মৃত্যুঞ্জয় রায়

উত্তর আমেরিকার শীতকালটা বেশ অদ্ভুত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ১০ তারিখে পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গে এসে দেখলাম, সব ঝকঝকে পরিষ্কার, রোদ ঝলমল দিন, রাস্তার কোলে সরু ফিতার মতো স্বল্প কিছু তুষার স্তূপ জড়ো হয়ে রয়েছে, ছোট ছোট সাদা সাদা তুষারের পাতলা টুকরো রয়েছে পাহাড়ের উপত্যকাজুড়ে, নিষ্পত্র বৃক্ষময় বনের ভেতর। কিন্তু পরদিন থেকেই যে শীতের দাপটটা হঠাৎ এমন বদলে যেতে পারে, তা কখনো কল্পনাও করিনি। উত্তর আমেরিকায় আবহাওয়াগত শীতকাল ধরা হয় তিন মাস—ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানে এ বছর শীতকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ ডিসেম্বর থেকে ২০ মার্চ। এ সময়ের মধ্যে শীতকালের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার পূর্বাভাস ছিল, ১২ থেকে ১৫ ডিসেম্বর উত্তর আমেরিকায় চলবে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও তুষারঝড়। প্রবল তুষারপাতে ঢেকে যাবে সব এলাকার মাঠঘাট, এমনকি কোথাও কোথাও ২ ফুট পুরু হয়ে তুষার জমবে। বাস্তবে সেসব ঘটনা যে কেমন, তা এবার প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হলো। চোখে দেখা আর অনুভব করা—দুটোই সাংঘাতিক সুন্দর। সেখানকার বাসিন্দারা জানালেন, শীতে এ ধরনের ঘটনা এখানে খুবই স্বাভাবিক, তাপমাত্রা সব সময়ই হিমাঙ্কের নিচে থাকে। তবে সেটা সাধারণত আমরা দেখি জানুয়ারি থেকে, এবার একটু আগেই শীতটা চলে এসেছে।
দুই দিন পরই দেখলাম সকালবেলাটা বেশ আলো ঝলমল রৌদ্রদীপ্ত। পিটসবার্গ শহরে ট্রেনটন অ্যাভিনিউর বাসা থেকে জম্পেশ শীতপোশাক পরে বের হলাম আমেরিকার শীতকাল ও শীতের প্রকৃতি দর্শনে। আগের সারা রাত ধরে তুষারপাত হয়েছে। বড় বড় গাছপালার ওপর প্রায় ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি পুরু হয়ে তুষার জমে আছে। বাসার সিঁড়ি থেকে শুরু করে রাস্তা, ঝোপঝাড়, বাড়ির ছাদ—সব কেমন স্নিগ্ধ শুভ্র বরফে ঢেকে আছে। যেদিকে তাকাই, সাদা আর সাদা, সকালের তাপমাত্রা দেখলাম মাইনাস ৬ ডিগ্রি সেলিসিয়াস। হাঁটার জন্য দরকার ছিল বুটজুতা, গায়ে চাপাতে হতো পাফার জ্যাকেট, মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ। সেই সঙ্গে দেহের তাপ আটকে রাখার জন্য থার্মাল পোশাক। কেডস আর মোটা মোজা, হাতে উলের দস্তানা আর গলায় মাফলার পেঁচিয়ে সব রক্ষা হলো না। তবু মন্দ লাগছে না, তুষারধুলার মধ্যে পা ডুবিয়ে থপাস থপাস করে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলেছি।
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পত্রহীন ওক, বার্চ, ইস্টার্ন হেমলক, এলম, মেপল, চেস্টনাট বৃক্ষেরা। উলঙ্গ গাছগুলো গেছে একটা লম্বা শীতঘুমে। শীতের পর সে ঘুম ভাঙবে, গাছগুলো পল্লবিত ও মুকুলিত হতে শুরু করবে। কোথাও একরত্তি সবুজ নেই, ফুল নেই, ফল নেই; তবে গাছে গাছে পাখিরা আছে। মাঝে মাঝে ঝাঁক বেঁধে পালকের তুষার ঝেড়ে উড়াল দিচ্ছে। চড়ুই আছে, কাকও আছে। এত তীব্র শীতলতা ও তুষারময়তার মধ্যেও কী করে সবুজ আছে লরেল, পাইন ও ইউগাছগুলো! তুষারের বোঝা মাথায় নিয়ে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে ঝোপগুলো, এমনকি তুষারচাপা ঘাসগুলোও সবুজ। একটা গাছে ঝুলছে অজস্র ছোট ছোট লাল টুকটুকে ফল—ক্র্যাব আপেল।
বিকেলে গেলাম মনরোভিলে। সেখানেও দেখা পেলাম ঝোপভর্তি খুদে খুদে বারবেরি ফলের, সবুজ পাতাভর্তি সাদা সিডার, ক্রিসমাস ট্রি ও পাইনগাছের। তবে পাহাড়ের উপত্যকায় থাকা কালো কালো নিষ্পত্র ডালপালার ফাঁক দিয়ে সূর্য ডোবার দৃশ্যটা ছিল অপূর্ব। দিনের শেষ আলোটুকু মেখে ছিল সাদা তুষারের গায়ে গায়ে। পরদিন সারা দিন ধরে চলল তুষারপাত, তাপমাত্রা নেমে গেল মাইনাস ১৩ ডিগ্রি সেলিসিয়াসে। ঘরের ভেতর বসে কাচের জানালা দিয়ে দেখতে থাকলাম সেই তুষারকণা পতনের দৃশ্য। হালকা তুলার মতো তুষারকণাগুলো দুপুর থেকেই ঝরছে বৃষ্টির মতো। রোদ নেই, রাস্তায় কোনো মানুষ নেই, গাড়ি নেই, আছে কেবল সাদা তুষারকণা আর তীব্র শীতলতা। পূর্বাভাস ছিল—ওদিন রাত ২টা পর্যন্ত এভাবে তুষার ঝরবে। তুষার ঝরতে ঝরতে ঘরের বাইরে কোথাও আর সাদা হতে বাকি রইল না।
রাতে যে তুষারকণার স্তূপ জোনাকির মতো জ্বলে, সে অভিজ্ঞতা এই প্রথম হলো। রাত ১০টায় বের হলাম সেই অপার্থিব সুন্দরের টানে ঘর থেকে। রাতের নৈঃশব্দ্যে চারদিক ধবধবে তুষারে ঝলমল করছে, যেন পূর্ণিমার রাত। তুষারপাতের এ সৌন্দর্য সহ্য করা কঠিন। বরফকণাগুলো যেন জমে যাওয়া পতঙ্গ, জোনাকির মতো জ্বলছে। ডালের ওপরে, পাতার ওপরে ঝরে পড়ছে জ্যোৎস্নার তরল স্রোত। আমরা রাস্তায়, ফুটপাতে, লনে, ঝোপঝাড়ের কাছে গিয়ে সেসব সুন্দরকে অনুভব করতে লাগলাম। তুষারকণাগুলো মুঠো করে ধরতেই মনে হলো হাতের ভেতর সাদা হাওয়াই মিঠাই ভাঙছি। গাছ থেকে মাঝে মাঝে খসে পড়ছে তুষারকণা। পরদিনই অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর আসল সাক্ষী হলাম তুষারঝড়ের। মনরোভিলে গাড়িতে যেতে যেতে পাহাড়ি সে পথে পাহাড়ের গা থেকে ঝোড়ো বাতাসে উড়তে লাগল তুষারধুলা, চারদিক তুষারকণায় ঘন কুয়াশার মতো সাদা হয়ে রইল, উড়ে যেতে লাগল তা অন্য কোনোখানে। সেখান থেকে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম আরও উত্তরে, পৌঁছে গেলাম একেবারে কানাডার সীমান্তে, নায়াগ্রা জলপ্রপাত পর্যন্ত। উত্তরে যতই যাচ্ছিলাম, শীত ততই বাড়ছিল, সেই সঙ্গে তুষারপাত। গাছের নিষ্পত্র ডালপালা ও তলার মাটি সব ধবধবে সাদা। পথের দুই পাশে যত দূর চোখ যায় কেবল সাদা আর সাদা, যেন বরফের মরুভূমি। যে কয়েকটা দিন ছিলাম সে কয়েকটা দিন দিনের তাপমাত্রা কখনো হিমাঙ্কের ওপরে ওঠেনি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাসা ও গাড়ির ভেতরে তা কখনো টের পাইনি, বাইরেও বেরিয়েছি সেরূপ পোশাক পরে।
বাংলাদেশে এসে ভেবেছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রে শীতের দিনে যেভাবে আগাগোড়া পোশাকে ঢেকে বাইরে বেরিয়েছি, সেগুলো বোধ হয় বাংলাদেশে লাগবে না। কিন্তু এসে দেখি হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা না নামলেও তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। দেশের ৪৪টি জেলায় শৈত্যপ্রবাহ চলছে। টানা ১৬ দিন শীতের দাপটে মানুষ দিশেহারা। এতে শীতকালীন রোগব্যাধি যেমন বেড়ে গেছে, তেমনি কৃষিক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ছোট দেশ হলেও এ দেশেরও বিভিন্ন অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বিভিন্ন রকম। সম্প্রতি আজকের পত্রিকার এক খবরে দেখা গেল এবার নওগাঁর বদলগাছীতে একদিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অতীতে ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৩ সালে নীলফামারীর সৈয়দপুরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ট্রেডিং ইকোনমিকসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পৃথিবীর শীতলতম দেশ ছিল গ্রিনল্যান্ড। সে দেশের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ১৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সে তালিকায় ১৯০টি দেশের মধ্যে শীতলতার মাত্রায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৪তম, এ দেশের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার মানে আমাদের দেশ আদৌ শীতের দেশ না। যুক্তরাষ্ট্র কি শীতের দেশ? এ তালিকায় সে দেশটির অবস্থান ২৮তম, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ১০ দশমিক ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ সে দেশের অনেক অঞ্চলে শীতকালে তীব্র তুষারপাত হয়, তাপমাত্রা থাকে হিমাঙ্কের নিচে। বাংলাদেশে সেরূপ অবস্থা হবে না, কিন্তু শীতের প্রকোপকে সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা আমাদের নেই। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি ও ঘরবাড়িগুলো শীতের দিনেও যেভাবে আরামদায়ক থাকে, আমাদের দেশে তা নেই। সে কারণেই শীতকাল এলে আমরা বেসামাল হয়ে যাই, বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনপদ, মানুষ, শস্যক্ষেত্র ও জীবিকা। শুধু শীতকাল কেন? কোনো ঋতুতেই আমাদের যানবাহন, আবাসস্থল ও কৃষিক্ষেত্র সুরক্ষিত এবং সু-অভিযোজিত নয়। মনে হয় ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তনে এখন আমাদের এসব বিষয় নিয়ে চিন্তার সময় এসেছে। জলবায়ু বদলাবে, তাকে ঠেকানোর সাধ্য আমাদের নেই। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষ ও গবাদিপশু যাতে খাপ খাইয়ে আরামে থাকতে এবং চলাফেরা করতে পারে, নিয়ন্ত্রিত উপায়ে জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তিতে ফসল উৎপাদিত হতে পারে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা, পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

উত্তর আমেরিকার শীতকালটা বেশ অদ্ভুত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ১০ তারিখে পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গে এসে দেখলাম, সব ঝকঝকে পরিষ্কার, রোদ ঝলমল দিন, রাস্তার কোলে সরু ফিতার মতো স্বল্প কিছু তুষার স্তূপ জড়ো হয়ে রয়েছে, ছোট ছোট সাদা সাদা তুষারের পাতলা টুকরো রয়েছে পাহাড়ের উপত্যকাজুড়ে, নিষ্পত্র বৃক্ষময় বনের ভেতর। কিন্তু পরদিন থেকেই যে শীতের দাপটটা হঠাৎ এমন বদলে যেতে পারে, তা কখনো কল্পনাও করিনি। উত্তর আমেরিকায় আবহাওয়াগত শীতকাল ধরা হয় তিন মাস—ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানে এ বছর শীতকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ ডিসেম্বর থেকে ২০ মার্চ। এ সময়ের মধ্যে শীতকালের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার পূর্বাভাস ছিল, ১২ থেকে ১৫ ডিসেম্বর উত্তর আমেরিকায় চলবে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও তুষারঝড়। প্রবল তুষারপাতে ঢেকে যাবে সব এলাকার মাঠঘাট, এমনকি কোথাও কোথাও ২ ফুট পুরু হয়ে তুষার জমবে। বাস্তবে সেসব ঘটনা যে কেমন, তা এবার প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হলো। চোখে দেখা আর অনুভব করা—দুটোই সাংঘাতিক সুন্দর। সেখানকার বাসিন্দারা জানালেন, শীতে এ ধরনের ঘটনা এখানে খুবই স্বাভাবিক, তাপমাত্রা সব সময়ই হিমাঙ্কের নিচে থাকে। তবে সেটা সাধারণত আমরা দেখি জানুয়ারি থেকে, এবার একটু আগেই শীতটা চলে এসেছে।
দুই দিন পরই দেখলাম সকালবেলাটা বেশ আলো ঝলমল রৌদ্রদীপ্ত। পিটসবার্গ শহরে ট্রেনটন অ্যাভিনিউর বাসা থেকে জম্পেশ শীতপোশাক পরে বের হলাম আমেরিকার শীতকাল ও শীতের প্রকৃতি দর্শনে। আগের সারা রাত ধরে তুষারপাত হয়েছে। বড় বড় গাছপালার ওপর প্রায় ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি পুরু হয়ে তুষার জমে আছে। বাসার সিঁড়ি থেকে শুরু করে রাস্তা, ঝোপঝাড়, বাড়ির ছাদ—সব কেমন স্নিগ্ধ শুভ্র বরফে ঢেকে আছে। যেদিকে তাকাই, সাদা আর সাদা, সকালের তাপমাত্রা দেখলাম মাইনাস ৬ ডিগ্রি সেলিসিয়াস। হাঁটার জন্য দরকার ছিল বুটজুতা, গায়ে চাপাতে হতো পাফার জ্যাকেট, মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ। সেই সঙ্গে দেহের তাপ আটকে রাখার জন্য থার্মাল পোশাক। কেডস আর মোটা মোজা, হাতে উলের দস্তানা আর গলায় মাফলার পেঁচিয়ে সব রক্ষা হলো না। তবু মন্দ লাগছে না, তুষারধুলার মধ্যে পা ডুবিয়ে থপাস থপাস করে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলেছি।
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পত্রহীন ওক, বার্চ, ইস্টার্ন হেমলক, এলম, মেপল, চেস্টনাট বৃক্ষেরা। উলঙ্গ গাছগুলো গেছে একটা লম্বা শীতঘুমে। শীতের পর সে ঘুম ভাঙবে, গাছগুলো পল্লবিত ও মুকুলিত হতে শুরু করবে। কোথাও একরত্তি সবুজ নেই, ফুল নেই, ফল নেই; তবে গাছে গাছে পাখিরা আছে। মাঝে মাঝে ঝাঁক বেঁধে পালকের তুষার ঝেড়ে উড়াল দিচ্ছে। চড়ুই আছে, কাকও আছে। এত তীব্র শীতলতা ও তুষারময়তার মধ্যেও কী করে সবুজ আছে লরেল, পাইন ও ইউগাছগুলো! তুষারের বোঝা মাথায় নিয়ে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে ঝোপগুলো, এমনকি তুষারচাপা ঘাসগুলোও সবুজ। একটা গাছে ঝুলছে অজস্র ছোট ছোট লাল টুকটুকে ফল—ক্র্যাব আপেল।
বিকেলে গেলাম মনরোভিলে। সেখানেও দেখা পেলাম ঝোপভর্তি খুদে খুদে বারবেরি ফলের, সবুজ পাতাভর্তি সাদা সিডার, ক্রিসমাস ট্রি ও পাইনগাছের। তবে পাহাড়ের উপত্যকায় থাকা কালো কালো নিষ্পত্র ডালপালার ফাঁক দিয়ে সূর্য ডোবার দৃশ্যটা ছিল অপূর্ব। দিনের শেষ আলোটুকু মেখে ছিল সাদা তুষারের গায়ে গায়ে। পরদিন সারা দিন ধরে চলল তুষারপাত, তাপমাত্রা নেমে গেল মাইনাস ১৩ ডিগ্রি সেলিসিয়াসে। ঘরের ভেতর বসে কাচের জানালা দিয়ে দেখতে থাকলাম সেই তুষারকণা পতনের দৃশ্য। হালকা তুলার মতো তুষারকণাগুলো দুপুর থেকেই ঝরছে বৃষ্টির মতো। রোদ নেই, রাস্তায় কোনো মানুষ নেই, গাড়ি নেই, আছে কেবল সাদা তুষারকণা আর তীব্র শীতলতা। পূর্বাভাস ছিল—ওদিন রাত ২টা পর্যন্ত এভাবে তুষার ঝরবে। তুষার ঝরতে ঝরতে ঘরের বাইরে কোথাও আর সাদা হতে বাকি রইল না।
রাতে যে তুষারকণার স্তূপ জোনাকির মতো জ্বলে, সে অভিজ্ঞতা এই প্রথম হলো। রাত ১০টায় বের হলাম সেই অপার্থিব সুন্দরের টানে ঘর থেকে। রাতের নৈঃশব্দ্যে চারদিক ধবধবে তুষারে ঝলমল করছে, যেন পূর্ণিমার রাত। তুষারপাতের এ সৌন্দর্য সহ্য করা কঠিন। বরফকণাগুলো যেন জমে যাওয়া পতঙ্গ, জোনাকির মতো জ্বলছে। ডালের ওপরে, পাতার ওপরে ঝরে পড়ছে জ্যোৎস্নার তরল স্রোত। আমরা রাস্তায়, ফুটপাতে, লনে, ঝোপঝাড়ের কাছে গিয়ে সেসব সুন্দরকে অনুভব করতে লাগলাম। তুষারকণাগুলো মুঠো করে ধরতেই মনে হলো হাতের ভেতর সাদা হাওয়াই মিঠাই ভাঙছি। গাছ থেকে মাঝে মাঝে খসে পড়ছে তুষারকণা। পরদিনই অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর আসল সাক্ষী হলাম তুষারঝড়ের। মনরোভিলে গাড়িতে যেতে যেতে পাহাড়ি সে পথে পাহাড়ের গা থেকে ঝোড়ো বাতাসে উড়তে লাগল তুষারধুলা, চারদিক তুষারকণায় ঘন কুয়াশার মতো সাদা হয়ে রইল, উড়ে যেতে লাগল তা অন্য কোনোখানে। সেখান থেকে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম আরও উত্তরে, পৌঁছে গেলাম একেবারে কানাডার সীমান্তে, নায়াগ্রা জলপ্রপাত পর্যন্ত। উত্তরে যতই যাচ্ছিলাম, শীত ততই বাড়ছিল, সেই সঙ্গে তুষারপাত। গাছের নিষ্পত্র ডালপালা ও তলার মাটি সব ধবধবে সাদা। পথের দুই পাশে যত দূর চোখ যায় কেবল সাদা আর সাদা, যেন বরফের মরুভূমি। যে কয়েকটা দিন ছিলাম সে কয়েকটা দিন দিনের তাপমাত্রা কখনো হিমাঙ্কের ওপরে ওঠেনি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাসা ও গাড়ির ভেতরে তা কখনো টের পাইনি, বাইরেও বেরিয়েছি সেরূপ পোশাক পরে।
বাংলাদেশে এসে ভেবেছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রে শীতের দিনে যেভাবে আগাগোড়া পোশাকে ঢেকে বাইরে বেরিয়েছি, সেগুলো বোধ হয় বাংলাদেশে লাগবে না। কিন্তু এসে দেখি হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা না নামলেও তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। দেশের ৪৪টি জেলায় শৈত্যপ্রবাহ চলছে। টানা ১৬ দিন শীতের দাপটে মানুষ দিশেহারা। এতে শীতকালীন রোগব্যাধি যেমন বেড়ে গেছে, তেমনি কৃষিক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ছোট দেশ হলেও এ দেশেরও বিভিন্ন অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বিভিন্ন রকম। সম্প্রতি আজকের পত্রিকার এক খবরে দেখা গেল এবার নওগাঁর বদলগাছীতে একদিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অতীতে ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৩ সালে নীলফামারীর সৈয়দপুরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ট্রেডিং ইকোনমিকসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পৃথিবীর শীতলতম দেশ ছিল গ্রিনল্যান্ড। সে দেশের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ১৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সে তালিকায় ১৯০টি দেশের মধ্যে শীতলতার মাত্রায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৪তম, এ দেশের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার মানে আমাদের দেশ আদৌ শীতের দেশ না। যুক্তরাষ্ট্র কি শীতের দেশ? এ তালিকায় সে দেশটির অবস্থান ২৮তম, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ১০ দশমিক ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ সে দেশের অনেক অঞ্চলে শীতকালে তীব্র তুষারপাত হয়, তাপমাত্রা থাকে হিমাঙ্কের নিচে। বাংলাদেশে সেরূপ অবস্থা হবে না, কিন্তু শীতের প্রকোপকে সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা আমাদের নেই। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি ও ঘরবাড়িগুলো শীতের দিনেও যেভাবে আরামদায়ক থাকে, আমাদের দেশে তা নেই। সে কারণেই শীতকাল এলে আমরা বেসামাল হয়ে যাই, বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনপদ, মানুষ, শস্যক্ষেত্র ও জীবিকা। শুধু শীতকাল কেন? কোনো ঋতুতেই আমাদের যানবাহন, আবাসস্থল ও কৃষিক্ষেত্র সুরক্ষিত এবং সু-অভিযোজিত নয়। মনে হয় ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তনে এখন আমাদের এসব বিষয় নিয়ে চিন্তার সময় এসেছে। জলবায়ু বদলাবে, তাকে ঠেকানোর সাধ্য আমাদের নেই। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষ ও গবাদিপশু যাতে খাপ খাইয়ে আরামে থাকতে এবং চলাফেরা করতে পারে, নিয়ন্ত্রিত উপায়ে জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তিতে ফসল উৎপাদিত হতে পারে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা, পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক। বর্তমানে তিনি ‘অলটারনেটিভস’ সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক।
১২ ঘণ্টা আগে
দেশে বর্তমানে ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু শ্রমে নিযুক্ত আছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজেই রয়েছে ১০ লাখের বেশি শিশু। এ রকম একটি তথ্য হাজির করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যেই সরকার শিশুশ্রম দূর করতে চায়।
১৩ ঘণ্টা আগে
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তরল পেট্রোলিয়াম (এলপি) গ্যাসের তীব্র সংকট দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার একটি সংকেত মাত্র। যদিও সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির ঘাটতি দীর্ঘকালের। সাধারণভাবে কখনো কম কখনো বেশি ঘাটতি নিয়েই দেশ চলেছে। এবারের মতো সংকটময় পরিস্থিতির উদ্ভব কালেভদ্রেই হয়ে থাকে।
২ দিন আগে
যখন উন্নত বিশ্বের সুযোগগুলো আমাদের হাতছানি দেয়, তখন পরিচিতির প্রতীক, আমাদের সবুজ পাসপোর্টটি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য ‘ভিসা বন্ড’ বা অতিরিক্ত জামানত আরোপের খবর সেই স্বপ্ন এবং বাস্তবতার মধ্যে এক নতুন কাঁটাতারের সৃষ্টি করেছে।
২ দিন আগে