Ajker Patrika

উপনিবেশের কবজায় লোকজ ও দেশীয় সংস্কৃতি

আল শাহারিয়া
উপনিবেশের কবজায় লোকজ ও দেশীয় সংস্কৃতি

২০১০ সালে ভারতের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে বোয়া সিনিয়র নামের এক বৃদ্ধা মারা যান। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যায় ‘বো’ নামের একটি প্রাচীন ভাষা। বোয়া ছিলেন এই ভাষার শেষ জীবিত ব্যক্তি। জেনেটিক গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৬৫ হাজার বছর আগে এই দ্বীপে বসতি স্থাপন করা এক জনগোষ্ঠী, তাদের লোককথা, চারপাশের সমুদ্র ও জঙ্গলকে দেখার এক নিজস্ব ভঙ্গি—সব বিলীন হয়ে গেল তার শেষ নিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে। এই মৃত্যু শত বছর আগে শুরু হওয়া এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতি, যা উপনিবেশবাদের হাত ধরে এসেছিল পৃথিবীর বুকে। উপনিবেশ মাটি বা সম্পদ দখলের পাশাপাশি একটি জনপদের আত্মাকেও ধীরে ধীরে মুছে ফেলে।

শাসকগোষ্ঠী যখন কোনো নতুন ভূখণ্ডে পা রাখে, তাদের প্রথম আঘাতটা আসে ভাষার ওপর। প্রশাসন, শিক্ষা এবং আদালতের ভাষা হিসেবে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয় দখলদারদের ভাষাকে। ফলে স্থানীয় ভাষাগুলো রাতারাতি তাদের মর্যাদা হারিয়ে ফেলে এবং দ্বিতীয় শ্রেণির ভাষায় পরিণত হয়। জীবিকার তাগিদে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয় শাসকের ভাষা শিখতে। উত্তর আমেরিকার আদিবাসী সমাজগুলোর দিকে তাকালে এর ভয়াবহতা বোঝা যায়। সেখানে বোর্ডিং স্কুল তৈরি করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বলা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। উদ্দেশ্য ছিল তাদের মন থেকে নিজস্ব সংস্কৃতির শিকড় উপড়ে ফেলা। অসংখ্য এ দেশের ভাষা ও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থানীয় জ্ঞানকাঠামো আজ এভাবেই পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

ভাষার পরেই আসে বিশ্বাসের জগৎ। স্থানীয় লোকজ ধর্ম, আচার এবং বিশ্বাসগুলোকে অত্যন্ত সুকৌশলে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার আখ্যা দেওয়া হয়। ইউরোপীয় শাসকেরা নিজেদের উন্নততর সভ্যতার ধারক বলে দাবি করত। এই সভ্য দাবি করার দম্ভ মূলত ছিল মানসিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের একটি মোক্ষম হাতিয়ার। বিদেশি ধর্মপ্রচারক ও ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে শুরু হয় ধর্মান্তরিত করার কাজ। অনেক জায়গায় ভয় দেখিয়ে আবার অনেক জায়গায় অর্থনৈতিক প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয়দের নিজস্ব উপাসনা পদ্ধতি থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়। শত শত বছর ধরে চলে আসা প্রকৃতির প্রতি মানুষের যে নিবিড় আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ছিল, তাকে পশ্চিমা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বন্য ও বর্বর বলে বাতিল করে দেওয়া হয়।

এ দেশের জ্ঞানকাঠামোকে প্রান্তিক করে ফেলার কৌশলটিও ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। পশ্চিমা শাসকেরা প্রাচ্যের বা উপনিবেশিত সমাজের সবকিছুকেই এক ছাঁচে ফেলে বিচার করত। তাদের চোখে স্থানীয় চিকিৎসাব্যবস্থা, কৃষিকাজ বা স্থাপত্যবিদ্যা ছিল সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও অনুন্নত। হাজার বছরের পরীক্ষিত দেশীয় কৃষি পদ্ধতি বাতিল করে তারা চাপিয়ে দেয় নিজেদের সুবিধাজনক ব্যবস্থা। পশ্চিমা পণ্ডিতরা এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যেখানে তাঁদের জ্ঞানই একমাত্র আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য। উপনিবেশিত মানুষের মনে অত্যন্ত সুকৌশলে এই ধারণা গেঁথে দেওয়া হয়েছিল যে তাদের নিজস্ব চিন্তার কোনো মূল্য নেই এবং তাদের সবকিছু নতুন করে শিখতে হবে শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের কাছ থেকে। এই মানসিক নিপীড়ন মানুষকে তার নিজের শিকড় থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পাশাপাশি স্থানীয় আর্থসামাজিক কাঠামো ভেঙে ফেলার কাজটিও সমান্তরালভাবে চলেছিল। শতাব্দীপ্রাচীন ভূমিব্যবস্থা বাতিল করে শাসকেরা নিজেদের সুবিধামতো নতুন আইন তৈরি করেন। ভারতবর্ষে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো নীতি কৃষকদের তাঁদের নিজস্ব জমি থেকে উচ্ছেদ করে ভূমিদাসে পরিণত করেছিল। স্থানীয় পঞ্চায়েত বা গোত্রভিত্তিক শাসনকাঠামো ভেঙে দিয়ে পশ্চিমা ধাঁচের আমলাতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়া হয়। দেশীয় তাঁতি বা কারিগরদের ওপর অমানবিক কর চাপিয়ে স্থানীয় বস্ত্রশিল্প ধ্বংস করা হয়। ফলে সমাজের মানুষের মধ্যে যে পারস্পরিক নির্ভরতা এবং ঐক্যের বুনন ছিল, তা পুরোপুরি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

সংস্কৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হলো শিল্পকলা ও স্থাপত্য। উপনিবেশের শাসকেরা এই দেশীয় শিল্পকর্মগুলোকে লুটের মাল হিসেবেই দেখেছেন। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে অমূল্য পাণ্ডুলিপি, ঐতিহাসিক মূর্তি এবং অলংকার চুরি করে পাচার করা হয়েছে ইউরোপের জাদুঘরগুলোতে। নাইজেরিয়ার বেনিন ব্রোঞ্জের মতো অমূল্য সম্পদ আজও ব্রিটিশ মিউজিয়ামের শোভাবর্ধন করছে, আর ভারতবর্ষের কোহিনূর হীরা রাখা আছে লন্ডনের টাওয়ার অব লন্ডনে, ব্রিটিশ রাজপরিবারের মুকুটে বসানো অবস্থায়। এই লুণ্ঠিত সম্পদগুলো ফিরিয়ে আনার দাবি আজ বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত জোরালো হচ্ছে। তবু সেগুলোর আসল মালিকদের কাছে সেই ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো আজও অধরা রয়ে গেছে নানা আইনি মারপ্যাঁচের কারণে।

উপনিবেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হলো মনস্তাত্ত্বিক। শাসনভার ছেড়ে শাসকেরা চলে গেলেও তাঁরা মানুষের মনে এমন এক গভীর হীনম্মন্যতা তৈরি করে গেছেন, যা আজও মুছে যায়নি। নিজস্ব সংস্কৃতি, পোশাক, ভাষা বা খাদ্যাভ্যাসকে নিচু চোখে দেখার এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে উপনিবেশিত সমাজে। সৌন্দর্যবোধের মানদণ্ড বদলে গিয়ে ফরসা চামড়াকে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

উপনিবেশের প্রভাবে স্থানীয় সংস্কৃতির ক্ষতি হলেও অনেক ক্ষেত্রে নতুন মিশ্র বা রূপান্তরিত সংস্কৃতিরও জন্ম হয়েছে, যা শিল্প, সংগীত ও সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শত নিপীড়নের পরও মানুষ তার সংস্কৃতিকে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে দেয়নি। গানের সুরে, লোককথায়, মায়ের বলা রূপকথার গল্পে কিংবা উৎসবের আনন্দে মানুষ তার নিজস্বতাকে সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছে। কখনো তা প্রকাশ্য বিদ্রোহের রূপ নিয়েছে, কখনো তা নীরবে টিকে থেকেছে গ্রামের সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট অভ্যাসের ভেতর।

আজ যখন আমরা উপনিবেশের সেই ধ্বংসযজ্ঞের দিকে তাকাই, তখন আমাদের সামনে নতুন কিছু প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। সরাসরি রাজনৈতিক শাসন না থাকলেও নব্য উপনিবেশবাদ এবং বিশ্বায়নের মোড়কে সাংস্কৃতিক আধিপত্য আজও বজায় রয়েছে। বহুজাতিক করপোরেশন আর পশ্চিমা মিডিয়ার আগ্রাসী প্রভাবে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি আজও নতুন ধরনের হুমকির মুখে। এই প্রেক্ষাপটে নিজস্ব ভাষা সংরক্ষণ এবং হারানো লোকজ ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এখন সময় এসেছে নিজেদের ইতিহাসকে নতুন করে পড়ার এবং নিজস্ব সংস্কৃতির হারানো আত্মবিশ্বাসটুকু সসম্মানে ফিরিয়ে আনার। উপনিবেশের এই ক্ষতগুলো মুছে ফেলে আমরা কি নিজস্ব আত্মপরিচয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব?

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত