কামরুল হাসান

নির্বাচনী সমঝোতা নিয়ে ‘মতান্তরের জেরে’ তরুণদের স্বপ্নের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন সামনের সারির বেশ কয়েকজন নেতা। সেই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ পদত্যাগ করলেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা। এ নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন এই দলটি থেকে গত বুধবার পর্যন্ত অন্তত ১৫ জন নেতার পদত্যাগের ঘোষণা এল। এর বাইরে আরও পাঁচজন নেতা আছেন যাঁরা নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘নিষ্ক্রিয় থাকার’ আগাম ঘোষণাও দিয়েছেন।
এনসিপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলের নির্বাচনী সমঝোতার ঘোষণা আসে গত ২৮ ডিসেম্বর। সেই সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই দল ছাড়ার ঘোষণা দেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য তাসনিম জারা। তিনি অবশ্য সরাসরি জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতাকে তাঁর সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে দেখাননি। জারার পরপরই পদত্যাগ করেন যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ। এরপর একে একে দল ছাড়েন যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন, যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক, যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক আজাদ খান ভাসানী, দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক ওয়াহিদুজ্জামান, সদস্য আসিফ নেহাল (আসিফ মোস্তফা জামাল), মীর হাবীব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, আল আমিন টুটুল, যুগ্ম সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন এবং আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া।
নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং এর দেড় দশক পরের ওয়ান-ইলেভেনের আবহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘সংস্কার’ শব্দটি আগেও বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। এবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন করে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে সংস্কার। দেশ যাতে কিছুতেই আবার আগের মতো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কবলে না পড়ে, সে জন্য সংস্কার হয়ে ওঠে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের মূলমন্ত্র।
শুরুতে সরকারের পেছনের বড় শক্তি তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও বড় ধরনের সংস্কারের দাবিতে ছিল সোচ্চার। তারপর সংস্কারবিষয়ক কথাবার্তা দেশের বহু মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি আর তাদের সঙ্গে কায়দামতো জুড়ে থাকা জামায়াত ও জাতীয় পার্টির চেনা রাজনৈতিক ছকের বাইরে গিয়ে মধ্যপন্থী, আধুনিক ও নাগরিককেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল দলটি। শহুরে শিক্ষিত তরুণ, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী এবং প্রচলিত রাজনীতিতে বীতশ্রদ্ধ সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ নতুন সম্ভাবনা হিসেবে এনসিপির দিকে তাকিয়েছিল অনেক প্রত্যাশা নিয়ে।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই এনসিপিকে ঘিরে সেই সম্ভাবনার জায়গাটি দৃশ্যত গভীর সংকটে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক বিতর্ক ও দলীয় আদর্শসহ বিভিন্ন কারণে। তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপিকে বড় আদর্শিক পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পর দলটির ভেতরে যে ভাঙন, অনাস্থা ও হতাশা তৈরি হয়েছে, তা কেবল কয়েকজন নেতার
পদত্যাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি সরাসরি এনসিপির রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের ওপর আঘাত করেছে বলেই মনে করছেন অনেকে।
তবে শুধু জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তই যে এনসিপিকে এই নাজুক অবস্থায় নিয়ে এসেছে, তা নয়। মূলত দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কোনো কোনো নেতার আলটপকা মন্তব্য, অন্য দল বা ব্যক্তির প্রতি অকারণ কঠোরতার প্রকাশ, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা নিয়োগ-বাণিজ্যের মতো অভিযোগ এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নির্ণয়ে ‘দোদুল্যমানতা’সহ নানা কারণে অনেকেই দলটির প্রতি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। পরের দিকে তাদের ডাকা সমাবেশেও জনগণের তত বেশি স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। এনসিপি এত দিন পরিবর্তনের কথা বললেও তারা পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছে। এমন অবস্থায় জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোটে শরিক হওয়ার ঘোষণা দলে কার্যত ভাঙন ডেকে আনার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে এনসিপির নারীনেত্রীরা বেশ হতাশ বলেই মনে হচ্ছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপি শুরু থেকেই বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতার চেষ্টা চালিয়েছিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, সেখানে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলেনি। এর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে বিকল্প জোট গঠনের চিন্তাও করেছিল দলটি। সেই প্রচেষ্টায় প্রথমে গণতন্ত্র মঞ্চকে যুক্ত করার চেষ্টা হয়। পরে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ গঠিত হয়। এর আত্মপ্রকাশ ঘটে গত ৭ ডিসেম্বর। কিন্তু আসনের বাস্তব হিসাব-নিকাশে এসে সেই জোট দ্রুতই ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে গেলে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হয়।
এনসিপি থেকে সদ্য পদত্যাগ করা নীলিমা দোলা বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার সিদ্ধান্তের পর দলটির পক্ষে আর মধ্যপন্থী রাজনীতির নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, এনসিপি এখন স্পষ্টভাবেই ডানপন্থী ধারায় প্রবেশ করছে এবং সেই ধারার রাজনীতিকেই পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে।
এনসিপির এই চলমান সংকটকে শুধু পদত্যাগের সংখ্যা দিয়ে বুঝতে চাইলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। গত এক সপ্তাহে ১৫ জন নেতার পদত্যাগ গভীরতর সমস্যার দৃশ্যমান একটি উপসর্গ মাত্র। আসল সমস্যাটি হলো—দলের ভেতরে নীরব অসন্তোষ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা নিয়ে সৃষ্ট জটিল পরিস্থিতি। সংগঠনের নীতি ও প্রক্রিয়াগত সংকটের সমাধান না করে কেবল সাংগঠনিক ব্যবস্থার ওষুধ প্রয়োগ কার্যকর ফল আনবে না। তা হবে ভাঙা ভিত্তির ওপর নতুন রঙের প্রলেপ দেওয়ার মতো। এতে রঙের আস্তরে ফাটল ঢেকে রাখা গেলেও ভিতের দুর্বলতা ঠিকই থেকে যায়।
এনসিপির সঙ্গে যাঁরা শুরুতেই যুক্ত হয়েছিলেন, তাঁদের বড় অংশই এসেছিলেন একটি নির্দিষ্ট প্রত্যাশা নিয়ে। তাঁরা ভেবেছিলেন, এটি হবে এমন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নতুন, ভবিষ্যৎমুখী রাজনীতির চর্চা হবে। আইনের শাসন, নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মানসহ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ হবে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের পর সেই প্রত্যাশা অনেকটা ফিকে হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দলের তরুণদের একটি বড় অংশ।
এত দিন এনসিপির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এই তরুণদেরই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তরুণেরা মনে করেছিলেন, এই দল তাঁদের ভাষায় কথা বলবে। কিন্তু জোটের সিদ্ধান্তের পর সেই বিশ্বাসে দৃশ্যত কিছুটা ফাটল ধরেছে। বিশেষ করে মধ্যপন্থী ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের তরুণদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—এনসিপি কি শেষ পর্যন্ত পুরোনো লাভ-লোকসানের রাজনৈতিক সমীকরণেই ঢুকে পড়ল?
দেশের গত কয়েক দশকের রাজনীতির হালচাল থেকে তরুণ সম্প্রদায় ক্রমে অনেকটাই রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়েছিল। চব্বিশের গণ-আন্দোলন সেই চিত্রে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। তরুণসমাজ একবার হতাশ হলে রাজনীতিতে তাদের আগ্রহ বা আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। কিন্তু আজকের তরুণেরাই ভবিষ্যতের চিন্তা ও নেতৃত্বের উৎস। এনসিপির ক্ষেত্রে সেই অমূল্য উৎসটি শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে এনসিপির নেতৃত্ব হয়তো যুক্তি দিতে পারেন—বাংলাদেশের বাস্তব রাজনীতিতে জোট ছাড়া টিকে থাকা কঠিন। এই যুক্তি হয়তো পুরোপুরি অমূলক নয়। তবে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা ভিন্ন—সেটা হলো, আপনি কী পরিচিতি নিয়ে দেশবাসীর মনে প্রতিষ্ঠিত হতে চান? জোট রাজনীতি মানে আপস-সমঝোতার রাজনীতি হতে পারে, কিন্তু সব আপস এক রকম নয়। তরুণদের একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সম্ভাব্য জোটকে ঘোষিত মূল আদর্শ, মূল্যবোধের সঙ্গেই আপস হিসেবে দেখছেন।
দলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকজন এনসিপি নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পদত্যাগের ঘোষণাগুলো গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এখনো চূড়ান্ত নয়। অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে, আহ্বায়ক পর্যায়ে একান্ত আলোচনাও হচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও সেই মৌলিক প্রশ্নটি থেকেই যায়—সংকটের মূল কারণ যদি আদর্শিক দ্বন্দ্ব হয়, তাহলে কি কেবল সাংগঠনিক কৌশলে তার সমাধান করা সম্ভব হবে?
এনসিপির ভেতরের সূত্রগুলো স্বীকার করছে, জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্তের পর তরুণদের একটি অংশের মধ্যে দলের ব্যাপারে স্পষ্ট অনীহা তৈরি হয়েছে। এটি একটি অশনিসংকেত। কারণ, নতুন দল বিকশিত হয় সম্প্রসারণের মাধ্যমে। দলে নতুন মানুষ আসাই যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তা ক্রমে সংকুচিত হতে বাধ্য।
এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে দর-কষাকষির খবরও তরুণদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ৩৫ বনাম ৩০ আসনের হিসাব বাস্তব রাজনীতির অংশ হলেও এর প্রতীকী অর্থও আছে। তরুণদের চোখে এটি শেষ পর্যন্ত শুধুই আসনের হিসাবের শামিল। কেউ কেউ তো এমনও বলছেন, কোটাবিরোধী আন্দোলন করল যারা, তারাই কেন ‘কোটার রাজনীতির’ সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল?
এনসিপির এই সংকট শুধু একটি দলের নয়; এটি বাংলাদেশের নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। দেশের তরুণেরা বারবার নতুন রাজনৈতিক বিকল্প খোঁজেন, এরপর বারবার হতাশ হন। এই ধারাবাহিক হতাশা রাজনীতিতে তরুণদের বিমুখতা দীর্ঘ করার ঝুঁকি বাড়ায়, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। এখন এনসিপিই ঠিক করবে—তারা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রম হবে, নাকি আরেকটি হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার নাম হয়ে বেঁচে থাকবে।

নির্বাচনী সমঝোতা নিয়ে ‘মতান্তরের জেরে’ তরুণদের স্বপ্নের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন সামনের সারির বেশ কয়েকজন নেতা। সেই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ পদত্যাগ করলেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা। এ নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন এই দলটি থেকে গত বুধবার পর্যন্ত অন্তত ১৫ জন নেতার পদত্যাগের ঘোষণা এল। এর বাইরে আরও পাঁচজন নেতা আছেন যাঁরা নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘নিষ্ক্রিয় থাকার’ আগাম ঘোষণাও দিয়েছেন।
এনসিপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলের নির্বাচনী সমঝোতার ঘোষণা আসে গত ২৮ ডিসেম্বর। সেই সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই দল ছাড়ার ঘোষণা দেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য তাসনিম জারা। তিনি অবশ্য সরাসরি জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতাকে তাঁর সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে দেখাননি। জারার পরপরই পদত্যাগ করেন যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ। এরপর একে একে দল ছাড়েন যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন, যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক, যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক আজাদ খান ভাসানী, দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক ওয়াহিদুজ্জামান, সদস্য আসিফ নেহাল (আসিফ মোস্তফা জামাল), মীর হাবীব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, আল আমিন টুটুল, যুগ্ম সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন এবং আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া।
নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং এর দেড় দশক পরের ওয়ান-ইলেভেনের আবহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘সংস্কার’ শব্দটি আগেও বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। এবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন করে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে সংস্কার। দেশ যাতে কিছুতেই আবার আগের মতো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কবলে না পড়ে, সে জন্য সংস্কার হয়ে ওঠে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের মূলমন্ত্র।
শুরুতে সরকারের পেছনের বড় শক্তি তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও বড় ধরনের সংস্কারের দাবিতে ছিল সোচ্চার। তারপর সংস্কারবিষয়ক কথাবার্তা দেশের বহু মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি আর তাদের সঙ্গে কায়দামতো জুড়ে থাকা জামায়াত ও জাতীয় পার্টির চেনা রাজনৈতিক ছকের বাইরে গিয়ে মধ্যপন্থী, আধুনিক ও নাগরিককেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল দলটি। শহুরে শিক্ষিত তরুণ, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী এবং প্রচলিত রাজনীতিতে বীতশ্রদ্ধ সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ নতুন সম্ভাবনা হিসেবে এনসিপির দিকে তাকিয়েছিল অনেক প্রত্যাশা নিয়ে।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই এনসিপিকে ঘিরে সেই সম্ভাবনার জায়গাটি দৃশ্যত গভীর সংকটে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক বিতর্ক ও দলীয় আদর্শসহ বিভিন্ন কারণে। তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপিকে বড় আদর্শিক পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পর দলটির ভেতরে যে ভাঙন, অনাস্থা ও হতাশা তৈরি হয়েছে, তা কেবল কয়েকজন নেতার
পদত্যাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি সরাসরি এনসিপির রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের ওপর আঘাত করেছে বলেই মনে করছেন অনেকে।
তবে শুধু জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তই যে এনসিপিকে এই নাজুক অবস্থায় নিয়ে এসেছে, তা নয়। মূলত দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কোনো কোনো নেতার আলটপকা মন্তব্য, অন্য দল বা ব্যক্তির প্রতি অকারণ কঠোরতার প্রকাশ, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা নিয়োগ-বাণিজ্যের মতো অভিযোগ এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নির্ণয়ে ‘দোদুল্যমানতা’সহ নানা কারণে অনেকেই দলটির প্রতি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। পরের দিকে তাদের ডাকা সমাবেশেও জনগণের তত বেশি স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। এনসিপি এত দিন পরিবর্তনের কথা বললেও তারা পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছে। এমন অবস্থায় জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোটে শরিক হওয়ার ঘোষণা দলে কার্যত ভাঙন ডেকে আনার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে এনসিপির নারীনেত্রীরা বেশ হতাশ বলেই মনে হচ্ছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপি শুরু থেকেই বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতার চেষ্টা চালিয়েছিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, সেখানে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলেনি। এর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে বিকল্প জোট গঠনের চিন্তাও করেছিল দলটি। সেই প্রচেষ্টায় প্রথমে গণতন্ত্র মঞ্চকে যুক্ত করার চেষ্টা হয়। পরে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ গঠিত হয়। এর আত্মপ্রকাশ ঘটে গত ৭ ডিসেম্বর। কিন্তু আসনের বাস্তব হিসাব-নিকাশে এসে সেই জোট দ্রুতই ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে গেলে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হয়।
এনসিপি থেকে সদ্য পদত্যাগ করা নীলিমা দোলা বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার সিদ্ধান্তের পর দলটির পক্ষে আর মধ্যপন্থী রাজনীতির নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, এনসিপি এখন স্পষ্টভাবেই ডানপন্থী ধারায় প্রবেশ করছে এবং সেই ধারার রাজনীতিকেই পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে।
এনসিপির এই চলমান সংকটকে শুধু পদত্যাগের সংখ্যা দিয়ে বুঝতে চাইলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। গত এক সপ্তাহে ১৫ জন নেতার পদত্যাগ গভীরতর সমস্যার দৃশ্যমান একটি উপসর্গ মাত্র। আসল সমস্যাটি হলো—দলের ভেতরে নীরব অসন্তোষ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা নিয়ে সৃষ্ট জটিল পরিস্থিতি। সংগঠনের নীতি ও প্রক্রিয়াগত সংকটের সমাধান না করে কেবল সাংগঠনিক ব্যবস্থার ওষুধ প্রয়োগ কার্যকর ফল আনবে না। তা হবে ভাঙা ভিত্তির ওপর নতুন রঙের প্রলেপ দেওয়ার মতো। এতে রঙের আস্তরে ফাটল ঢেকে রাখা গেলেও ভিতের দুর্বলতা ঠিকই থেকে যায়।
এনসিপির সঙ্গে যাঁরা শুরুতেই যুক্ত হয়েছিলেন, তাঁদের বড় অংশই এসেছিলেন একটি নির্দিষ্ট প্রত্যাশা নিয়ে। তাঁরা ভেবেছিলেন, এটি হবে এমন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নতুন, ভবিষ্যৎমুখী রাজনীতির চর্চা হবে। আইনের শাসন, নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মানসহ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ হবে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের পর সেই প্রত্যাশা অনেকটা ফিকে হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দলের তরুণদের একটি বড় অংশ।
এত দিন এনসিপির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এই তরুণদেরই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তরুণেরা মনে করেছিলেন, এই দল তাঁদের ভাষায় কথা বলবে। কিন্তু জোটের সিদ্ধান্তের পর সেই বিশ্বাসে দৃশ্যত কিছুটা ফাটল ধরেছে। বিশেষ করে মধ্যপন্থী ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের তরুণদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—এনসিপি কি শেষ পর্যন্ত পুরোনো লাভ-লোকসানের রাজনৈতিক সমীকরণেই ঢুকে পড়ল?
দেশের গত কয়েক দশকের রাজনীতির হালচাল থেকে তরুণ সম্প্রদায় ক্রমে অনেকটাই রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়েছিল। চব্বিশের গণ-আন্দোলন সেই চিত্রে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। তরুণসমাজ একবার হতাশ হলে রাজনীতিতে তাদের আগ্রহ বা আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। কিন্তু আজকের তরুণেরাই ভবিষ্যতের চিন্তা ও নেতৃত্বের উৎস। এনসিপির ক্ষেত্রে সেই অমূল্য উৎসটি শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে এনসিপির নেতৃত্ব হয়তো যুক্তি দিতে পারেন—বাংলাদেশের বাস্তব রাজনীতিতে জোট ছাড়া টিকে থাকা কঠিন। এই যুক্তি হয়তো পুরোপুরি অমূলক নয়। তবে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা ভিন্ন—সেটা হলো, আপনি কী পরিচিতি নিয়ে দেশবাসীর মনে প্রতিষ্ঠিত হতে চান? জোট রাজনীতি মানে আপস-সমঝোতার রাজনীতি হতে পারে, কিন্তু সব আপস এক রকম নয়। তরুণদের একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সম্ভাব্য জোটকে ঘোষিত মূল আদর্শ, মূল্যবোধের সঙ্গেই আপস হিসেবে দেখছেন।
দলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকজন এনসিপি নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পদত্যাগের ঘোষণাগুলো গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এখনো চূড়ান্ত নয়। অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে, আহ্বায়ক পর্যায়ে একান্ত আলোচনাও হচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও সেই মৌলিক প্রশ্নটি থেকেই যায়—সংকটের মূল কারণ যদি আদর্শিক দ্বন্দ্ব হয়, তাহলে কি কেবল সাংগঠনিক কৌশলে তার সমাধান করা সম্ভব হবে?
এনসিপির ভেতরের সূত্রগুলো স্বীকার করছে, জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্তের পর তরুণদের একটি অংশের মধ্যে দলের ব্যাপারে স্পষ্ট অনীহা তৈরি হয়েছে। এটি একটি অশনিসংকেত। কারণ, নতুন দল বিকশিত হয় সম্প্রসারণের মাধ্যমে। দলে নতুন মানুষ আসাই যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তা ক্রমে সংকুচিত হতে বাধ্য।
এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে আসন ভাগাভাগি নিয়ে দর-কষাকষির খবরও তরুণদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ৩৫ বনাম ৩০ আসনের হিসাব বাস্তব রাজনীতির অংশ হলেও এর প্রতীকী অর্থও আছে। তরুণদের চোখে এটি শেষ পর্যন্ত শুধুই আসনের হিসাবের শামিল। কেউ কেউ তো এমনও বলছেন, কোটাবিরোধী আন্দোলন করল যারা, তারাই কেন ‘কোটার রাজনীতির’ সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল?
এনসিপির এই সংকট শুধু একটি দলের নয়; এটি বাংলাদেশের নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। দেশের তরুণেরা বারবার নতুন রাজনৈতিক বিকল্প খোঁজেন, এরপর বারবার হতাশ হন। এই ধারাবাহিক হতাশা রাজনীতিতে তরুণদের বিমুখতা দীর্ঘ করার ঝুঁকি বাড়ায়, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। এখন এনসিপিই ঠিক করবে—তারা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রম হবে, নাকি আরেকটি হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার নাম হয়ে বেঁচে থাকবে।

এটি একটি পরিত্যক্ত ভবন এবং এর আঙিনা ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। কিন্তু না, ভবনটি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর আঙিনা ময়লা ফেলার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ছবিটি যে কথাই বলুক না কেন, প্রকাশিত খবর বলছে, ওই ভবনটি একটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের এবং স্থানান্তরিত নতুন ভবনে চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হলেও পুরোনো ভবনটিতে...
১৫ ঘণ্টা আগে
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশ একটা জটিল ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা, খুন-রাহাজানি, রাজনৈতিক ও অ্যাকটিভিস্ট ব্যক্তিত্বদের নিরাপত্তাহীনতাসহ নানান সংকটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে যাবতীয়...
১৬ ঘণ্টা আগে
রাজশাহীর নওহাটা কলেজ মোড়ের একটি রাস্তার কাজে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে মার খেয়েছেন একজন বিএনপি নেতা। তিনি কার কাছে চাঁদা চাইতে গিয়েছিলেন? স্থানীয় যুবদল কর্মীর কাছে। যুবদল কর্মী কি নিজেই ঠিকাদারির কাজটা পেয়েছিলেন? না। তিনি পাননি। মূল ঠিকাদার রাস্তার কাজের অংশ মাটি কাটার কাজটি দিয়েছিলেন এই যুবদল কর্মীকে।
২ দিন আগে
মার্কিন বাহিনী চলতি সপ্তাহের শুরুতে পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে সস্ত্রীক তাঁর দেশ থেকে তুলে নিয়ে গেছে। প্রথমে রাজধানী কারাকাস থেকে হেলিকপ্টারে করে তাঁদের নেওয়া হয় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইও জিমায়। তারপর সে জাহাজে করে মাদুরো দম্পতিকে নেওয়া হয়...
২ দিন আগে