Ajker Patrika

অমানবিক বিশ্বরাজনীতি

আরাফাত নাফিজ
আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮: ৩৮
অমানবিক বিশ্বরাজনীতি

একসময় যে মানুষ গুহার অন্ধকারে বাস করত, আজকের দিনে গরম থেকে বাঁচতে তার ঘরে চাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র। সভ্যতার সংজ্ঞায় হয়তো বহু দূর এগিয়েছি আমরা। কিন্তু সত্যিই কি তাই? একটু ভেবে দেখুন তো, আজকের বিশ্ব কি সত্যিই এগিয়ে যাচ্ছে? প্রশ্নের উত্তরটা পেতে আপনাকে খুব বেশি কিছু করতে হবে না। শুধু পত্রিকার পাতা উলটিয়ে আন্তর্জাতিক পাতাটায় চোখ বোলালেই হবে। সম্ভবত এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আপনি একটা লাশের সংখ্যা সেখানে খুঁজে পাবেন না। সভ্যতার মানদণ্ড যদি শুধু বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে হয়তো লাশের সংখ্যা কিংবা আহতের খবর আপনার জন্য বিশেষ কিছু নয়। একটু মানবিক দৃষ্টি দিয়ে পত্রিকার পাতাগুলোতে তাকালে আপনার ভালো মনও খারাপ হতে বাধ্য। সত্যিই তো, আমরা যে আমেরিকাকে চিনি বিশ্ব সভ্যতার শীর্ষ রাষ্ট্র হিসেবে, যার নিত্যনতুন প্রযুক্তি আমাদের প্রতিনিয়ত বিস্মিত করে তোলে, সেই আমেরিকাই তো একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে লাখে লাখে তাজা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে বেশ কয়েকটি দেশের ধ্বংসের স্মৃতি এখনো আমাদের মস্তিষ্কে তাজা।

বিশ্বরাজনীতি সব সময় স্বার্থের রাজনীতি। এ কথা মিথ্যা নয়, কিংবা পুরোপুরি ভুল অথবা খারাপ, তা-ও নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, যতই আমরা আধুনিক থেকে অত্যাধুনিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছি, তত বেশিই যেন স্বার্থ বেড়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাড়ছে সংঘাত। সুদূর আমেরিকা থেকে শুরু করে মরুর রাষ্ট্র আরব দেশ কিংবা আমাদের এশিয়া—সবখানেই বেড়ে যাচ্ছে স্বার্থ কিংবা অতি লোভ। আর তাতেই বাড়ছে সংঘাত।

একদিকে যেমন সংঘাত বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে সংঘাতে জয়ী হতে কিংবা নিজেদের আধিপত্য বাড়াতে ক্রমেই বাড়ছে যুদ্ধাস্ত্রের ঝনঝনানি। প্রতিবছর প্রায় প্রতিটি দেশ তাদের সমরাস্ত্র ব্যয় বাড়িয়ে যাচ্ছে। এক পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫—২০২৪ অর্থাৎ ১০ বছরের সামরিক খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ।

সাধারণ দৃষ্টিতে অথবা পরিসংখ্যানের পাতায় যেখানেই নজর যাবে, সেখানেই এটা স্পষ্ট যে মারণাস্ত্র তৈরি ও প্রয়োগ—দুটোই বাড়ছে। আর ঝরে যাচ্ছে তাজা তাজা প্রাণ। মানবতার বুলি আওড়ানো লোকই নিজ দেশের স্বার্থের বেলায় যেন ভুলে যায়, যাদের ওপর তারা নিপীড়ন চালাচ্ছে, তাদেরও মানবাধিকার আছে। মানবাধিকারের কথা না হয় বাদই গেল, ন্যূনতম বাঁচার অধিকার আছে এসব মানুষের। বছরের পর বছর গাজায় মানবাধিকারের চরম বিপর্যয় দেখেছে বিশ্বের মানুষ। অথচ বিশ্ব পরাশক্তি যেন একেবারে চুপ। বিভিন্ন সময় নানা জায়গায় সমালোচনা চললেও নিজের স্বার্থের ক্ষেত্রে নিপীড়কেরা একেবারেই চুপ। তাদের এই নিশ্চুপ থাকার ফল বয়ে বেড়াচ্ছে অসহায় লাখো মানুষ। ব্যাপারটা এখন এমন একটা পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষায় যেকোনো কাজ যেন বৈধতা পেয়ে গেছে, হোক তা মানবিক অথবা চরম অমানবিক। একেকটা রাষ্ট্র যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে, কে কত সহজে মানুষ হত্যা করতে পারে, আর নিজেদের স্বার্থ কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু নির্মম হলেও চরম সত্য এটাই যে এই ব্যবস্থা বেশি দিন চলতে থাকলে মানব ইতিহাস পৃথিবীর বুকে বেশি দিন টিকে থাকবে না।

হতাশার কালো মেঘের মধ্যেও সামান্য আলো হয়ে এখনো আছে কিছু জিনিস। যেমন মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। রাজনীতিবিদেরা স্বার্থের খেলায় মেতে থাকলেও কিছু মানুষ তাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে। আমাদেরও সব ধরনের অমানবিকতার বিরুদ্ধে আওয়াজ জারি রাখা জরুরি। যাতে যে কেউ ইচ্ছেমতো হুমকির কারণ হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারে। তবে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বজায় থাকুক। সেই প্রতিযোগিতা লাশের সংখ্যা বাড়িয়ে নিজের স্বার্থের নয়, হোক তা মানবজাতির স্বার্থে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত