই দিতে পারত স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্বের এক ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ, সেটা আমরা হেলায় হারিয়েছি। সমতা ও ভ্রাতৃত্ব—এই বিপ্লবী মূল্যবোধগুলো আমাদের বাস্তবতায় কোথাও যেন নেই। ধনবৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিচারব্যবস্থার সুবিধা এখনো শহুরে অভিজাতদের অনুকূলে। গণ-অভ্যুত্থানের পরেও সম্পদের ন্যায্য বণ্টন বা সুযোগের সাম্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ফরাসি বিপ্লবের দাবি ছিল জনগণের রাষ্ট্র গঠন, আমাদের গণ-অভ্যুত্থানগুলো জনগণের ক্ষমতায়নের পথ তৈরিই করতে পারেনি। এখনো এখানে চলছে নানা পরিচয়ে বিভাজনের রাজনীতি।
আমাদের অগ্রগতির সবচেয়ে বড় বাধা ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র, যা শাসকের আজ্ঞাবাহী ছিল। এখনো
একই আছে। ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান একজন সামরিক শাসককে সরাতে পেরেছিল, কিন্তু স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে পারেনি, কিংবা জনগণের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারেনি। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সামনে হাজির করেছিল সেই পর্দা, যা সরালেই আমরা হয়তো দেখা পেয়ে যেতাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র—সমতা, ভ্রাতৃত্ব আর বৈষম্যহীন একটা রাষ্ট্র। গণ-অভ্যুত্থানের পরে সবচেয়ে বেশি সামাজিক সংহতির অভাব দেখা যায়। এবারও তা-ই ঘটল। যেমন, জুলাই আন্দোলনের পর সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা নিজ নিজ দলে ফিরে গেছেন। তারপর আবার সেই পুরোনো দলাদলি চলছে।
গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় মূলত শুধু শাসক বদল না হয়ে শাসনকাঠামো একইভাবে চলার কারণে। বাংলাদেশের ইতিহাস সাহসিকতায় ভরপুর। এখন প্রয়োজন নৈতিক কল্পনাশক্তি, যে শক্তি দিয়ে আমরা নতুন করে প্রতিষ্ঠান গড়তে পারি, আমাদের নিজেদের তৈরি করে নিতে পারি এবং নিজেদের শাসনকাঠামোয় যাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারি এবং সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারি, যা আমরা উত্তাল আন্দোলনের সময়ে বুকে ধারণ করেছিলাম।
ফ্রান্স কিংবা সোভিয়েত, মাও অথবা ফিদেল কাস্ত্রো আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, বিপ্লব কোনো শেষ নয় বরং তা একটি সূচনা, একটা নতুন যুগের, কিছু অপার সম্ভাবনার। যতক্ষণ না আমরা সেটিকে এমনভাবে বিবেচনা করি, ততক্ষণ আমরা ইতিহাসের চক্রেই ঘুরে বেড়াব, আবারও পুরোনো স্লোগান দেব, কিন্তু সেই স্লোগানের অর্থ ভুলে যাব।
লেখক: শিক্ষার্থী, নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যে বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন হয়েছিল আমাদের সামনে, তার কতখানি পূরণের পথে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যৌক্তিক হবে। ফরাসি বিপ্লব স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্বের দাবিতে সংঘটিত হয়েছিল। সেটা কেবল একজন রাজাকে অপসারণ করার উদ্দেশ্যে ছিল না; বরং সমাজকাঠামোকেই নতুন করে গড়ে তোলার ঘোষণা ছিল। এর আগেও আমাদের দেশে জাতীয় জাগরণ আমরা দেখেছি, কিংবা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন এবং ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার হটানোর আন্দোলন হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন—কেন আমরা সেই সব আন্দোলনের ফল ভোগ করতে পারিনি?
১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ কেবল স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল না, তা ছিল মর্যাদা, গণতন্ত্র ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি। তেমনি ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান সামরিক শাসনের অবসান ঘটালেও এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এই বড় পরিবর্তনগুলো সত্ত্বেও, সাধারণ মানুষের জীবন অভিজ্ঞতায় সেই আদর্শগুলোর প্রতিফলন আজও অনুপস্থিত। আমরা গড়ে তুলতে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছি নিজেদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। আমলাতন্ত্র রয়ে গেছে আগের মতো। আগের মতো দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য হয়ে উঠেছে নিয়োগ ও পদোন্নতির মানদণ্ড।
আমাদের নেতারা গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই জনতাকে ত্যাগ করার পুরোনো সিলসিলাই জারি রাখলেন। ক্ষমতার একক হিসেবে তাঁরা খুঁজে নিলেন সচিবালয়কে।
ফরাসি বিপ্লব স্পষ্ট করেছিল, প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তন হয় কেবল বাহ্যিক। আমাদের দেশের গণ-অভ্যুত্থানগুলো অনেক সময় সেই বাইরের চাকচিক্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। যেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর আমাদের আসলেই দিতে পারত স্বাধীনতা, সমতা ও ভ্রাতৃত্বের এক ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ, সেটা আমরা হেলায় হারিয়েছি। সমতা ও ভ্রাতৃত্ব—এই বিপ্লবী মূল্যবোধগুলো আমাদের বাস্তবতায় কোথাও যেন নেই। ধনবৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিচারব্যবস্থার সুবিধা এখনো শহুরে অভিজাতদের অনুকূলে। গণ-অভ্যুত্থানের পরেও সম্পদের ন্যায্য বণ্টন বা সুযোগের সাম্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ফরাসি বিপ্লবের দাবি ছিল জনগণের রাষ্ট্র গঠন, আমাদের গণ-অভ্যুত্থানগুলো জনগণের ক্ষমতায়নের পথ তৈরিই করতে পারেনি। এখনো এখানে চলছে নানা পরিচয়ে বিভাজনের রাজনীতি।
আমাদের অগ্রগতির সবচেয়ে বড় বাধা ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র, যা শাসকের আজ্ঞাবাহী ছিল। এখনো
একই আছে। ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান একজন সামরিক শাসককে সরাতে পেরেছিল, কিন্তু স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে পারেনি, কিংবা জনগণের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারেনি। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সামনে হাজির করেছিল সেই পর্দা, যা সরালেই আমরা হয়তো দেখা পেয়ে যেতাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র—সমতা, ভ্রাতৃত্ব আর বৈষম্যহীন একটা রাষ্ট্র। গণ-অভ্যুত্থানের পরে সবচেয়ে বেশি সামাজিক সংহতির অভাব দেখা যায়। এবারও তা-ই ঘটল। যেমন, জুলাই আন্দোলনের পর সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা নিজ নিজ দলে ফিরে গেছেন। তারপর আবার সেই পুরোনো দলাদলি চলছে।
গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় মূলত শুধু শাসক বদল না হয়ে শাসনকাঠামো একইভাবে চলার কারণে। বাংলাদেশের ইতিহাস সাহসিকতায় ভরপুর। এখন প্রয়োজন নৈতিক কল্পনাশক্তি, যে শক্তি দিয়ে আমরা নতুন করে প্রতিষ্ঠান গড়তে পারি, আমাদের নিজেদের তৈরি করে নিতে পারি এবং নিজেদের শাসনকাঠামোয় যাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারি এবং সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারি, যা আমরা উত্তাল আন্দোলনের সময়ে বুকে ধারণ করেছিলাম।
ফ্রান্স কিংবা সোভিয়েত, মাও অথবা ফিদেল কাস্ত্রো আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, বিপ্লব কোনো শেষ নয় বরং তা একটি সূচনা, একটা নতুন যুগের, কিছু অপার সম্ভাবনার। যতক্ষণ না আমরা সেটিকে এমনভাবে বিবেচনা করি, ততক্ষণ আমরা ইতিহাসের চক্রেই ঘুরে বেড়াব, আবারও পুরোনো স্লোগান দেব, কিন্তু সেই স্লোগানের অর্থ ভুলে যাব।
লেখক: শিক্ষার্থী, নৃ-বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে’ প্রবাদটিই যেন সত্যে প্রমাণিত হতে চলেছে খুলনা নগরের উপকণ্ঠে রূপসা সেতুর নিকটবর্তী মাথাভাঙ্গা মৌজার ৩২টি দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারের মানুষের কাছে। কারণ, এখানে বসবাসরত পরিবারগুলোর জমি জবরদখলের অভিযোগ উঠেছে। জায়গাটি একসময় বিরান ভূমি ছিল।
১২ ঘণ্টা আগে
নির্বাচনের আমেজে ভাসছে দেশ। তারপরও কেমন যেন একটা চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে মানুষের মনে। কী হবে সামনে, তা নিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিন্তকও নির্দ্বিধায় কোনো মন্তব্য করতে পারবেন বলে মনে হয় না। নির্বাচন কি সেই হতাশাজনক পরিস্থিতিকে পেছনে ফেলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে?
১২ ঘণ্টা আগে
জানুয়ারি মাস চলছে নতুন বছরের। আর ২৭ দিন পরেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি, এই নির্বাচন হবে ইতিহাসের অন্যতম একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। সুষ্ঠু তো বটেই। তাদের আরও দাবি হলো, বিগত ১৭ বছরে যা হয়নি এক বছর কয়েক মাসে সেটা করে দেখিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
১২ ঘণ্টা আগে
মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে—দেশের কোথায় আজ নারীরা নিরাপদ? শুধু কি নারী? কোন কারণে কোথায় কে কখন হবেন গণপিটুনির শিকার, কাকে রাস্তায় ধরে কারও দোসর নাম দিয়ে হত্যা করা হবে, তা নিয়ে শঙ্কিত দেশের মানুষ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন এক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, যখন কোথাও...
১ দিন আগে