Ajker Patrika

মধ্যপ্রাচ্যে কি কোনো দিন শান্তি আসবে

রাজিউল হাসান
মধ্যপ্রাচ্যে কি কোনো দিন শান্তি আসবে
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের, সেখানকার সংকটের বয়সও হাজার বছর। ছবি: সংগৃহীত

ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইচ্ছেমতো ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ইসরায়েল এখন কিছুটা ‘বিশ্রাম’ নিচ্ছে।

ইরানে অধিকারের দাবিতে কিছুদিন বিক্ষোভ হলেও কর্তৃপক্ষের দমনপীড়নের সামনে তা টিকতে পারেনি। এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত কিছু একটা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খুব সম্ভবত ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা শাহ পাহলভির সঙ্গে দর-কষাকষি জমেনি। ফলে ট্রাম্প হুমকিতেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন। তাতে অবশ্য আলোচনার পথ খুলেছে। সেখান থেকে ‘শুভসংবাদ’ও এসেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোয়ও কিছুদিন আগে টানটান উত্তেজনা ছিল। সব সময় মনে হতো, এই বুঝি কিছু একটা হয়ে গেল। কিন্তু সেই টানটান উত্তেজনাও এখন নেই। আপাতত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পবিত্র রমজান মাসের আয়োজন। সেসব খবরে এই অঞ্চলের ধনীদের জীবন কতটা জৌলুশে ভরা, আর দরিদ্ররা কতটা দরিদ্র, তা ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। এর বাইরে যে রাজনীতির খবর নেই, তা নয়। তবে সেগুলো আপাতত গুরুত্বহীন।

দেখেশুনে মনে হতে পারে, মধ্যপ্রাচ্য বুঝি শান্ত হয়ে আসছে। ‘দুষ্ট’ হামাসকে শায়েস্তা করে ইসরায়েল ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘গাজা শান্তি কমিটি’ গঠনের সুযোগ করে দিয়েছে। ইরানও ট্রাম্পের হুমকিতে গুটিয়ে আলোচনার টেবিলে এসেছে। সৌদি আরব বহু আগে থেকেই আঞ্চলিক রাজনীতির সম্মুখসারিতে সেভাবে সক্রিয় নেই। তাই বলে যে একেবারেই সক্রিয় নেই, তা-ও নয়। সৌদি আরব কেবল নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই এখন অগ্রসর হচ্ছে। কারণ, সে জানে ইরান অদূর ভবিষ্যতে আর তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারবে না। গত বছর ট্রাম্পের বোমায় তেহরানের পারমাণবিক শক্তি অনেকটাই কমে গেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত বেশ কয়েক বছর ধরে নিজেকে শান্তির ঝান্ডাধারী প্রমাণে সব শান্তিপ্রচেষ্টায় স্বউদ্যোগে এগিয়ে যায়। এই দেশের আমিরাতগুলোর একটি দুবাইতে ব্যবসায় এতটাই অগ্রসর হয়েছে যে কিছুদিন আগে বেসরকারি উদ্যোগে সেখানে সোনা দিয়ে সড়ক বানানোর ঘোষণা এসেছে। কুয়েত, ওমান, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বাকি ধনী দেশগুলো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এই দেশগুলো এতটাই ব্যস্ত যে ফিলিস্তিনে ‘কারবালা’ হয়ে গেলেও তাদের সে অর্থে কিছু যায়-আসে না। লেবানন, লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়াসহ কয়েকটি দেশে এখনো অশান্তি রয়েছে। তবে সেসবও এখন আর সেভাবে গুরুত্ব দেওয়ার মতো না। কাজেই আপাতদৃশ্যে মধ্যপ্রাচ্য এখন আগের তুলনায় অনেক শান্ত। কিন্তু আসলেই কি তাই?

এবার আসা যাক উল্টো চিত্রের বিশ্লেষণে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজের শক্তি জানান দিতে সামরিক মহড়ার আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি খবর বেরিয়েছে, ইরানে সপ্তাহজুড়ে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন বাহিনী। এই প্রস্তুতির মধ্যেই দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ নিয়ে অবশ্য ইসরায়েলের ‘মাথাব্যথা’ নেই। কিন্তু মাথাব্যথা হওয়ার কথা। এই মাথাব্যথা না হওয়াটাই একধরনের সংশয় জাগায়। কারণ, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো হলে (যদিও তা কোনো দিন হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না) সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে ইসরায়েলই। সেই ধাক্কা হবে বহুমাত্রিক, অনুভূত ঝাঁকুনি পরিমাপে রিখটার স্কেলও কম পড়ে যাবে।

এদিকে সৌদি আরব আপাতত ইয়েমেনে তাদের নেতৃত্বে বহুজাতিক বাহিনীর অভিযান ছাড়া অন্য কোনো দিকে মনোযোগী বলে মনে হচ্ছে না। তবে এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়তে পারে (আবারও বলছি, তা অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব বলে মনে হয় না), তাহলে ইসরায়েল ছাড়া আরেকটি যে দেশ উদ্বিগ্ন

হবে, তার নাম সৌদি আরব। কারণ, তখন তারাও মার্কিন সান্নিধ্য, নৈকট্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেম হলো এমন প্রেম, যা সবাই চায়। রপ্তানিতে সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধরতে চায়, বিশ্বের দারিদ্র্যপীড়িত, সংঘাতকবলিত, সমস্যা জর্জরিত সব দেশের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে চায়, অনেক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে সে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ভাগ্য গড়বে, ভূরাজনীতিতে আঞ্চলিকভাবে প্রভাব বিস্তারেও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন সবার আগে কাম্য সব দেশের। কাজেই সৌদি আরব কিংবা ইসরায়েল কেন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কোন্নয়ন মেনে নেবে?

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে জঙ্গিবাদ স্তিমিত হলেও এখনো থেমে যায়নি। ইয়েমেন, সিরিয়া, লেবাননসহ বিভিন্ন দেশে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এখনো সক্রিয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে ইরানকে ঘিরে এত আলোচনা, সেই ইরানও তো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়নি। বরং তারা এখনো বলে যাচ্ছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করবে না। ইরান কোনো দিন স্বীকারই করেনি যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। কাজেই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি আলোচনার টেবিলে ওঠা কঠিন।

আসলে মধ্যপ্রাচ্যে আমরা যে সংকট দেখতে পাই, তা এক দিন কিংবা দুই দিনের নয়। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস যেমন হাজার বছরের, সেখানকার সংকটের বয়সও হাজার বছরের। ফলে আমরা, সারা দুনিয়ার মানুষেরা যে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির অপেক্ষায় অধীর হয়ে বসে আছি, সেই অপেক্ষার বয়সও হাজার হাজার বছর। এই অপেক্ষা কবে ফুরাবে, কত প্রজন্ম পর ফুরাবে কিংবা কত হাজার বছর পর ফুরাবে, তারও কোনো আভাস নেই।

মধ্যপ্রাচ্যকে আমরা আসলে সংকটের গর্ভধারিণী বলতে পারি। কারণ, সেখানে আজ এই সংকটের উদ্ভব হচ্ছে, তো কাল অন্য কোনো সংকট মাথাচাড়া দিচ্ছে। বিশ্ব মোড়লেরা মাঝেমধ্যেই নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে, প্রভাব বাড়াতে কিংবা প্রতিপক্ষকে জব্দ করতে মধ্যপ্রাচ্যে সমস্যা তৈরি করে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও প্রতিবেশীর সঙ্গে মিলেমিশে থাকার পক্ষপাতী না। তারাও কোনো না কোনোভাবে বিবাদে জড়াতে ভালোবাসে। এ কথা যেমন হাজার বছর আগে পারস্য সম্রাটদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, তা হাল আমলের ইরানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফলে মধ্যপ্রাচ্য কোনো দিন শান্ত হওয়ার নয়।

একটা কথা মাথায় রাখতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য হলো অনাদি-অনন্তকাল ধরে সারা বিশ্বের আকর্ষণ। বিশ্বজুড়ে সাগর-মহাসাগরে পানির স্রোত ঠিক রাখতে বাতাসের যেমন ভূমিকা, বৈশ্বিক রাজনীতিতে টানটান উত্তেজনা ধরে রাখতে মধ্যপ্রাচ্যও একই ভূমিকা পালন করে। কাজেই এমন একটি জ্বলন্ত উনুনকে শান্ত করতে হলে, সেখানে নিরপরাধ মানুষগুলোর প্রাণ রক্ষা করতে হলে সারা বিশ্বকেই উদার নীতি গ্রহণ করতে হবে। নিজের স্বার্থ মাথায় রেখে কেউ যদি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনতে চায়, তাহলে বুঝতে হবে যে সেখানে নতুন করে আরেকটি সংকট সৃষ্টির প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত