Ajker Patrika

সংসদ নির্বাচনে ভোটারের দায়বদ্ধতা

জাহিদ হাসান
সংসদ নির্বাচনে ভোটারের দায়বদ্ধতা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশ একটা জটিল ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা, খুন-রাহাজানি, রাজনৈতিক ও অ্যাকটিভিস্ট ব্যক্তিত্বদের নিরাপত্তাহীনতাসহ নানান সংকটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে যাবতীয় সংকটের সমাধান মনে করছে দেশের জনগণ। ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে এ দেশের জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। তাই গোটা দেশের সচেতন নাগরিকেরা ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি, যেখানে নাগরিকদের ভোটাধিকার কেবল একটি সাংবিধানিক সুযোগ নয়, বরং একটি গভীর নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বও বটে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের ভূমিকা তাই শুধু একটা ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত আছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রের মান, ন্যায়বিচার, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। ভোটার হিসেবে একজন নাগরিক যখন ভোটকেন্দ্রে যান, তখন তিনি কেবল নিজের মতামতই প্রকাশ করেন না, তিনি একটি সামষ্টিক সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে ওঠেন, যার প্রভাব পড়ে কোটি মানুষের জীবনে। এই কারণে ভোটারদের দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন রাজনীতি ও সামাজিক বাস্তবতা জটিল হয়ে উঠেছে।

প্রথমত, ভোটারদের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব হলো ভোটাধিকার প্রয়োগ করা। অনেকেই ভোট দেওয়াকে তুচ্ছ মনে করেন, কেউ কেউ ভাবেন একটি ভোটে কী-ইবা আসে-যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইতিহাসে বহু নির্বাচনে এক বা দুই ভোটের ব্যবধানে ফল নির্ধারিত হয়েছে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে প্রতিটি ভোটের মূল্য সমান। ভোট না দেওয়া মানে নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার অন্যের হাতে তুলে দেওয়া। যাঁরা ভোট দিতে যান না, তাঁরা কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন। তাই আসন্ন নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া এবং স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়া প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের প্রথম দায়িত্ব।

তবে ভোট দেওয়াই শেষ কথা নয়। কীভাবে ভোট দেওয়া হচ্ছে, কোন বিবেচনায় ভোট দেওয়া হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন দায়িত্বশীল ভোটার আবেগ, গুজব বা ব্যক্তিগত স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন না। তিনি প্রার্থী ও দলের রাজনৈতিক আদর্শ, অতীত কর্মকাণ্ড, নির্বাচনী ইশতেহার এবং জনগণের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা বিচার করে ভোট দেন। রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ইতিহাস ও সক্ষমতা যাচাই করা কঠিন হলেও জরুরি। ভোটারদের উচিত প্রশ্ন করা—এই প্রার্থী বা দল আগে কী করেছে, ক্ষমতায় গেলে কীভাবে করবে, দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে তাদের অবস্থান কী, তারা সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে কতটা সম্মান করে।

আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন পোর্টাল ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে নানান প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। এর মধ্যে সত্যের সঙ্গে মিথ্যা, গুজব মিশে যায়। অনেক সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুল তথ্য ছড়িয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। একজন দায়িত্বশীল ও সচেতন ভোটার কখনোই যাচাই-বাছাই না করে কোনো খবর বিশ্বাস করা উচিত মনে করেন না। তিনি একাধিক বিশ্বাসযোগ্য উৎস থেকে তথ্য মিলিয়ে দেখেন এবং যুক্তিবোধ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। ভুল তথ্য ছড়ানো শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষতি করে না, এটি পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ভোটারদের দায়বদ্ধতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। নির্বাচন মানেই প্রতিযোগিতা, মতের ভিন্নতা থাকবে, তর্ক-বিতর্ক হবে, কিন্তু তা যেন কখনোই সহিংসতায় রূপ না নেয়। ভোটারদের উচিত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দেওয়া এবং অন্যের ভোটাধিকারকে সম্মান করা। কোনো প্রার্থী বা দলকে সমর্থন করতে গিয়ে প্রতিপক্ষকে শত্রু ভাবা গণতন্ত্রের চেতনার পরিপন্থী। সহিংসতা, ভয়ভীতি বা চাপের মাধ্যমে ভোট আদায়ের চেষ্টা হলে ভোটারদের তা প্রত্যাখ্যান করা এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা নির্বাচন কমিশনকে জানানো উচিত।

নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার রক্ষাও ভোটার সমাজের সামষ্টিক দায়িত্বের অংশ। অনেক সময় দেখা যায়, সামাজিক চাপ, পারিবারিক বাধা বা নিরাপত্তাহীনতার কারণে এসব জনগোষ্ঠীর মানুষ ভোট দিতে উৎসাহ পায় না। একজন সচেতন ভোটার হিসেবে আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো, উৎসাহ দেওয়া এবং নিশ্চিত করা যে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে। গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সমাজের সব অংশ সমানভাবে এতে অংশগ্রহণ করে।

ভোটারদের দায়বদ্ধতা শুধু নির্বাচন দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং একটি ভোটের প্রভাব পরবর্তী পাঁচ বছর থাকবে। একজন ভোটারের সিদ্ধান্তেই প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন এবং পরবর্তী পাঁচ বছর জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবেন। ভোট দেওয়ার পরও নাগরিকদের উচিত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড নজরে রাখা, তাঁদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশ করা। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া প্রতিনিধিরা জনগণের কর্মচারী—এই ধারণা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিয়মিত জনগণের কাছে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ধর্ম, জাতিগত পরিচয় বা সংকীর্ণ আবেগের ভিত্তিতে ভোট দেওয়া থেকেও বিরত থাকা জরুরি। রাজনীতি যখন বিভাজনের রাজনীতিতে পরিণত হয়, তখন সমাজে ফাটল তৈরি হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। ভোটারদের উচিত সমন্বয়, সহাবস্থান ও সামগ্রিক কল্যাণের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই একজন সচেতন নাগরিকের পরিচয়।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন দেশ নানা সমস্যার মুখোমুখি—অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় সহিংসতা ইত্যাদি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী, দূরদর্শী ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব প্রয়োজন। সেই নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার ক্ষমতা ভোটারদের হাতেই। তাই এই নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি দেশের নাগরিকদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ।

সবশেষে বলা যায়, ভোট দেওয়া, সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া, গুজব থেকে দূরে থাকা, সহিংসতা প্রত্যাখ্যান করা, প্রান্তিকদের পাশে দাঁড়ানো এবং নির্বাচনের পরও জবাবদিহি নিশ্চিত করা—এসব মিলিয়েই একজন সচেতন নাগরিকের পরিচয়। আসন্ন নির্বাচনে যদি ভোটাররা এই দায়বদ্ধতা গভীরভাবে উপলব্ধি করেন, তবে শুধু একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই নয়, একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের পথও সুগম হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

যুক্তরাষ্ট্রে সড়কপথে জয়শঙ্করের ৪০০ মাইলের রুদ্ধশ্বাস যাত্রা, নেপথ্য কাহিনি

চট্টগ্রামে কাবিনের দিন কনের বাড়িতে পৌঁছাল বরের মৃত্যুর খবর

তাইওয়ান নিয়ে চীন কী করবে সেটা সির ব্যাপার: ট্রাম্প

গণভোটে ‘না’ দেওয়ার সুযোগ নেই: ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল

খামেনির ছবিতে আগুন দিয়ে সিগারেট ধরাচ্ছেন ইরানি নারীরা—নেপথ্যে কী?

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত