
সৈয়দ নিজার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে দর্শন এবং সমাজবিজ্ঞানেও স্নাতক। পরবর্তী সময়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে তিনি গাণিতিক যুক্তিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছেন নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ক্যান্টারবেরি থেকে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছয় মাস ভিজিটিং স্কলার পদে ছিলেন। তিনি বিউপনিবেশন গবেষণা কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নানা দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।
রোগ নির্ণয় না করে যেমন নিরাময় সম্ভব নয়, তেমনি অভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী অবস্থার সঠিক বিশ্লেষণ ছাড়া অভ্যুত্থান-উত্তর পর্বের অর্জন পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে অভ্যুত্থান-পূর্ব বাংলাদেশের সংকট বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
সাধারণত এই সংকটকে দুটি ফ্রেমওয়ার্কের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়—১. বিমানবায়ন এবং ২. বিরাজনীতিকরণ। তবে আমার মতে, এর সঙ্গে তৃতীয় আরেকটি ফ্রেমওয়ার্ক যুক্ত করা প্রয়োজন, তা হলো—৩. লুটতন্ত্র। এ তিনটি ফ্রেমওয়ার্ক মূলত আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে সাহায্য করবে। প্রথমত, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসন কেন জনগণের মধ্যে এতটা তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল; দ্বিতীয়ত, একটি সফল অভ্যুত্থানের পরও নতুন রাষ্ট্র কেন জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে এখনো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাচ্ছে না।
একটি রাষ্ট্রে নাগরিক যখন আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার পরিবেশ পায় না এবং তার জানমালের নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না, তখনই সেখানে ‘বিমানবায়ন’ ঘটে। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি অন্যতম প্রধান একটি সংকট। ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতেও এই সমস্যা বিদ্যমান। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশে বিমানবায়নের মাত্রা এতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল, যা কেবল প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নয়, তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গেও তুলনাহীন।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি ভাবার মতো। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন কিংবা ’৬৯ ও ’৯০-এর অভ্যুত্থানে ঠিক কতজন মারা গিয়েছিলেন? সত্যি বলতে, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ, ’৪৭-এর দেশভাগ এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ বাদ দিলে বাংলাদেশে আর কখনোই এত বিপুল প্রাণহানির নজির পাওয়া যাবে না। ১৯১৯ সালে ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সরকার নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পর্বে তৎকালীন ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল ‘নৈরাজ্যিক ও বিপ্লবী অপরাধ আইন’ (অ্যানার্কিয়াল অ্যান্ড রেভল্যুশনারি ক্রাইমস অ্যাক্ট) পাস করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক পুলিশকে অসীম ক্ষমতা দেওয়া এবং বিনা বিচারে গ্রেপ্তার ও শাস্তির আইনি বৈধতা তৈরি করা। এই আইনের প্রতিবাদে সমবেত সাধারণ মানুষের ওপর জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে নির্বিচার গুলি চালানো হয়। সরকারি হিসাবে সেদিন নিহত হয়েছিলেন প্রায় পৌনে চার শ মানুষ, যা ছিল পুরো ঔপনিবেশিক আমলে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ প্রাণহানি।
অথচ বিগত জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে সরকারি হিসাবেই প্রায় ৮০০ জন এবং জাতিসংঘের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এত বিপুল রক্তপাতের পরও বিগত দুই বছরে হাতে গোনা কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হলেও বেশির ভাগ ঘটনার ক্ষেত্রে বিচার এখনো ঝুলে আছে। এমনকি এত প্রাণহানির পর প্রণীত সনদে ‘প্রাণের অধিকার’কে শর্তহীনভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। পাশাপাশি জননিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার-সম্পর্কিত অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ; যেমন মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ও গুম অধ্যাদেশ হয় বাতিল করা হয়েছে, নয়তো পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো অত্যন্ত অদূরদর্শী এবং বিরোধী মতের প্রতি চরম অসহনশীল। তারা বিরোধী পক্ষকে এমনভাবে কোণঠাসা করে রাখতে চায়, যাতে প্রতিপক্ষ তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা করতে না পারে। এ ধরনের দমনমূলক তৎপরতাকে সাধারণত ‘বিরাজনীতিকরণের প্রথম স্তর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
তবে মনে রাখা দরকার, এই প্রাথমিক স্তরের বিরাজনীতিকরণের রাজনৈতিক রূপ ও প্রভাব কতটা গভীর ছিল। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কেবল বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীর মতো বিরোধী দলগুলো যে রাজনীতিতে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল তা নয়; বরং এই প্রক্রিয়া খোদ আওয়ামী লীগ দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চরিত্রকেও আমূল বদলে দিয়েছিল। যেহেতু ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে কার্যত কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল ছিল না; তাই তাদের ভোটের জন্য জনগণের দ্বারে যেতে হয়নি। ফলে আওয়ামী লীগের নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মীদের গুরুত্বও দলে দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যায়। দল হিসেবে নির্বাচনের বৈধতা ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণরূপে পুলিশ ও আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা বিরাজনীতিকরণের দ্বিতীয় স্তর।
অভ্যুত্থান-উত্তর পর্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক উপদেষ্টাকে আমলাতন্ত্রের প্রভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এই দ্বিতীয় স্তরের বিরাজনীতিকরণ কিছুটা হলেও জারি ছিল। অবশ্য বর্তমানে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারায় প্রথম স্তরের বিরাজনীতিকরণের সংকট কিছুটা দূর হয়েছে।
তবে আমাদের মনে রাখা দরকার, রাজনীতিকীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে সংবিধানের কিছু অধ্যাদেশ। বর্তমানে নির্বাচিত সরকার এখন পর্যন্ত সেই সকল অধ্যাদেশ পরিবর্তনের জন্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
আওয়ামী লীগ আমলের সবচেয়ে আলোচিত আইনগুলোর মধ্যে ছিল ২০০৬ সালের আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা এবং ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এসব আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বিভিন্ন শিক্ষক, সাংবাদিক ও কার্টুনিস্টকে; এমনকি সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। এই আইনগুলোর কারণে দেশের নাগরিকদের কোনো বাক্স্বাধীনতা ছিল না বললে চলে।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল, ২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে বাক্স্বাধীনতা রুদ্ধ করে, এমন কোনো ধারা থাকবে না। কিন্তু ২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশেও যথারীতি কয়েকটি নিপীড়নমূলক ধারা রয়ে গেছে। এসব ধারা ব্যবহার করে বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মতপ্রকাশের বাধা আগের চেয়ে কমলেও আইনি অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।
লুটতন্ত্র, অর্থাৎ দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে অর্জিত লাখ লাখ কোটি টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে জানা যায়, বিগত ১৫ বছরে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। সাধারণত কোনো দেশ থেকে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। তবে পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্য দুটি তুলনা টেনে দেখা যেতে পারে।
প্রথমত, ভারতের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে—১৯৪৮ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৬০ বছরে ভারতের পাচার হওয়া মোট অর্থের পরিমাণ ছিল ২১৩ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয়ত, তুলনা করা যেতে পারে আমাদের বৈদেশিক ঋণের সঙ্গে। বাজেটের কিছুদিন আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু জানিয়েছিলেন, আমাদের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ আনুমানিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আমাদের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় তিন গুণ টাকা বিদেশে লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সত্যি বলতে বিগত ১৫ বছরে আমাদের কয়েক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ লুট হয়ে গেছে। আমাদের শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র অনেকটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লর্ড ক্লাইভের মতো। পার্থক্য শুধু একটাই—ক্লাইভ এ দেশের সম্পদ লুট করে নিজের দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন, আর তাঁরা লুট করা অর্থ পাচার করেছেন অন্য দেশে। প্রায় সময় তাঁদের দেখে মনে হয় যেন ‘বাঙালি ক্লাইভ’। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, বিগত দুই বছরে এই বিপুল পরিমাণ পাচার করা অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর সফলতা আমরা দেখতে পাইনি।
জালালউদ্দিন রুমি তাঁর ‘মসনবী’তে বলেছেন, ‘তুমি যদি না জানো কোথায় যাচ্ছ, তবে লোকে তোমাকে তাদের ইচ্ছেমতো চালিত করবে।’ রুমির এই উক্তি অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রযোজ্য। বাংলাদেশের কোনো বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, রাজনৈতিক দল এমনকি সেনাবাহিনী কিংবা আমলাতন্ত্রের কাছেও ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না।
অভ্যুত্থানে সংগঠিত শিক্ষার্থী সংগঠনের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ছাত্রশক্তি। কিন্তু বিগত ১০ বছরে অভ্যুত্থানের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণের পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে রাষ্ট্রচিন্তা। আমার যতটুকু মনে পড়ে, প্রথম ও দ্বিতীয় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পরে, ১৪ আগস্টের দিকে রাষ্ট্রচিন্তা অভ্যুত্থানের স্বপক্ষের বিভিন্ন বর্গের বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একটি গোলটেবিল আয়োজন করেছিল। এই আলোচনায় যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এবং মহাপরিচালক হয়েছেন। যা হোক, সেদিনের আলোচনায় একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল—কারও কাছে আসলে কোনো পরিষ্কার রাষ্ট্রকল্প নেই। এমনকি খুব একটা ভেবেছেন, তারও কোনো ইঙ্গিত নেই। অধিকাংশের বক্তব্যে উঠে এসেছে আওয়ামী লীগের সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়ন অথবা ব্যক্তিগতভাবে তিনি কীভাবে নিপীড়িত হয়েছেন। কিন্তু নিপীড়ন কীভাবে রোধ করা যেতে পারে, তার কোনো স্পষ্ট প্রস্তাব ছিল না।
সেখানে ফরহাদ মজহার এবং বদিউল আলম মজুমদারও ছিলেন। বদিউল আলম সেদিন বলেছিলেন তিনি পঞ্চম সংশোধনীকে নিয়ে একটি রিট করতে যাচ্ছেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা করছেন, যাতে শান্তিপূর্ণভাবে একটি নতুন নির্বাচন করা যায়। তার বক্তব্য শুনে আমার কাছে মনে হয়েছিল, তিনি শুধু বিরাজনীতিকরণের সমস্যাগুলোকে অ্যাড্রেস করতে চাচ্ছেন, বিমানবায়নের সমস্যাগুলো নয়। আমাকে সবচেয়ে বিস্মিত করেছে ফরহাদ মজহারের আলোচনা। তিনি সেদিনও বলছিলেন শহীদ মিনারে শপথ গ্রহণের মতো গণপরিষদ গঠন করার কথা, অথচ ছয়-সাত দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করেছে এবং উনার স্ত্রী ফরিদা আক্তার সেই সরকারের একজন উপদেষ্টা। এমনকি চার দিন আগে দ্বিতীয় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়েছে। তাঁর আলাপে ন্যূনতম কোনো রূপরেখা ছিল না।
আমাদের, বিউপনিবেশায়ন গবেষণা কেন্দ্র, এখনকার মতো বিকল্প রাষ্ট্রকল্প প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু দুটি বিষয়ে প্রস্তাব ছিল—একটি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়, অপরটি পুলিশের সংস্কার। আমি সেই প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সেদিন খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে বদিউল আলম ছাড়া অন্যদের খুব একটা প্রস্তাব ছিল না। অনুষ্ঠান শেষে বদিউল আলম আমাকে বলেছিলেন, আমরা জাহাঙ্গীরনগরের লোকজন নাকি খুবই বিপ্লবী। আমি না বলে পারছি না, শোনা যায়, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের অনিচ্ছার কারণে শিক্ষা কমিশন হয়নি। তবে জুলাই ও আগস্ট মাসে পুলিশের যে ভূমিকা ছিল, তা থেকে একমাত্র উত্তরণের উপায় ছিল পুলিশ কমিশন গঠন।
তার কারণ চব্বিশের অভ্যুত্থানে খুঁজে পাওয়া যাবে না, আমাদের ফিরে যেতে হবে ১০ বছর আগে। ২০০৮ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য হলেও ২০১৪, ২০১৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের ডিলেমার মধ্যে ফেলেছিল আওয়ামী লীগ। ২০১৩ সালে দীর্ঘকাল পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছিল। ২০১৪ নির্বাচনের আগে সেই বিচার শেষও হচ্ছিল না। অন্যদিকে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যেখানে তারা ক্ষমতায় না এলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সমাপ্ত থেকে যাবে। এ রকম একটি পরিস্থিতি তৈরির মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ অবৈধ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে গড়ে তুলতে বুদ্ধিজীবীদের একাংশকে ব্যবহার করেছিল। অপর অংশ ২০১৪ সালের নির্বাচনের বিষয়ে নীরব ছিল। এই দুই অংশ মিলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে। এর ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীরা নৈতিক অবস্থান হারিয়ে ফেলেছিলেন।
অন্যদিকে নব্বই-পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল অসাম্প্রদায়িকতা এবং যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি। যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির পর বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নতুন প্যারাডাইম নির্ধারণ করার প্রয়োজন ছিল। তা করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে অনেকাংশে বাংলাদেশের চিন্তাশীল অংশের কাছে খানিকটা অনাগ্রহের বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। তবে অনেকে বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদকেও আলাপে নিয়ে আসেন। যা হোক, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরে এটা স্পষ্ট হতে থাকে—বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদের ধারণা দাঁড়িয়ে আছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিষেদায়নের ওপর। বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদীরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ক্রিটিক ছাড়া বিকল্প কোনো রাষ্ট্রকল্প কখনো প্রস্তাব করেনি।
আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে সব ধরনের জাতীয়তাবাদবিরোধী। রাষ্ট্রের জন্মের জন্য জাতীয়তাবাদের প্রয়োজন আছে, কিন্তু রাষ্ট্র জন্মের পর জাতীয়তাবাদ বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমান অধিকার আছে—সে বাঙালি হোক, আদিবাসী হোক, হিন্দু হোক, মুসলিম হোক। তবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলার যে ব্যাপক অবনতি ঘটেছে, তার সম্পূর্ণ দায়ভার অন্তর্বর্তী সরকারকে নিতে হবে।
এ কথা ঠিক শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সংগঠিতভাবে শিক্ষক নেটওয়ার্কের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হলে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন জারি রাখে। এই অভ্যুত্থান ছিল শিক্ষার্থী-শিক্ষক-জনতার অভ্যুত্থান। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে প্রথমে অদৃশ্য করা হলো জনগণকে, তারপর শিক্ষকদের, তারপর ছাত্রীদের। বর্তমানে এই অভ্যুত্থানের নাম (ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান) দেখলেই তা বুঝতে পারবেন।
আগস্ট মাসে নেটওয়ার্ক দুটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল। সেখানে তারা রাষ্ট্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কিছু প্রস্তাব রেখেছিল। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস থেকে নেটওয়ার্কের তৎপরতা খানিকটা কমে গিয়েছিল। তার অনেকগুলো কারণ ছিল। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে নেটওয়ার্কের কয়েকজন সদস্য আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন এবং কিছু সদস্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন বিভিন্ন পদ-পদবি নেওয়ার কারণে।
সেই সময় সরকার গঠনের তিনটি বিকল্প ছিল। একটি হচ্ছে আর্মি সরাসরি আসা; আরেকটি হচ্ছে, জাতীয় সরকার গঠন করা এবং তিন নম্বর হলো যে মডেলে হয়েছে, সেটা। সেনাবাহিনী সরাসরি ক্ষমতা নিতে চায়নি। এরপর থাকে জাতীয় সরকার। অনেক রাজনৈতিক দল আগ্রহী হয়নি জাতীয় সরকার গঠনে।
তিন নম্বর বিকল্প হচ্ছে অবসরপ্রাপ্ত আমলা-সেনাবাহিনীর অফিসার ও সিভিল সোসাইটির লোকজনের সরকার গঠন। বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি একটা অদৃশ্য পার্টি। বাংলাদেশে যেকোনো ক্রাইসিসের সময় এই সিভিল সোসাইটির লোকজন সক্রিয় থাকে। এ ধরনের শক্তিশালী সিভিল সোসাইটি শ্রীলঙ্কা অথবা নেপালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেখা যায়নি। অন্যদিকে যাঁদের নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়েছিল, তাঁদের একজনের সঙ্গে আরেকজনের আদর্শের মিল ছিল না। ফলে এই সরকারের নিজস্ব কোনো ধরনের আদর্শিক প্যারাডাইম ছিল না।
৫ আগস্টের পরে রাষ্ট্র পুরোপুরি উধাও হয়ে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে এমপি, মন্ত্রিপরিষদ, প্রশাসন এমনকি পুলিশও উধাও হয়ে গিয়েছিল। ফলে তাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল সীমিত পরিসরে হলেও রাষ্ট্রকে সক্রিয় করা। প্রাথমিক পর্যায়ে জনগণের নিরাপত্তা দেওয়া ছিল সবচেয়ে বড় কাজ। অন্তর্বর্তী সরকার অত্যন্ত দুর্বল সরকার ছিল। ব্যর্থতার পুরো দায়ভার আপনি কখনো অন্তর্বর্তী সরকারকে দিতে পারবেন না। তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে একটি ছিল বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব, সনদসহ জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ প্রস্তুত করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। তারা সেটা করেছে। এখন নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব সেই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা। তবে এখানে উল্লেখ্য, মব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং আওয়ামী লীগ আমলের মতো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া যার-তার নাম মামলায় জড়ানোর মতো ঘটনা ঘটেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। এর দায় অবশ্যই অন্তর্বর্তী সরকারকে নিতে হবে।
আমলাতন্ত্র, পুলিশসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে যেভাবে পুনর্গঠন করা হয়েছে বা হচ্ছে, বিগত সময়ের রেজিম চেঞ্জের সময়ও এ ধরনের প্রবণতা দেখা যেত। একটা রেজিম গেলে অন্য রেজিমের লোকজনকে পদায়ন করা হয়। তবে আওয়ামী লীগের সময় বিরাজনীতিকরণের একটা প্রভাব হিসেবে আমলা ও পুলিশের যে ক্ষমতায়ন ঘটেছিল, বর্তমানে পুলিশের ক্ষমতা হ্রাস পেলেও আমলাদের ক্ষমতা এখনো রয়েছে।
অন্যদিকে নিরপেক্ষ লোক এই মুহূর্তে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। তার কারণ হচ্ছে, নব্বইয়ের পর থেকে বাংলাদেশের সকল প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। যাঁরা ক্ষমতায় এসেছেন, তাঁরাই আমলাতন্ত্রকে দলীয়করণ করেছেন। পুলিশ বা বিশ্ববিদ্যালয়—প্রতিটি জায়গায় একই ঘটনা ঘটেছে। যেসব শিক্ষক অথবা আমলা দলীয়করণের সঙ্গে যুক্ত হতে চাননি, তাঁরা বিভিন্নভাবে নিপীড়নের মধ্য দিয়ে গেছেন। সেটা প্রতিটি সরকারের আমলের বাস্তবতা। ফলে নিরপেক্ষ যোগ্য লোক খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। বর্তমান সরকারের কোনোভাবেই উচিত হবে না প্রশাসনকে পুনরায় দলীয়করণ করা।
আমরা যদি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে শুধু একটি অভ্যুত্থান হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে তা অবশ্যই সফল। বিগত ১০ বছরে এ দেশে বৈধ কোনো নির্বাচন হয়নি। ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মানদণ্ডে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে এই প্রথম কোনো নির্বাচনে কোনো সহিংসতায় কারও মৃত্যু ঘটেনি। তা ছাড়া বিগত ১৫ বছরের যে বিরাজনীতিকরণের সংকট তৈরি হয়েছিল, তা খানিকটা হলেও কমেছে।
তবে এটি সত্য, সকল জন-আকাঙ্ক্ষা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তবে আমি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান বেহাত হয়েছে বলে মনে করি না। আমরা যদি দেশের অভ্যুত্থানগুলোর ইতিহাস খেয়াল করি, তাহলে দেখা যাবে, এই অভ্যুত্থানগুলোর অনুপ্রেরণা দীর্ঘমেয়াদি হয়। ’৬৯-এর অভ্যুত্থানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এই অভ্যুত্থান পরে একাত্তরের দিকে লিড করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের ভাবনা ও পরিসর আগামী কয়েক বছরে পুনর্নির্মাণ এবং বিনির্মাণ হবে। তখন বোঝা যাবে, সেটা আসলে কোন দিকে যাচ্ছে এবং কী কী অর্জন করতে পেরেছে।

১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই ইকুয়েডরের মুইজনে বেআইনিভাবে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক চিংড়িঘেরের হাত থেকে ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে এক পরিবেশবাদী প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সেই অভিযানে অংশ নিয়ে গ্রিনপিসের সদস্য হাইহো ড্যানিয়েল নানোটো হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
১০ ঘণ্টা আগে
সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলেন। বিধি অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ করছেন।
১০ ঘণ্টা আগে
পদ্মা-মেঘনা-যমুনার পলিবিধৌত বাংলায় ১৯৭১ সালে যে রক্তক্ষয়ী ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তা আজ সাড়ে পাঁচ দশক পর সিন্ধু নদের অববাহিকায় এক ভৌতিক প্রতিধ্বনি তুলছে। ইতিহাস নাকি নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে—একবার ট্র্যাজেডি হিসেবে, আরেকবার প্রহসন হিসেবে। বর্তমান পাকিস্তানের দিকে তাকালে কার্ল মার্ক্সের এই বিখ্যাত উক্তিটি
১ দিন আগে
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ৫ জুলাই মৃত্যুবরণ করেছেন। চারপাশে মুখোশপরা চিন্তাবিদ-বুদ্ধিজীবীর মাঝে ব্যতিক্রম ছিলেন তিনি। তাঁর কোনো মুখোশ ছিল না। মুখে যে কথা আসে বলে ফেলতেন। কথাকে যে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে উপযোগী করে বলতে হয়, তা তিনি জানতেন না। অন্য অনেকে কৌশল করে কথা বলেন। কারণ, তাঁরা প্রায় সবাই লোকসমাজে যা
১ দিন আগে