Ajker Patrika

দুই বাংলাদেশি নাকি কূটনৈতিক সম্পর্কের শিরশ্ছেদ

স্বপ্না রেজা
দুই বাংলাদেশি নাকি কূটনৈতিক সম্পর্কের শিরশ্ছেদ
ছবি: এআই

১৪ অক্টোবর সৌদিতে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নারী ও পুরুষের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে, যাদের একজন নজরুল ইসলাম ও আরেকজন সুইটি আক্তার। যেটা সৌদির বাংলাদেশ দূতাবাস জানত না বলে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রথম পর্যায়ে সাংবাদিকদের বলেছেন। তাঁরা ঘটনাটি ঘটার পর তথা দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ হওয়ার পর জেনেছেন। এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, দীর্ঘ চার মাস ধরে তাঁদের অপরাধ নিয়ে নাকি মামলা চলেছে সৌদিতে।

আবার নজরুলের পরিবারের সূত্রে গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানা গেল, দুই বছর ধরে নাকি এই মামলা চলেছে। অবাক হতে হলো, প্রচণ্ড রকম অবাক হওয়ারই কথা! অবাক হতে হলো এই ভেবে যে সৌদিতে বসবাসরত বাংলাদেশি শ্রমিকেরা কতটা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন, অভিভাবকহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাঁদের মাথার ওপর সৌদির আসমান ছাড়া আর যেন কিছুই নেই। সেই আসমানই কারণে-অকারণে তাঁদের মাথার ওপর ভেঙে পড়ে, করে জীবন নিশ্চিহ্ন, বিবর্ণ; যার কোনোটা হয়তো বাংলাদেশের দূতাবাস জানতে পারে, কোনোটা জানার বাইরে থেকে যায়।

অথচ এই শ্রমিকদের অর্থে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স-অস্তিত্ব টিকে আছে। আর তাঁদের অবদানকে মূল্যায়ন করা ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য আমাদের দেশে রয়েছে দুই-দুইটা মন্ত্রণালয়—পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। আবার এক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রয়েছেন তিনজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। নিশ্চয়ই সেটা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার অভিপ্রায়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই দুই মন্ত্রণালয়ের মাথার ওপর দিয়ে দুজন বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ হওয়ার মতো একটি ঘটনা ঘটে গেছে, যা তারা জানতে পারেনি। কী করে সম্ভব তা, এমন প্রশ্ন ও বিস্ময় কিন্তু জনমনে ইতিমধ্যেই জন্মেছে। মন্ত্রণালয় ও সৌদির বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা ও কাজ নিয়েও সংশয় জেগেছে। জনমনে এমন প্রশ্নও উঠেছে যে সৌদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্কই-বা তাহলে কেমন?

যা হোক, শিরশ্ছেদ করার বিষয়টি এই যুগে একটা নিদারুণ অমানবিক আচরণ, যা সৌদি আরবে আজও প্রচলিত। অভিযোগে বলা হয়েছে, মসজিদে অনৈতিক কাজের জন্য অভিযুক্তদের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু দুই বাংলাদেশির অনৈতিক কাজের ধরন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় যে তথ্য আসছে, সেটাও শিরশ্ছেদ করার মতো অপরাধ না বলেই অধিকাংশ মানুষ তাঁদের মতামত প্রকাশ করছেন। কেউ সুস্পষ্টভাবে বলতে পারছেন না যে অনৈতিক কাজটা কী ছিল, কী ধরনের ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন সূত্র থেকে নানা রকম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এটা বলাবাহুল্য যে যতক্ষণ পর্যন্ত না কোনো তথ্য বাংলাদেশ ও সৌদি সরকারের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে আদান-প্রদান হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ধরনের সূত্রের আবির্ভাব ঘটবে এবং অনুমানের ভিত্তিতে তথ্য প্রকাশ পাবে। তবে সৌদি সরকার শাস্তি কার্যকর করার আগে বাংলাদেশ সরকার কিংবা অপরাধীদের পরিবারকে সেই সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছে বলে শোনা যায়নি। অর্থাৎ এ বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি, যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং যা ভিয়েনা প্রটোকল অনুসরণ করে না।

বলতেই হয়, সৌদি সরকার কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছে, যার জন্য বিশ্ব আদালতে বাংলাদেশ সরকার সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনতে পারে। আর যদি জানা যায় যে সৌদি সরকার বাংলাদেশ দূতাবাসকে বিষয়টি অবহিত করেছিল কিন্তু তারা যথাসময়ে তাদের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি, তাহলে বলতেই হবে এটা দূতাবাসের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়, চরম ব্যর্থতা তো বটেই।

এদিকে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া একটি গোপন চিঠির মাধ্যমে বেশ কিছু তথ্য সামনে এসেছে। যেমন, জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটের চিঠি অনুযায়ী জানা যায় যে শিরশ্ছেদ কার্যকর করার আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা দূতাবাসকে এই বিষয়ে কোনো পূর্ব নোটিশ দেয়নি। কনস্যুলেট পুরো বিষয়টি সৌদি গণমাধ্যমের বরাতে জানতে পেরেছে। সেই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা কোনো আইনি সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারবেন কি না, সেটাও কনস্যুলেটকে বলা হয়নি। আরও উল্লেখ করা হয় যে সৌদি সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে ২৫০০ বন্দীর একটি সাধারণ তালিকা পাঠানো হয়েছিল, যেখানে এই দুই বন্দীর নাম ছিল, কিন্তু বিস্তারিত তথ্য ছিল না। অর্থাৎ তাঁরা যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, তাঁদের মামলার বর্তমান অবস্থা কী ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য ছিল না। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস উদ্বেগ প্রকাশ করে চিঠিতে সেটাও উল্লেখ করেছে বলে শোনা যাচ্ছে। এই গোপন চিঠির মাধ্যমে এটা পরিষ্কার হয় যে সৌদি সরকার বাংলাদেশ দূতাবাসকে অবগত করার প্রয়োজন বোধ করেনি। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি কীভাবে দেখছে, সেটার ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স-দ্ধাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের মর্যাদাকর অবস্থান।

অপরাধের শান্তি হবে, এ বিষয়ে দ্বিমতের কোনো সুযোগ নেই। সেটা সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু অপরাধটা কী, আদতেই সেটা অপরাধ কি না, অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, কূটনৈতিক উন্নততর যোগাযোগের মাধ্যমে ও দৃষ্টিকোণে বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে কি না ইত্যাদি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর মক্কার মসজিদে নজরুল ও সুইটির অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে শিরশ্ছেদ হওয়ার বিষয়ে যাঁরা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, তাঁরা কিন্তু বাংলাদেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেমন, মসজিদ, মাদ্রাসায় ইমাম ও শিক্ষক কর্তৃক নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায় উদ্বিগ্ন হন না, প্রতিবাদী হন না বলে অনেকে অভিযোগ করেন। বাংলাদেশের কন্যাশিশুরা যেভাবে প্রতিনিয়ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, ধর্ষণের পর তাদের হত্যা করা হচ্ছে, তখন কিন্তু কোনো ধর্মীয় আইনে অপরাধীদের চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়ার দাবির আওয়াজ পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশ থেকে যেসব নারী ও পুরুষ শ্রমিক বিদেশে যান, তাঁদের অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন। বিভিন্ন সময়ে মিডিয়ায় এই বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। দেখা গেছে, যেসব নারী সৌদির বাসাবাড়িতে কাজ করেন, তাঁদের অধিকাংশই যৌন নিপীড়নের শিকার হন প্রতিনিয়ত। এমনকি নির্যাতিত হওয়ার পর হত্যাও করা হয়। অনেকেই বলেছেন, সৌদি পুলিশকে বিষয়টি জানানো হলেও তারা তেমন উদ্যোগ নেয় না, উপরন্তু মালিকের কাছে অভিযোগকারীকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। বাংলাদেশের দরিদ্র নারীদের জীবনটা প্রবাসে গিয়ে কেবল ধূসর হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র নারীরা কোলের সন্তান ফেলে জমিজমা বিক্রি করে পরিবারের সচ্ছলতার জন্য পাড়ি জমান বিদেশে। অল্প বয়সের নারীদের মধ্যেও এই স্বপ্ন দেখা যায়। এদের মধ্যে কোনো কোনো নারী দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে সৌদির বিত্তশালীদের কাছে বিক্রি হয়ে যান। তাঁদের স্থান হয় অন্ধকার জগতে। ফলে যে পেশার কথা বলে তাঁদের নেওয়া হয়, সেই পেশায় আর তাঁরা নিয়োজিত হতে পারেন না। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের লাশ হয়ে দেশে ফেরার গল্পটা কিন্তু খুব ছোট না।

জানতে ইচ্ছে হয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ কনস্যুলেট বা দূতাবাসের কী কী ধরনের কার্যক্রম রয়েছে এই রেমিট্যান্স-যোদ্ধাদের জীবন সুরক্ষার জন্য; তাঁদের বিস্তারিত তথ্য, অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে অবগত হওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না; নিজের দেশের নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কর্মরত দেশটিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো উপায় থাকে কি না, থাকলে সেটা কেমন? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রীকে এই শিরশ্ছেদ ঘটনা প্রসঙ্গে বলতে শোনা গেছে যে সৌদির এই ঘটনাটি সেখানে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য একটা ‘শিক্ষা’ হয়ে থাকবে। ইতিমধ্যে তাঁর কথা নিয়ে সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বাংলাদেশের একজন দায়িত্বশীল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি এ ধরনের কথা বললে, আদতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা যাবে কি না, কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কি না, বলা মুশকিল। অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন, শিক্ষা আসলে কে পেল এই ঘটনায়, সৌদিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকেরা নাকি বাংলাদেশ কনস্যুলেট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়?

স্বপ্না রেজা, কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত