Ajker Patrika

জাতীয় সংসদ: সংসদীয় কমিটি গঠনে বিলম্ব

  • ৫০টির মধ্যে এ পর্যন্ত ১৫টি কমিটি গঠিত হয়েছে
  • সংসদের তিন অধিবেশনের মধ্যে কমিটি করতে হয়
  • সরকার বলছে, শিগগির সব কমিটি গঠন করা হবে
  • সভাপতির পদ না পাওয়ার অভিযোগ বিরোধীদের
তানিম আহমেদ, ঢাকা 
জাতীয় সংসদ: সংসদীয় কমিটি গঠনে বিলম্ব
ফাইল ছবি

নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর ছয় মাস পেরিয়ে গেল। এর মধ্যে জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসেছে দুইবার। মন্ত্রিসভার রদবদলও হয়ে গেল একবার। কিন্তু সংসদীয় কমিটিগুলো গঠনের গতি খুবই ধীর। ৫০টি কমিটির মধ্যে ছয় মাসে গঠিত হয়েছে মাত্র ১৫টি।

মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকি ও জবাবদিহির আওতায় রাখতে কাজ করে সংসদীয় কমিটিগুলো। তাই কমিটি গঠনে দেরি হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের কাজে জবাবদিহির জায়গায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যদিও বিধান অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম তিন অধিবেশনের মধ্যে কমিটিগুলো গঠনের সুযোগ আছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান গতকাল শনিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, সংসদীয় কমিটি গঠনে দেরি হওয়ার অর্থ হচ্ছে সরকারি কর্মকাণ্ড তদারকিতে একধরনের বিলম্ব ঘটছে।

তবে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সব কমিটি শিগগির গঠিত হবে।

জাতীয় সংসদের সংসদীয় কমিটি রয়েছে ৫০টি। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি আছে ৩৯টি এবং বিষয়ভিত্তিক কমিটি ১১টি। এখনো পর্যন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে ১৫টি। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত ৯টি এবং বিষয়ভিত্তিক কমিটি ৬টি।

মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সংসদীয় কমিটির প্রধান দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যালোচনা, অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করা। বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়া বা সুপারিশ করাও সংসদীয় কমিটির কাজ। নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহি করতে কমিটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পরে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে সংসদে ক্ষমতাসীনদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। তাই ওই দুই মেয়াদে সরকারি ও বিরোধী দলের মতবিরোধের কারণে সংসদীয় কমিটি গঠন করতে দেরি হয়।

২০০১ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর অষ্টম জাতীয় সংসদেও সংসদীয় কমিটি গঠন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছিল। সে সময় সব সংসদীয় কমিটি গঠনের জন্য কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা ছিল না। একাধিক সূত্রের দাবি, তৎকালীন বিরোধী দল বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কমিটির জন্য সদস্যদের নাম দিতে বিলম্ব হওয়ায় কমিটি গঠন প্রক্রিয়াও দীর্ঘায়িত হয়েছিল। পরে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নতুন সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যে সংসদীয় কমিটিগুলো গঠনের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়।

এর পর থেকে অর্থাৎ ২০০৯ সালের নবম জাতীয় সংসদ থেকে সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দল ও জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। ফলে ২০০৯ সাল থেকে সংসদীয় কমিটিগুলো প্রথম বা দ্বিতীয় অধিবেশনেই করা হয়েছিল। কিন্তু এবারই তা তৃতীয় অধিবেশনে গড়াচ্ছে। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে সংসদের আগামী অধিবেশনেই কমিটিগুলো গঠন করতে হবে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের মধ্যে সংসদীয় কমিটিগুলো হলে ভালো হতো। তাহলে সরকারের কর্মকাণ্ডগুলো তদারকি ও বিচার-বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতো। মন্ত্রণালয়ের কাজে জবাবদিহি আনা কমিটিগুলোর দায়িত্ব। কমিটি গঠন না হওয়ায় সেটা সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে না।

এ ছাড়া কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, প্রতি মাসে প্রতিটি সংসদীয় কমিটির ন্যূনতম একটি করে বৈঠক হতে হয়। কিন্তু সেটিও ঠিকমতো হয় না। গত ১০ জুন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গঠন হলেও এখনো পর্যন্ত একটিও বৈঠক হয়নি। এরই মধ্যে এ কমিটির সভাপতি আবদুল মঈন খান গত শনিবার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

গত জুলাই মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ও সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন হয়। জানা গেছে, আজ রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদীয় কমিটির কাজ হচ্ছে মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা। গ্রহণ করা বা না করা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। তবে অনেক দেশে কমিটির সুপারিশের জবাব বৈঠক ছাড়াও সংসদে দিয়ে থাকে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে সংসদীয় কমিটির সুপারিশ সরাসরি বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও জবাবদিহির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করলে মন্ত্রণালয় কেন তা করেনি, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে—এটাই জবাবদিহির মূল কথা। অনেক দেশে কমিটির প্রতিবেদনের ওপর সরকারকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাব দিতে হয়। যুক্তরাজ্যে তিন মাস এবং অস্ট্রেলিয়ায় দুই মাসের মধ্যে জবাব দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতে ‘অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট’-এর ব্যবস্থা আছে। সেখানে প্রতি ছয় মাস পর প্রতিবেদন দিতে হয়। পাকিস্তানেও তেমনটা আছে। বাংলাদেশে এই ধরনের সুস্পষ্ট সময়সীমা ও বাধ্যবাধকতার অভাব বড় ঘাটতি।

সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের দুই দিকেই সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর সময়সীমা বা বাধ্যবাধকতা নেই। দ্বিতীয়ত, কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার পর সরকারেরও জবাব দেওয়ার স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই। এতে সংসদীয় জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ অংশটি দুর্বল থেকে যায়। এই ঘাটতি জরুরি ভিত্তিতে দূর করা দরকার।

সভাপতির পদ পাচ্ছে না বিরোধী দল

জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী এবার সংসদের প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে বিরোধী দলের ৫০টির মধ্যে ১১টি সংসদীয় কমিটিতে সভাপতি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনো পর্যন্ত গঠিত ১৫টি কমিটির মধ্যে মাত্র একটিতে সভাপতি করা হয়েছে বিরোধী দল থেকে। সেটিও সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত কমিটি, প্রথাগতভাবে এই কমিটির সভাপতি বরাবর বিরোধী দল থেকেই করা হয়।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, সভাপতি পদ দেওয়ার জন্য বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে নাম দেওয়ার শর্ত দিয়েছিল সরকারি দল। কিন্তু তা মানেনি বিরোধী দল। এ জন্যই সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া হচ্ছে না তাদের।

জানতে চাইলে জামায়াতের সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জুলাই সনদ লঙ্ঘন করে ওনারা আমাদের আর কোনো সভাপতি পদ দেবে না। সরকারি দল আমাদের শর্ত দিয়েছে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে যোগ দিতে হবে, তাহলে সভাপতি পদ দেবেন। আমরা তাঁদের জুলাই সনদের বিষয়টি স্মরণ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু না দিলে তো জোর করতে পারব না।’

বিরোধীদের এ অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, অতীতের রীতি অনুযায়ী এবার সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। অতীতে সরকারি হিসাব কমিটি বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছিল। সেটা এবারও রাখা হয়েছে। সব কমিটি শিগগির গঠিত হবে। জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবে বাস্তবায়ন হবে। এ জন্য সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটি কাজ করছে। সেটা বাস্তবায়ন হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত