Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

অধিকাংশ অপরাধই স্পনসরড ক্রাইম

অধিকাংশ অপরাধই স্পনসরড ক্রাইম
আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০: ৪৫

ড. তৌহিদুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ। অপরাধ, অপরাধ-অর্থনীতি, অপরাধের সমষ্টিভিত্তিক সমাধান, অপরাধের রূপান্তর প্রসঙ্গ নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করেন। সম্প্রতি চাঁদাবাজি, ভবন-বাড়ি দখলের নানা ঘটনা, ছিনতাই বেড়ে যাওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ ও প্রতিকার নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।

মিরপুরে একটি টিকাদান কেন্দ্র দখল করা হয়েছে। এরপর মোহাম্মদপুর ও আদাবরেও এমন ঘটনা ঘটেছে। চাঁদাবাজি, ভবন দখল, ভাঙচুর—এসব প্রায় সব ঘটনায় অভিযোগ এসেছে বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। এই অঘটনগুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মিরপুরে টিকাকেন্দ্র দখল, একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের অফিস ভাঙচুর ও দখলের অভিযোগ আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। আমরা শুধু চরিত্রগুলোর বদল দেখি। রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করে দখল-বাণিজ্য, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজি বাংলাদেশে অনেক পুরোনো এবং অত্যন্ত শক্তিশালী অপরাধ। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ আমাদের ‘অপরাধ-অর্থনীতি’ ক্রমে আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

খোলা চোখে আমরা দেখি অপরাধীরা সামনে আছে। কিন্তু তাদের পেছনে আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা গোষ্ঠী বা কিছু ব্যক্তি থাকেন। তাঁরা অপরাধীদের আইনের মুখোমুখি হওয়া থেকে দূরে রাখেন। মামলা হলেও শাস্তির মাত্রা নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন। চাঁদাবাজি, দখল ও আধিপত্য বিস্তারের নেপথ্যে যাঁরা থাকেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশ্রয়কে সরকার যদি আইনি প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে এই প্রবণতা বাড়তেই থাকবে। আমরা সেটাই দেখছি।

সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিল। আর মানুষ তাতে আস্থা রেখেছিল। কারণ, ৫ আগস্টের পর এটি প্রথম নির্বাচিত সরকার। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিবর্তনের একটা আলোড়ন তৈরি করেছে ৫ আগস্ট। কিন্তু আমাদের সমস্যা হলো, নীতিনির্ধারকেরা পরিবর্তনের কথা মুখে যতটা স্বীকার করেন, কাজে ততটা বাস্তবায়ন করেন না।

অপরাধ একধরনের অব্যবস্থাপনার ফল। আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ না হলে অপরাধ-সংস্কৃতি বাড়ে। প্রতিটি অব্যবস্থাপনার সঙ্গে অর্থ, রাজনৈতিক সুবিধা এবং ব্যক্তির সুবিধাভোগের বিষয় জড়িত। যাঁরা রাষ্ট্রের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবেন, তাঁরাই যদি নেপথ্যে থেকে নেতৃত্ব দেন এবং সুবিধাভোগী হন, তাহলে সেটা শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর যেকোনো সমাজে একই পরিণতি ডেকে আনবে।

এখন কথা হলো, সব অপরাধী ও অভিযুক্তের ক্ষেত্রে সমানভাবে আইনের প্রয়োগ করতে হবে। যাঁরা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী, প্রশ্রয়ের মধ্যে আছেন কিংবা সরকারের আশপাশে থাকেন, তাঁরা কার কী দখল করবেন, কার কাছ থেকে চাঁদা নেবেন, কার অফিস বা বাড়ি দখল করবেন, এই পরিকল্পনা করেন। আইন প্রয়োগে ঘাটতি দেখা দিলে এর বৈশিষ্ট্য দাঁড়ায় এই যে, কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কারও বিরুদ্ধে হয় না। আইন প্রয়োগ এভাবে হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব নয়।

কিন্তু স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটি বিএনপির বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ। তাঁর এই বক্তব্য কি অপরাধ বাড়াতে উৎসাহিত করবে?

স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক সরকার থেকে শুরু করে যত সরকার দেখেছি, সবার মধ্যেই সংকট অস্বীকার করার একটা মানসিকতা আছে। এই মানসিকতা জগদ্দল পাথরের মতো দায়িত্বে থাকা প্রত্যেকের পিঠে চেপে বসে। মনে করা হয়, নিজের ও দলের নেতা-কর্মীদের ভুল বা অপরাধ স্বীকার করলে জনপ্রিয়তা কমবে আর বিরোধীরা সমালোচনার সুযোগ পাবে।

অভিযুক্তের পরিচয় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকার বা সরকারের সমর্থকেরা নানা ব্যাখ্যা দিতে পারেন, কিন্তু তাতে লাভ নেই। কারণ, এটা ১৯৮০ বা ৯০-এর দশক নয়, এটা ২০২৬ সাল। যতটুকু গোপন করার চেষ্টা হয়, ততটুকুই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যপ্রমাণসহ বেরিয়ে আসে। এ জন্য এ সময়ে সংকট স্বীকার করে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়াই জরুরি। কোনো সরকার যদি পুরোনো আমলের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে চায়, তাহলে বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে তার রাজনৈতিক যোগাযোগে দূরত্ব তৈরি হবে। দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিলে বা সমালোচনাকে সরকারবিরোধিতা বললে সেই দূরত্ব ঠেকানো যাবে না।

সরকার শুরু থেকেই বলছে, তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সরকারপ্রধানের বক্তব্য হলো, আইনবিরুদ্ধ কাজে যে-ই অভিযুক্ত হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যবস্থা নেওয়ার প্রথম ধাপ হলো পরিস্থিতিটা স্বীকার করা। যেখানে যৌক্তিক তথ্যপ্রমাণ ও ভিডিও আছে, সেখানে অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় ও সক্রিয়তা স্বীকার করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সময়; অস্বীকার করে পার পাওয়ার বা জনগণকে ভিন্ন ধারণায় আটকে রাখার সময় এটা নয়। স্বীকার করে সংশোধন করলে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিলে এই সরকারই বরং অধিক জনপ্রিয় হবে। বিরোধী দল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সংস্কারের প্রসঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক অনিচ্ছার যে কথা বলে, তার বিপরীতে জনগণের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম জানে, দীর্ঘদিনের জঞ্জাল ছয় মাসে সরিয়ে ফেলা যায় না। কিন্তু যেখানে অনিয়ম ও অপরাধ হচ্ছে, সরকার সেটা স্বীকার করুক এবং ব্যবস্থা নিক, এটাই তারা চায়। প্রতিটি ঘটনায় সরকার এটা করতে পারলে জনগণ, বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে একটা কার্যকর রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ তৈরি হবে। তাতে সরকারের জনপ্রিয়তা এবং সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।

সাম্প্রতিক কয়েক মাসে চুরি-ছিনতাই বেড়েছে। সব জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ আছে। ৫ আগস্টের পর থেকে এই বাহিনী এখনো কেন সক্রিয় হচ্ছে না? এর দায় কার?

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নির্বাচিত সরকারের সাত মাস পরও কেন তারা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না? আমি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নাতিশীতোষ্ণ অবস্থায় দেখি, অর্থাৎ খুব ভালো নয়, আবার খুব খারাপও নয়।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের সদিচ্ছায় ভাঙন ও অকার্যকর অবস্থা তৈরি হয়েছে। ঘুরে দাঁড়াতে তাদের সময় লাগবে, রাতারাতি এটা বদলাবে না। তবু যেসব অপরাধে তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না বা নিতে পারছে না, আইনগতভাবে দেখলে সেটা তাদেরই বড় দায়।

তবে একটা জটিলতাও আছে। ব্যবস্থা নিতে গিয়ে তারা অনেক সময় বিপাকে পড়ে, আবার না নিলে সমালোচিত হয়। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতায় ব্যবস্থা না নিলে সমালোচনা হয়। আবার সরকারি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কারও অপরাধে ব্যবস্থা না নিলে সেটাকে প্রশংসাসূচক একটা অলিখিত সংকেত হিসেবে দেখা হয়। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দোষারোপ করলেই হবে না। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কি না, সেটাও বড় প্রশ্ন।

আরেকটি ব্যত্যয় হলো, এ বাহিনীর নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এখনো পেশাগত দূরত্ব আছে। চব্বিশের অভ্যুত্থানে আহত-নিহত পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে অন্তর্বর্তী বা বর্তমান সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পুলিশ নিজেরাও নিজেদের অবস্থান ও পেশাদারত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু করতে পারেনি। যে বাহিনী নিজেদের বহু সদস্যের আহত-নিহত হওয়ার বিচারে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে না, তারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আমূল বদলে ফেলবে, এ নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় আছে।

আরেকটি বিষয় সরকারের খতিয়ে দেখা দরকার। চুরি, ছিনতাই, অপহরণ, চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্য ও মাদক-বাণিজ্য হলো অর্থের বিনিময়ে ঘটানো অপরাধ! কেউ কেউ হয়তো রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে কারণ হিসেবে দাঁড় করাতে চান। তাঁরা অর্থ দিয়ে অপরাধী তৈরি করছেন কি না বা পেশাদার অপরাধীদের সক্রিয় করছেন কি না, সেটা তদন্ত করা দরকার। কিছু অপরাধের ধরন ও প্রক্রিয়া দেখে আমার মনে হয়, এর সঙ্গে অর্থের যোগ আছে। একে আমরা ‘স্পনসরড ক্রাইম’ও বলতে পারি।

সবকিছুতে পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, দোষারোপ করে এটা নিয়ন্ত্রণ করা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। কথায় কথায় বদলি, ভয়ভীতি বা চাকরিগত হুমকি দিলে তাদের মনোবল আরও ভাঙবে, আর অপরাধীরা আরও সক্রিয় হবে।

আমাদের দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর একটা বড় সমস্যা হলো, নীতিনির্ধারণী স্তর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত একটা বড় অংশ মনে করে, দল ক্ষমতায় এলে তারা যা খুশি করতে পারবে। বিরোধী দলে থাকতে জেল খেটেছেন, টাকা খরচ করেছেন, ঘরে থাকতে পারেননি, মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন। এখন সেই কষ্টের আর্থিক ক্ষতিপূরণ তাঁরা নেবেন, কারও কিছু দখল করে হোক, চাঁদাবাজি করে হোক বা মাদক-বাণিজ্যসহ অন্য অপরাধ করে হোক। এই মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাই এই মুহূর্তে সরকারের অন্যতম কাজ হলো দলের নেতা-কর্মীদের অপরাধমুক্ত রাখা।

মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, সরকার থেকে দলকে আলাদা করা। সরকারগুলো এ কথা বলে কিন্তু দিন শেষে করে না। গত সাত মাসে আমরা সরকারের কার্যক্রম দেখেছি, দলের কার্যক্রম দেখছি না। অথচ সরকারের মেয়াদ নির্দিষ্ট, দলের আসলে কোনো মেয়াদ থাকে না। দলকে যদি রাজনৈতিকভাবে কার্যকর ও ক্রিয়াশীল না রাখা হয়, ধীরে ধীরে তার কার্যক্রম সীমিত হবে এবং জনগণের সঙ্গে দূরত্ব বাড়বে। মেয়াদ শেষে জনগণের সামনে কী নিয়ে যাবে? তাই সরকারের উচিত দলকে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ক্রিয়াশীল এবং আরও জনবান্ধব করা।

গত সরকারের সময় এই বাহিনীর প্রতি দলীয় আনুগত্যের অভিযোগ ছিল। নতুন সরকারও এ বাহিনীকে সক্রিয় করতে পারছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অধ্যাদেশ বা সংস্কার কমিশনও হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। এখান থেকে পুলিশকে কীভাবে দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে সক্রিয় করা যায়?

আমরা পুলিশের মধ্যে সংস্কার চাই, আর সংস্কারের মূল বিষয় হলো পুলিশ বাহিনীকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া। এর মানে হলো, তারা সরকারের নির্দেশে চলবে না, সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে। বাস্তবতার নিরিখে অর্থবহ আলোচনার মধ্য দিয়ে তারা পদক্ষেপ নেবে। সরকার তার উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কী ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দরকার, সেটা বাহিনীকে জানাবে; বাহিনী আইনি প্রক্রিয়ায় সেই পরিবেশ তৈরি করবে।

কিন্তু অতীতেও কমিশন হয়েছে, আলোচনা হয়েছে, তবু তা কখনো আলোর মুখ দেখেনি। কেন? রহস্যটা এখানেই। কোনো রাজনৈতিক সরকার মনে করে, পুলিশ ও তাদের দলীয় ছাত্রসংগঠন যদি তাদের পক্ষে কাজ না করে, তাহলে তারা মেয়াদ শেষ করতে পারবে না। পুলিশ তাদের বিরোধী মত ও দলকে হামলা-মামলা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে আর ছাত্রসংগঠন দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তচর্চা, মতপ্রকাশ ও আন্দোলন-সংগ্রামের পরিসর নিয়ন্ত্রণ করবে। বর্তমান সরকারের সাত মাসে এই দুই সংগঠনকে অতিমাত্রায় অপব্যবহার করা হয়েছে, এমনটা আমরা দেখছি না। তবে কিছু আলামত লক্ষ করা যাচ্ছে।

পুলিশ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে, এ কথা এখনো বলা যায় না। বরং অভিযুক্ত ব্যক্তি শক্তিশালী হলে পুলিশকে সরকারের আদেশ-নিষেধের অপেক্ষা করতে হয়। দলীয় প্রভাবের বাইরে গিয়ে জনস্বার্থে আইনি প্রক্রিয়ায় কাজ করার প্রবণতা আমরা দেখছি না; বরং রাজনৈতিক পরিচয়ের দিকে হেলে পড়ার প্রবণতাই বেশি।

আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনো পুলিশের অনেকে যতটা পুলিশ ছিলেন, তার চেয়ে বেশি ছিলেন আওয়ামী লীগ। এই প্রবণতা এখনো দৃষ্টিকটু পর্যায়ে পৌঁছায়নি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে চর্চা আছে যে সরকারের মতাদর্শ ধারণকারীদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন ও পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। ফলে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালু করা সম্ভব না হলে পুলিশ বা কোনো সরকার এই অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবে না।

আমরা পুলিশ কমিশন গঠনের কথা বলি, যাতে পুলিশ স্বাধীনভাবে জনস্বার্থে আইন প্রয়োগ করতে পারে এবং অপরাধী, অপরাধপ্রবণ ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিতে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তাদের জন্য সহজ হয়। এই কমিশন না হওয়া পর্যন্ত ঘাটতি থাকবে। তবে কমিশন হলেই সমস্যা মিটে যাবে, তাও মনে করি না। রাজনৈতিক দল যদি নিজের সমর্থকদের বসিয়ে একটি আজ্ঞাবহ কমিশন গঠন করে, তাহলে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। সুতরাং পুলিশ কতটা স্বাধীনভাবে, জনস্বার্থে এবং রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে থেকে সবার জন্য কাজ করতে পারবে, তা অনেকগুলো ‘যদি’র ওপর নির্ভর করছে। মূল কথা হলো, কোনো সরকার নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ বা ইচ্ছা পূরণে পুলিশকে ব্যবহার করবে না এবং পুলিশ সরকারের মতাদর্শ ধারণ করবে, তা বিবেচনায় নেবে না।

প্রশ্ন হলো, অতীতের রাজনৈতিক সরকারগুলো এই ধারা চালু রেখেছে, তাহলে বর্তমান সরকার তো ভাববে এটা চালু রাখলেই তার রাজনৈতিক সুবিধা। কিন্তু আমি আবারও বলতে চাই, এটি ৫ আগস্টের পর প্রথম রাজনৈতিক সরকার, যার কাছে মানুষের প্রত্যাশা, গণ-অভ্যুত্থানের অভিপ্রায় ও জন-আকাঙ্ক্ষা তারা ধারণ ও বাস্তবায়ন করবে। সেই প্রত্যাশা থেকেই একটা বড় অংশ মানুষ এই সরকারকে ভোট দিয়েছে। নির্বাচনের আগে সরকার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, মানুষ তার কতটা বাস্তবায়ন হয় তা দেখতে চায়। সাত মাসে সব করে ফেলতে হবে, এমন কথা আমরা বলছি না; কোনো সরকারের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে, আর সরকারের কেউ কেউ জন-আকাঙ্ক্ষা নিয়েই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করছেন। এতে মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ছিনতাইয়ের কবলে পড়া ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, থানায় গেলে ছিনতাই বা চুরির শিকার হলেও তাঁদের মোবাইল ফোন ‘হারানো গিয়েছে’ মর্মে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বলা হচ্ছে। এর কারণ কী?

এই অভিযোগ আমরা প্রায়ই শুনি। কারও মূল্যবান জিনিস চুরি বা কেউ ছিনতাইয়ের কবলে পড়লে থানায় গেলে বলা হয়, ‘হারিয়ে গেছে’ মর্মে জিডি করতে। হারিয়ে যাওয়ার অর্থ কী? দায়টা ব্যক্তির ঘাড়ে চাপানো, যেন তিনি নিজের মূল্যবান জিনিস ঠিকমতো সামলে রাখতে পারেননি। অবশ্য সব ক্ষেত্রে এমন হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা টাকা উদ্ধারও করে দিচ্ছে। কিন্তু অভিযোগের মাত্রা বেশি।

ছিনতাই বা চুরির জিডি নিলে সেটা পুলিশের দায় হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, তারা আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পারেনি বলেই মানুষ অপরাধের শিকার হয়েছে। আর ‘হারিয়েছে’ বলে জিডি হলে দায় পড়ে ব্যক্তির ওপর। ভুক্তভোগীর পক্ষে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া আইনত অপরাধ। প্রক্রিয়াগতভাবেও পুলিশ এটা করতে পারে না, কোনো সুযোগ নেই। তবু বাংলাদেশে এটা ঘটছে। কারণ, এসব অভিযোগে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা বড় ধরনের জবাবদিহির মুখে পড়ছেন না। জবাবদিহি না থাকলে দায়হীনভাবে দায়িত্ব পালন হবেই। ফলে দুটি পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রথমত, ভুক্তভোগীরা সব সময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকেন, যে রাষ্ট্রে তাঁকে রক্ষা করার কেউ নেই; বিপদে পুলিশের কাছে গেলেও প্রতিকার মেলে না। গণমাধ্যমে এমন ঘটনা প্রচারিত হলে অন্যদের মধ্যেও ভয় কাজ করে। দ্বিতীয়ত, এটি অপরাধীদের অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়িয়ে দেয়। অপরাধী যখন দেখে, অপরাধের পর পুলিশ ভুক্তভোগীর ওপরই দায় চাপাচ্ছে, তখন সে মনে করে আইন ও বিচারের মুখোমুখি হওয়ার এবং রাষ্ট্রের সক্রিয় হওয়ার সুযোগ সীমিত। ফলে অপরাধীরা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

তাহলে অপরাধীদের শক্তিশালী করে পুলিশের লাভ কী? আমি আবারও বলছি, পুলিশের সবাই নন, কিন্তু কারও কারও সঙ্গে অপরাধ-অর্থনীতির ভাগবাঁটোয়ারার সম্পর্ক আছে। যাঁরা এই সম্পর্ক বজায় রাখেন, তাঁরাই এ ধরনের ব্যবস্থা নেন। এ অভিযোগ গত সাত মাসে তৈরি হয়নি, এটি বহু পুরোনো। যাঁরা রক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, তাঁদের কারও কারও সঙ্গে অপরাধীদের এই ভাগবাঁটোয়ারার সম্পর্ক আছে। সরকার যত দিন এই গোষ্ঠীকে শনাক্ত করে পেশাগত জবাবদিহি ও আইনগত ব্যবস্থার আওতায় আনতে না পারবে, তত দিন এই অভিযোগ থেকে সহজে পরিত্রাণ মিলবে বলে আমি মনে করি না।

পুলিশপ্রধান বলেছেন, যারা অপরাধ করে জেলে যায়, মুক্তি পেয়ে তারাই আবার একই অপরাধে জড়ায়। তাহলে কি জেলব্যবস্থা তাদের সংশোধন করতে পারছে না? জেলব্যবস্থার সংকটটা কী? এই সংকট না কাটলে কি অপরাধ কমানো সম্ভব?

কারাব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যই হলো শাস্তির মধ্য দিয়ে অপরাধীকে সংশোধন করে আইন মান্যকারী নাগরিক হিসেবে সমাজে ফেরানো এবং অপরাধীর সংখ্যা কমানো। বিশ্বের অনেক দেশ কারাগারে সংশোধনমূলক কার্যক্রম এতটা আধুনিক করেছে যে, তারা অপরাধীদের ভালো নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।

বাংলাদেশের কারাব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত আধুনিকায়ন হয়েছে; ভবন তৈরি হয়েছে, অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়েছে। কিন্তু সেবার আধুনিকায়ন হয়নি, অর্থাৎ কয়েদি ও অভিযুক্তদের সংশোধনমূলক সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বরং সেকেলে, নির্যাতন ও নিপীড়নমূলক মানসিকতা এবং অপরাধীদের পুনর্বাসনের সামাজিক স্বীকৃতি এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই আমরা দেখি। কখনো এটা অভিযোগ, কখনো সত্যি, তবে বলা হয়, ছোট অপরাধী কারাগারে গিয়ে বড় অপরাধী হয়ে ফেরে। কারণ, সেখানে সংশোধনের ব্যবস্থা সীমিত, যতটুকু আছে তাও পর্যাপ্ত নয়।

কয়েদির সক্ষমতা বাড়ানো, মুক্তির পর তাকে কর্মক্ষম ও উপার্জনক্ষম করে তোলা, অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখার জন্য নজরদারি এবং কারাভোগ-পরবর্তী সেবা বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। কারা কর্তৃপক্ষ এমনকি বলতে পারে না, একবার সাজা ভোগ করে বের হওয়া ব্যক্তিদের কত শতাংশ আবার অন্য মামলায় কারাগারে এসেছে। এই পরিসংখ্যানই আমাদের নেই। কারাগারকে যখন শুধু শাস্তি দেওয়ার স্থান হিসেবে দেখা হয়, তখন এর চেয়ে ভালো ফল আশা করা যায় না।

বিশ্বের অনেক দেশ সংশোধন ও পুনর্বাসনকে এতটা শক্তিশালী করেছে যে তারা ‘গ্রিন প্রিজন’ ঘোষণা করতে পেরেছে, যেখানে কয়েদির সংখ্যাই কমে গেছে। সেখানে অভিযুক্তের দ্রুত বিচার হয়, তার অপরাধপ্রবণতা বিবেচনা করে সংশোধনের কাঠামো ঠিক করা হয় এবং দ্রুত তাকে আইন মান্যকারী নাগরিক হিসেবে সমাজে ফেরানো হয়। আমরা তা পারছি না। তাহলে এই প্রত্যাশা করি কীভাবে? আমরা কারাগারকে ভাবছি প্রমাণিত, অভিযুক্ত কিংবা রাজনৈতিক বা সামাজিক মতাদর্শের কারণে ধরা পড়া যেই হোক, তাকে আটকে রাখার জায়গা হিসেবে। কারাগারকেন্দ্রিক অপরাধপ্রবণতাও আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। যাঁদের আলোর পথ দেখানোর কথা, তাঁদের বিরুদ্ধেই যদি অন্ধকার চর্চার অভিযোগ ওঠে, আর সেই অভিযোগ অনেক ক্ষেত্রে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সমস্যা পাকাপোক্ত হয়। বাংলাদেশে আমরা সেটাই দেখছি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত