Ajker Patrika

মব সংঘটিত হওয়ার নানা পরিপ্রেক্ষিত

আব্দুর রহমান 
মব সংঘটিত হওয়ার নানা পরিপ্রেক্ষিত
প্রতীকী ছবি

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ তো বটেই, সারা বিশ্বেই ‘মব’ আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার এই প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভিড়ের মানসিকতা, ডিজিটাল লিটারেসির অভাব, নৈতিক দুর্বলতা এবং আরও অপরাপর বিষয়গুলো যুক্ত হয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তথাকথিত ‘মব জাস্টিস’ বা ‘ভিজিল্যান্ট ভায়োলেন্স’ও খুবই সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাইকোলজি অব ক্রাউডস বা মবের মানসিকতা তথা মবের মন বুঝতে বিষয়টিকে কেবল ‘ভিড়ের হঠাৎ উত্তেজনা’ হিসেবে না দেখে, ক্ষমতা, আবেগ, গুজব, পরিচয়ের রাজনীতি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের সমন্বয় হিসেবে দেখা উচিত। সাধারণত ক্ষমতা, গুজব, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য মিলিয়েই ‘মব’ ভায়োলেন্ট বা সহিংস হয়ে ওঠে।

ফরাসি সমাজ ও মনোবিজ্ঞানী গুস্তভ লে বঁ ক্রাউড সাইকোলজি বা মবের মনস্তত্ত্ব প্রসঙ্গে মনে করেন, জনতার ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তির বিচারক্ষমতা কমে, আবেগ বাড়ে এবং রিগ্রেশন বা মানসিক পশ্চাদপসরণ ঘটে। ফলে, ব্যক্তি তখন ভিড়ের অংশ হিসেবে যেকোনো ধরনের অপরাধে যুক্ত হয়ে যেতে পারে। জনতার মধ্যে পড়লে ব্যক্তি নিজের স্বতন্ত্র বিচারক্ষমতা হারাতে শুরু করে। লে বঁ মনে করেন, ভিড়ের আবেগ, আবেগের সংক্রমণ এবং ‘আমি আলাদা/একা নই’—এই অনুভূতি ব্যক্তিকে বেশি উত্তেজিত, কম সংযত করে তোলে। ফলে মব আচরণকে তিনি দেখেন এমন এক অবস্থায়, যেখানে ব্যক্তি আর একক সত্তা নয়, বরং ‘ক্রাউড/কালেক্টিভ মাইন্ড বা গোষ্ঠীমন’-এর অংশ হিসেবে।

লে বঁ’র ধারণায় মবকে প্রায়ই অযৌক্তিক, সহজপ্রভাবিত ও দায়িত্বহীন হিসেবে দেখা হয়। তবে এই ব্যাখ্যা আংশিক। আধুনিক বিশ্লেষণ বলে—মব কেবল ‘হঠাৎ উন্মাদনা’ নয় বরং অনেক সময় এটি পরিকল্পিত, সংগঠিত বা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত আচরণও হতে পারে। তাই মব বোঝার জন্য যেকোনো একটি দেশের সামাজিক কাঠামো ও ক্ষমতার সম্পর্ক উপেক্ষা করা যায় না। বরং বাংলাদেশ, ভারত এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেই মবকে ক্ষমতা ও রাজনীতির উদ্দেশ্য হাসিলে ব্যবহার করার নজির আছে।

যেমন ২০১৫ সালে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে মোহাম্মদ আখলাক নামে এক ব্যক্তিকে গো-মাংস খাওয়ার গুজবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই রাজ্যের বুলন্দ শহরে গো-হত্যার অভিযোগ তুলে একদল উন্মত্ত জনতা পুলিশচৌকিতে হামলা চালিয়ে ইন্সপেক্টর সুবোধ কুমার সিংকে গুলি করে ও পিটিয়ে হত্যা করে। এই ঘটনার মূল অভিযুক্তদের মধ্যে বজরং দল এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিজেপির স্থানীয় নেতাদের নাম আসে। পরে অভিযুক্তরা জামিন পেলে তাঁদের মালা পরিয়ে বরণের ঘটনা রাজনৈতিক ইন্ধনের দিকেই ইঙ্গিত দেয়।

মবের ভেতরে সাধারণত কয়েকটি মানসিক উপাদান কাজ করে। যেমন ব্যক্তি একা থাকলে যা করবে না, ভিড়ের মধ্যে তা করতে পারে—এমন মানসিকতা মবের অন্যতম কারণ। ব্যক্তির দায়িত্ববোধের ক্ষয়ের কারণে ‘সবাই করছে, তাই আমিও’—অনুভূতি ব্যক্তিগত জবাবদিহি কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে নৈতিক ক্ষোভের যেখানে কোনো কিছুকে ‘অন্যায়’ বা ‘অপমানজনক’ আখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্টদের শাস্তি দেওয়ার নৈতিক বৈধতা উৎপাদন করা হয় এবং মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য অনুসারে, একজনের উত্তেজনা দ্রুত অন্যদের ছড়িয়ে পড়ার কারণে মব সৃষ্টি হতে পারে।

মবকে অনেক সময় ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও এটি শুধু মানুষের আবেগে বিস্ফোরণ নয়, বরং ‘আমরা সংখ্যায় বেশি, তাই আইন অগ্রাহ্য করতে পারি’—স্বেচ্ছায় এই বার্তা দেওয়ার এক উপায়। মবের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি রাজনৈতিক কৌশলে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশ এবং ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বরং এটাই একটা সাধারণ প্রবণতা। মব নাম নিয়ে অপরাধ সংঘটনের পর কোনো গোষ্ঠী যখন বারবার শাস্তি এড়াতে পারে, তখন মবই ধীরে ধীরে একটি ‘মডেল’ বা ‘স্ক্রিপ্ট’ হয়ে দাঁড়ায়, যা অন্যরাও অনুকরণ করতে পারে এবং করে।

এই জায়গায় মব জাস্টিস আর ভিজিল্যান্ট ভায়োলেন্স গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে ‘নিজেরাই বিচার’ করার মানসিকতা জনতার ক্ষোভকে নৈতিক বৈধতা দিতে চায়। কিন্তু বাস্তবে তা দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের ওপর সহিংসতা বাড়ায়।

এই মব উসকে দেওয়ার পেছনে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা ব্যাপক। তথ্যপ্রবাহের গতি, আবেগের সংক্রমণ এবং সমষ্টিগত প্রতিক্রিয়াকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত করে তোলার সক্ষমতায় থাকায় ডিজিটাল দুনিয়া মবকে উসকে দিতে পারে খুব দ্রুত। সোশ্যাল মিডিয়া ফিড, অ্যালগরিদম, ইকো-চেম্বার এবং কনফার্মেশন বায়াস মিলিয়ে মানুষের কাছে একই ধরনের ক্ষোভ বা ভয় বারবার পৌঁছে যায়, ফলে মব দ্রুত জমে ওঠে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সাধারণত বেশি রাগ, ভয় বা বিস্ময় জাগানো কনটেন্টকে বেশি দেখায়। কারণ, এসব পোস্টে রিয়্যাক্ট-কমেন্ট ও শেয়ার বেশি হয়। এতে উত্তেজক কনটেন্ট স্বাভাবিক তথ্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায় এবং জনরোষের আশঙ্কা বাড়ে। ‘এনগেজমেন্ট অ্যাম্পলিফিকেশন’-এর কারণে, এই ধরনের কনটেন্টে যেহেতু প্রতিক্রিয়া বেশি, তাই সেটি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে একটি ছোট অভিযোগ বা গুজবও কিছুক্ষণের মধ্যে বৃহৎ জনরোষে পরিণত হতে পারে।

আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে রাজনৈতিক মব সহিংসতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিল দাঙ্গা। সেদিন ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল বাতিলের দাবিতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপুলসংখ্যক সমর্থক ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল ভবনে হামলা চালায়। এতে পাঁচজন নিহত এবং ১৭৪ পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। এই দাঙ্গার পেছনে সোশ্যাল মিডিয়াই মূল ভূমিকা রাখে। সেই নির্বাচনে কারচুপির ভিত্তিহীন দাবি তুলে ফেসবুকে ‘স্টপ দ্য স্টিল’ নামক প্রচারণার মাধ্যমে মব উসকে দেওয়া হয়। মার্কিন কংগ্রেসে হাউস সিলেক্ট কমিটির প্রতিবেদন বলছে, ফেসবুক-টুইটারের (বর্তমানে এক্স) অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিভাজন বাড়িয়ে তুলেছিল, আর পারলার ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল ক্যাপিটল ভবনে সশরীরে হামলার পরিকল্পনা ও রণকৌশল সাজাতে।

যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেই সোশ্যাল মিডিয়া/প্ল্যাটফর্ম বা ডিজিটাল দুনিয়ার সহায়তা নিয়ে মব উসকে রাজনৈতিক ও ক্ষমতার ফায়দা হাসিলের হাজারো প্রমাণ পাওয়া যাবে। মবের মন কোনো ইতিবাচক বিষয় নয়। কোনো একটি নির্দিষ্ট সমাজের বেশির ভাগ মানুষই যদি সাদামাটাও হয়, কিন্তু তাদের যদি স্পষ্ট নৈতিক দায়িত্ববোধ না থাকে, ডিজিটাল লিটারেসি না থাকে তাহলে হানা আরেন্টের ‘ব্যানালিটি অব ইভিল’ ধারণা অনুসারে—ভয়াবহ সহিংসতা অনেক সময় কোনো দানবীয় উন্মাদনা থেকে নয় বরং চিন্তাহীনতা, অনুসরণ প্রবণতা এবং নৈতিক প্রশ্ন না তোলার অভ্যাস থেকে জন্ম নিতে পারে।

এটার একটা উদাহরণ হতে পারে ২০২৪ সালে গ্রিসে আলমানি নিয়ামু হত্যাকাণ্ড। এথেন্সের কাছে একদল উগ্র জনতা পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আলমানি নিয়ামু নামের এক ব্যক্তিকে ঘিরে ফেলে। তাঁকে চোর সন্দেহে এবং জাতিগত বিদ্বেষ থেকে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে।

যাই হোক, উন্নত, উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত সব দেশেই এমন উদাহরণ পাওয়া যাবে। এখন এই বিষয়টি ঠেকানোর একমাত্র উপায় প্রযুক্তিগত, আইনি ও সামাজিক সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ। এ লক্ষ্যে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম সংশোধন করে উসকানিমূলক বা বিভাজনমূলক কনটেন্টের রিচ কমিয়ে দিতে হবে এবং ‘ইকোচেম্বার’ ভাঙতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্থানীয় ভাষায় দক্ষ ফ্যাক্টচেকারদের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম কনটেন্ট মডারেশন নিশ্চিত করে গুজব ছড়ানো বন্ধ করতে হবে। ব্যবহারকারীদের মধ্যে ডিজিটাল লিটারেসি বা সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে যেন তারা যেকোনো সংবেদনশীল তথ্য যাচাই না করে বিশ্বাস না করে। আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যেন সহিংসতায় উসকানি দেওয়া ব্যক্তি এবং তা সরাতে ব্যর্থ হওয়া সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি উভয়কেই বিচারের আওতায় আনা যায়।

লেখক: সাংবাদিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এক দশক পর নির্মাণে ফিরছেন ওয়াহিদ আনাম

ফের ইরানে হামলা হলে পরিণতি হবে ভয়াবহ: ট্রাম্পকে পুতিনের হুঁশিয়ারি

তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচন: থালাপতি বিজয়ের দলের চমকের পূর্বাভাস

ইরান এমন অস্ত্র বের করবে, যা দেখে ‘শত্রু হার্ট অ্যাটাক’ করতে পারে

ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যেন না শোধরায়: আসামের মুখ্যমন্ত্রী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত