Ajker Patrika

বাজেটে সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধি ও বাস্তবতা

গালিবা আনতারা সোয়ারা
বাজেটে সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধি ও বাস্তবতা
চিকিৎসাবিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ছবি: পেক্সেলস

২০২৬ সালের ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। তাতে মোট আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেট। এই বিপুল অঙ্কের বাজেট নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা, সমালোচনা, বিশ্লেষণ। সাধারণ মানুষের কৌতূহল—এই বাজেট কি সত্যিই বদলে দেবে তাদের জীবন, নাকি আগের মতোই থেকে যাবে কাগজে-কলমে উন্নয়নের গল্প?

এই বছরের বাজেটে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে—সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধি। প্রথমে মনে হতে পারে, এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত; কিন্তু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনস্বাস্থ্য, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়ার প্রচেষ্টা। চায়ের দোকানে বসে গল্প আর আড্ডায়, অফিসের ব্যস্ত কাজের ফাঁকে কিংবা ক্লান্ত দিনের শেষে অনেকের হাতেই দেখা যায় একটি সিগারেট; যেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি সিগারেট কয়েক সেকেন্ডের ধোঁয়া; কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ড কি সত্যিই ‘সাধারণ’? নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে এমন কিছু, যা মানুষকে নির্ভরশীল করে তোলে? বৈজ্ঞানিক ভাষায় ধূমপান হলো তামাকজাত দ্রব্য সেবন। তবে ব্যবহারকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে ধূমপানকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় যে ধূমপান মানে আসক্তি, ভালো লাগার এক অনুভূতির নাম, যা মানুষকে স্বল্প সময়ের জন্য সুখ অনুভব করায়, শান্তি দেয় এবং জীবনকে পরিপূর্ণ মনে করায়। সিগারেট একধরনের আসক্তি ও নেশা। সিগারেটে থাকে নিকোটিন নামক এক অদ্ভুত বিষ, যা তরল অবস্থায় গ্রহণ করলে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এই নিকোটিন কি শুধু একটি রাসায়নিক, নাকি অভ্যাস তৈরির এক মেশিন?

ধূমপান আমাদের জন্য ক্ষতিকর, এটি বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞান বহু আগেই তা প্রমাণ করেছে। ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি রোগসহ অসংখ্য জটিল অসুস্থতার অন্যতম কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর বিশ্বে ৮০ লাখের বেশি মানুষ তামাকজনিত কারণে মারা যায়। এর মধ্যে কিছু মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। এই বাস্তবতায় বিভিন্ন দেশ তামাক নিয়ন্ত্রণে কর ও মূল্যবৃদ্ধির নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশও সেই পথেই হাঁটছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য ৬০ থেকে বেড়ে ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের ৮০ থেকে ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরের ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরের ১৮৫ থেকে ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। নিম্নস্তরের কিছু জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে প্রতি শলাকার দাম কাগজে-কলমে ২০ পয়সা বাড়লেও দেশে খুচরা পয়সার প্রচলন না থাকায় বাস্তবে দাম বাড়তে পারে প্রায় ১ টাকা। ফলে এসব সিগারেটের একেকটির দাম দাঁড়াতে পারে ৭ টাকা। মধ্যম স্তরের দুটি ব্র্যান্ডের কিছু সংস্করণের ক্ষেত্রে প্রতি শলাকার মূল্য প্রায় ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ার কথা থাকলেও বাজারে তা ১০ টাকায় পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে উচ্চ স্তরের সিগারেটের প্রতি শলাকার মূল্য বেড়ে ১৬ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে অতি উচ্চ স্তরের ব্র্যান্ডগুলোর ওপর; যা ১০ শলাকার প্যাকেটের মূল্য ১৮৫ থেকে ২১০ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রতি শলাকার দাম বেড়ে দাঁড়াবে ২১ টাকা।

অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে তামাকপণ্যের ওপর কর বৃদ্ধির ফলে ধূমপায়ীর হার কমেছে এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে। তেমনি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সরকার ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করছে। তবে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। সরকার বলছে, দাম বাড়লে কমবে ধূমপান। কিন্তু যারা অনেক দিন ধরে আসক্ত হয়ে গেছে, তারা কি সত্যিই শুধু দাম দেখে থামবে? ফলে শুধু দাম বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি দরকার তামাকবিরোধী শিক্ষা, গণসচেতনতা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ। আইন শুধু সংবিধানের পাতায় কিংবা লিফলেট-পোস্টারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতি শলাকায় ১ থেকে ৩ টাকা বেশি। প্রতিদিন মাত্র ২০ টাকা অতিরিক্ত খরচ মানে মাসে ৬০০ টাকা, বছরে ৭ হাজার টাকা বেশি গুনতে হবে। একজন ধূমপায়ী বছরে সিগারেটের পেছনে যে অর্থ ব্যয় করেন, তা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি কিংবা সঞ্চয়ের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে ধূমপান শুধু স্বাস্থ্যের জন্য নয়, পরিবারের জন্যও ক্ষতিকর। আজ যুবসমাজ অধঃপতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এক ধোঁয়ার নেশায় আটকে যাচ্ছে তাদের মহামূল্যবান জীবন। যে জীবনে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল বিভিন্ন গবেষণা, উদ্ভাবন কিংবা দেশসেবার কাজে, তারা আজ কয়েক সেকেন্ডের ধোঁয়ার নেশায় মগ্ন। তারা জানে ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, মৃত্যুর কারণ হতে পারে; তবু থামছে না, কারণ তারা স্বল্পমেয়াদি আনন্দে বিশ্বাসী।

আসুন, ধূমপান পরিহার করি। স্বল্পমেয়াদি আনন্দের কথা বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আনন্দের কথা ভাবি। অন্যদের পরোক্ষ ধূমপান থেকে বাঁচার সুযোগ করে দিই। একটি অভ্যাস বদলে দিতে পারে একটি প্রজন্ম, বদলে দিতে পারে একটি জীবন। নিজেকে প্রশ্ন করুন—ধোঁয়াটা কি আমরা ব্যবহার করি, নাকি ধোঁয়াটাই আমাদের ব্যবহার করে?

লেখক: শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত