Ajker Patrika

সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কার

মাহমুদ হাসান
সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কার

জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত বিষয় হলো সংবিধানের ভবিষ্যৎ। ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়েছে, তাকে একটি স্থায়ী আইনি ও সাংবিধানিক রূপ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বর্তমান বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখাকে জুলাই সনদের মূল চেতনার সঙ্গে সমন্বয় করে সংবিধান সংশোধনের পথে এগোচ্ছে। কিন্তু এই গঠনমূলক যাত্রার সমান্তরালে দেখা যাচ্ছে বিরোধীদের এক অদ্ভুত ও রহস্যজনক অবস্থান। তারা ‘সংবিধান সংস্কার’ বা ‘নতুন সংবিধান’ তৈরির দাবি তুলে রাজনৈতিক অঙ্গনে একধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে। যখন সরকারের ইশতেহার এবং জুলাই সনদের মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ নেই, তখন বিরোধীদের এই অনড় অবস্থান কি আসলেই দেশপ্রেম, নাকি স্রেফ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের একটি স্টান্টবাজি?

বিএনপি সরকার তাদের ইশতেহারে স্পষ্ট করেছে যে তারা জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট বা ‘জুলাই সনদ, ২০২৫’-এর প্রতিটি বিন্দু বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। জুলাই সনদের প্রধান দাবিগুলো ছিল—রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামো ভেঙে দেওয়া, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতার অবসান এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকারের ৩১ দফায় এই বিষয়গুলো অত্যন্ত সুচারুভাবে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। বিশেষ করে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সুষম ভারসাম্য রক্ষা, টানা দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী না থাকা এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ (উচ্চকক্ষ) গঠন করার যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছে, তা জুলাই সনদেরই হুবহু প্রতিফলন। যখন সরকার এই গণদাবিগুলোকে সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে চূড়ান্ত ও কার্যকর আইনি রূপ দিতে চাইছে, তখন বিরোধীদের ‘সংস্কার’-এর ডাক মূলত প্রক্রিয়াটিকে জটিল করার একটি অপকৌশল মাত্র।

বিরোধীদের এই বিরোধিতার নেপথ্যে বড় একটি কারণ হলো ‘ক্রেডিট ওয়ার’ বা কৃতিত্বের লড়াই। তারা ভালো করেই জানে যে জুলাই সনদের সফল বাস্তবায়ন যদি বর্তমান সরকারের হাত ধরে সম্পন্ন হয়, তবে আগামী দীর্ঘ সময় তারা জনসমর্থনের দৌড়ে পিছিয়ে পড়বে। তাই তারা ‘সংস্কার’ শব্দটিকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের লক্ষ্য হলো জনগণের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করা যে সরকার যা করছে তা ‘পুরোনো ব্যবস্থার জোড়াতালি’, আর তারা যা বলছে তা-ই ‘প্রকৃত পরিবর্তন’। এটি মূলত রাজনৈতিক ময়দানে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার একটি কৌশলগত স্টান্ট।

সংবিধানের আমূল সংস্কার বা সম্পূর্ণ নতুন একটি সংবিধান প্রণয়ন করা কোনো সহজ বা সংক্ষিপ্ত কাজ নয়। এটি যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি এর ফলে দেশে একধরনের আইনি ও সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিরোধীরা এই দাবি সামনে এনে আদতে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ টিকিয়ে রাখার সুযোগ খুঁজছে। বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে প্রয়োজনীয় ‘সংশোধন’ আনা শুধু দ্রুততম পদ্ধতিই নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য জরুরি। কিন্তু বিরোধীরা জটিলতার জাল বুনে রাজনৈতিক জল ঘোলা করতে চায়, যাতে পর্দার আড়ালে তারা সরকারের সঙ্গে অন্যায্য কোনো দর-কষাকষি বা সুযোগ নিতে পারে।

জুলাই সনদে পরিষ্কারভাবে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশন সংস্কার এবং সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। সরকার তাদের ইশতেহারে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার জন্য নির্দিষ্ট রূপরেখা দিয়েছে। সরকার যখন জনগণের হাতে ক্ষমতার চাবিকাঠি ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলছে, তখন বিরোধীদের নীরবতা প্রমাণ করে যে তারা জনগণের ক্ষমতায়নের চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে বেশি চিন্তিত। তাদের বিরোধিতার মূল লক্ষ্য আদর্শিক নয়, বরং ক্ষমতাকেন্দ্রিক।

জুলাই বিপ্লবের মহিমান্বিত অর্জন কোনো নির্দিষ্ট দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি সমগ্র জাতির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। সরকার যখন জুলাই সনদ এবং নিজেদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে একটি টেকসই সাংবিধানিক সমাধানের দিকে এগোচ্ছে, তখন বিরোধীদের উচিত ছিল এই প্রক্রিয়ায় গঠনমূলক অংশীদার হওয়া। কিন্তু তারা সেটি না করে ‘সংস্কার’-এর ধোয়া তুলে যে বিভেদ তৈরি করছে, তা মূলত জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের সঙ্গে একধরনের প্রতারণা। রাজনৈতিক স্টান্টবাজি দিয়ে সাময়িক দৃষ্টি আকর্ষণ করা গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা জাতির কোনো উপকারে আসবে না। সময় এসেছে রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবসম্মত সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে নথিবদ্ধ করার। অন্যথায় ইতিহাসের কাঠগড়ায় বিরোধীদের এই অবস্থান স্রেফ ‘সুযোগসন্ধানী রাজনীতি’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

চৈত্রসংক্রান্তিতে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সাধারণ ছুটি

ক্রুকে উদ্ধারে কী কী প্রযুক্তি ব্যবহার করল যুক্তরাষ্ট্র, ইরানিরা কেন খুঁজে পেল না

ইরানের বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র পাঠিয়েছিলাম, কুর্দিরা মেরে দিয়েছে: ট্রাম্প

সড়ক পরিবহনমন্ত্রী আ.লীগের মন্ত্রীদের মতো উত্তর দিয়েছেন: বিএনপির এমপি মনিরুল

৪৮১ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত