Ajker Patrika

প্রশ্নপত্র ফাঁস ও মেধাবীদের দীর্ঘশ্বাস

রিয়াদ হোসেন
আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮: ১১
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও মেধাবীদের দীর্ঘশ্বাস

বর্তমান সময়ে চাকরি হলো সোনার হরিণ। যে হরিণের পেছনে ছুটছে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী। যেকোনো ধরনের চাকরি পেতে কারও প্রচেষ্টার যেন কোনো কমতি নেই। বিশেষ করে আমাদের দেশে সরকারি চাকরির বাজারে এখন প্রতিযোগিতার অভাব নেই। যেকোনো চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলেই একটি পদের বিপরীতে লড়াই করছে হাজার হাজার উচ্চশিক্ষিত যুবক। যাদের অধিকাংশের মধ্যে যোগ্যতার অভাব না থাকলেও কর্মক্ষেত্রে কাজের সুযোগ কম থাকায় তাঁরা চাকরি পাচ্ছেন না। এতে অনেক মেধাবী যুবক হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন। দীর্ঘদিন বেকার থাকায় তাঁদের মধ্যে বাড়ছে চরম হতাশা আর ক্ষোভ। আবার অনেকে হয়ে পড়ছে বিপথগামী। বেকারত্ব ও হতাশার এই গল্পের মধ্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসে ঢুকে পড়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সংস্কৃতি। দীর্ঘদিন ধরে এই সংস্কৃতি আমাদের সমাজে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে রাষ্ট্রকে মেধাহীন করে তুলছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই সংস্কৃতি সমাজের মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, বিসিএস ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষার আগের রাত এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রশ্নের ছড়াছড়ি লক্ষ করা যায়। কখনো প্রকৃত প্রশ্নপত্রে এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সয়লাব হয়ে পড়ছে, আবার কখনো কখনো প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এই জায়গা থেকে বের হতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জন্য ভয়াবহ সংকট অপেক্ষা করছে। দেশের প্রতিটি জায়গায় যদি অদক্ষ কিংবা টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র কিনে চাকরি পাওয়া মানুষগুলো ঢুকে পড়ে, তাহলে রাষ্ট্র কীভাবে চলবে? ফলে দেশের অগ্রগতি বিপথে চলে যেতে পারে। একসময় রাষ্ট্র মেধাশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই প্রতিটি চাকরির পরীক্ষার আগে যাতে কোনোভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয়, সে বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও বেশি সতর্ক হওয়া জরুরি।

অনেক সময়ই দেখা যায়, তুলনামূলক কম মেধাবী কিংবা অনেক টাকাপয়সা রয়েছে এমন পরিবারের সন্তানেরা সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করার জন্য চাকরি নেয়। বেকারত্বের তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে তারা পারিবারিক প্রভাব বা অর্থের বিনিময়ে এ কাজ করে থাকে। একশ্রেণির অসৎ কর্মকর্তা লোভের ফাঁদে পড়ে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন। ঘুষের বিনিময়ে বিপুল টাকা নিয়ে তাঁরা পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দেন। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত মেধাবীরা পিছিয়ে পড়ে অন্যদিকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অযোগ্য, অদক্ষরা জায়গা করে নেন। বছরের পর বছর যার খেসারত দিতে হয় পুরো জাতিকে। দিন দিন আমাদের দেশে মেধার অবমূল্যায়নের কাজটি বেড়ে চলেছে। কোনোভাবে যেন এই দুর্নীতি ঠেকানো যাচ্ছে না। আর বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারে কেউ একবার প্রশ্নপত্র পেয়ে গেলে তা অল্প সময়ের মধ্যে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। দেখা গেছে, বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিসিএস, ব্যাংক, এনটিআরসিএ শিক্ষক নিবন্ধন, বাংলাদেশ রেলওয়েসহ বিভিন্ন দপ্তরের চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমরা দেখেছি, পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা যখন খবরের পাতায় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসে, তখনই কেবল কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। আর পরবর্তী সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তদন্ত করলে এর পেছনে একই বিভাগের পিয়ন, আয়া বা ড্রাইভারের মতো কর্মচারীদের নাম উঠে আসে। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম-দুর্নীতি করে আসছেন। এসব করেই তাঁরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাড়ি, গাড়ি সম্পদের পাহাড় বানিয়ে ফেলেছেন। শুধু আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এমন দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। তাই যেকোনো উপায়ে চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করে রাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। যাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মেধার অবমূল্যায়ন না হয়।

তরুণ প্রজন্মই এ দেশের চালিকাশক্তি। সেই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যদি অসৎ পথ অবলম্বনের চিন্তা থাকে, তারা যদি নীতিনৈতিকতা হারিয়ে ফেলে তাহলে জাতির মেরুদণ্ড একসময় ভেঙে পড়তে বাধ্য হবে। এ জন্য দেশের তরুণ প্রজন্মকে সুস্থভাবে বাঁচাতে হলে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে হবে। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি চাকরির বাজারে যেন কোনোভাবে পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্তের সময় দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাইরেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে থাকে। অর্থাৎ যে ছাপাখানা থেকে প্রশ্ন ছাপানো হয় সেখানকার কর্মচারীদের মাধ্যমেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে থাকে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সদস্যরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করছে। কখনো প্রশ্নপত্র তৈরিতে যারা যুক্ত, তাদের হাত করার চেষ্টা করছে আবার কখনো পরীক্ষা চলাকালে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রের মাধ্যমে কেন্দ্র থেকে বাইরে প্রশ্ন এনে দ্রুত উত্তর পাঠানোর চেষ্টা করছে। এভাবে তারা পদ্ধতি পরিবর্তন করে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন মেধাবী, দক্ষ কর্মী হারাচ্ছে, তেমনি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে চরম হতাশা। রাষ্ট্রের প্রতি তারা আস্থা হারিয়ে ফেলছে। মেধা এবং যোগ্যতা থাকার সত্ত্বেও টাকার কাছে, ক্ষমতার কাছে তারা পরাজিত হচ্ছে। এই দুঃখ, কষ্ট শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে হুমকির মুখে ফেলছে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থা এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় সারা দেশ থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিন্তু অজানা কারণে পুরো সিন্ডিকেটকে নির্মূল করা যাচ্ছে না। তাদের ধরার সঙ্গে সঙ্গে যদি দেশের বিদ্যমান আইনে শাস্তি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে কিছুটা হলেও এই দুর্নীতি কমে আসবে। আমরা আশা রাখি, বেকারত্ব দূর করতে এবং দেশের প্রতিটি স্তরে কর্মঠ ও যোগ্য মানুষকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, ছাপাসহ প্রতিটি পর্যায়ে সৎ এবং যোগ্য লোকের দায়িত্ব দেবে। সঙ্গে সঙ্গে কঠোর মনিটরিংয়ের মধ্যে দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ঋণের জামিনদার হওয়াই কাল, মা-মেয়েকে হত্যার পর লাশের সঙ্গেই ঘুমাতেন দুই বোন

ভোলায় তরুণকে আটকে রেখে কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ

তেলের দাম না দিয়ে পাম্পকর্মীকে গাড়িচাপায় হত্যা করে পালান সাবেক যুবদল নেতা, পরে আটক

উত্তরায় অগ্নিকাণ্ড: বাড়ির ছাদ ছিল তালাবদ্ধ, ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে প্রাণ যায় ৬ জনের

ইসলামী আন্দোলন জোট ছাড়বে, প্রত্যাশা করিনি: আসিফ মাহমুদ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত