
সাইবার অপরাধ ও অনলাইন হয়রানি ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশোধনীর একটি খসড়াও তৈরি করা হয়েছে। তবে খসড়ার কয়েকটি বিধান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন অংশীজনেরা। তাঁরা বলছেন, এসব ধারা চূড়ান্ত হলে জনগণের মৌলিক মানবাধিকার, বাক্স্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঝুঁকি তৈরি হবে। আইনটির অপব্যবহারের মাধ্যমে ভিন্নমত দমনের শঙ্কাও রয়েছে।
সরকার বলছে, সংশোধনীর খসড়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের খসড়ায় সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও মতপ্রকাশের অধিকারকে একই কাঠামোয় আনা হয়েছে। এতে তিনটি ক্ষেত্রের কোনোটিই যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। বিভিন্ন বিষয়ের সংজ্ঞা এমনভাবে দেওয়া হয়েছে, যাতে অপব্যাখ্যার সুযোগ থাকে। এতে বাক্স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আইন সংশোধনের খসড়ায় গুজব ও অপতথ্য প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
গুজব বলতে অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে বোঝানো হয়েছে। এমন তথ্য জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক বা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। অপতথ্য বলতে মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে বোঝানো হয়েছে। তবে সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি, প্রকাশ বা প্রচারের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, কোনো তথ্য দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করলে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। একই ব্যবস্থা নেওয়া যাবে এমন আশঙ্কা থাকলেও। ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়ানো এবং জাতিগত সহিংসতার আশঙ্কার ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নির্দেশনা দেওয়া হলেও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
কোনো তথ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মানহানিকর হলেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর তথ্যের ক্ষেত্রেও একই বিধান রাখা হয়েছে।
খসড়ায় যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেলিং ও সেক্সটরশনকে অপরাধ হিসেবে রাখা হয়েছে। রয়েছে রিভেঞ্জ পর্নো ও ডিজিটাল শিশু নিপীড়নের বিষয়ও। বুলিং ও মানহানিকর তথ্য প্রকাশের বিষয়ও শাস্তির আওতায় রাখা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে লেখা, অডিও, ভিডিও, গ্রাফিকস ও স্থিরচিত্রের কথাও বলা হয়েছে। মিম বানানো আর মিম শেয়ার করার মধ্যে আইনে কোনো পার্থক্য টানা হয়নি।
বর্তমান আইনে ধারা ২৫-এ মূলত যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেল, রিভেঞ্জ পর্নো, সেক্সটরশন এবং শিশু যৌন নিপীড়নের উপাদানসংক্রান্ত অপরাধের মধ্যে সীমিত।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে একই ধারায় ‘মানহানি’, হেয়প্রতিপন্ন করা এবং বুলিং যুক্ত করা হয়েছে।
হেয়প্রতিপন্ন করার সংজ্ঞাও বিস্তৃত। শব্দ, আচরণ, প্রকাশনা, অঙ্গভঙ্গি বা এমন কোনো কাজ, যা অন্য ব্যক্তির মর্যাদা, সম্মান, সুনাম বা সামাজিক অবস্থান কমিয়ে দেয় এবং অন্যদের কাছে তাকে অপমানিত বা অসম্মানিত হিসেবে তুলে ধরে; তা এর আওতায় পড়তে পারে। প্রস্তাবিত ধারা ২৫(১)-এ সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক বক্তব্য প্রায়ই কোনো ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। বিরোধী রাজনীতিতে এমন বক্তব্য থাকে। সম্পাদকীয় কার্টুনেও থাকে। রাজনৈতিক বিতর্কেও থাকে। প্রতিবাদের স্লোগানেও থাকতে পারে। ২৫(১)-এর মাধ্যমে তাদের শাস্তির আওতায় আনা যাবে।
ধারা ২৭-এ বলা হয়েছে, শেয়ার করাই প্রচার। এবং সহায়তার শাস্তি মূল অপরাধের সমান। অর্থাৎ মিম যিনি বানালেন আর যিনি শেয়ার করলেন দুজনেরই একই শাস্তি। এআই-নির্মিত ও এডিটকৃত উপাদান আইনে সরাসরি নাম ধরে লেখা আছে। ব্যঙ্গ, প্যারোডি বা কার্টুনের জন্য কোনো ছাড় নেই।
বর্তমান আইনে কোনো কনটেন্ট ব্লক করা হলে, তা জনসমক্ষে না প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এই বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। খসড়া সংশোধনীতে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি এই আইনের অধীনে অপরাধ করলে তার নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিল করা যাবে। প্রয়োজনে ওই কোম্পানির কার্যক্রমও স্থগিত করা যাবে। বর্তমান আইনে এ ধরনের কোনো বিধান নেই।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট বলেছে, এসব সংশোধনী অনলাইনে মুক্ত মতপ্রকাশের ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার বাড়াবে।
সংশোধনীর খসড়ায় জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কাউন্সিলের প্রধান হবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৮ সদস্যের কাউন্সিলে পাঁচজন মন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা থাকবেন। বেসরকারি পর্যায় থেকে দুজন বিশেষজ্ঞ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাঁরা তথ্যপ্রযুক্তি বা মানবাধিকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবেন। তাঁদের মনোনীত করবে সরকার। কাউন্সিলের সদস্য এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়মুক্তির বিধানও রয়েছে।
এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের নেতৃত্বে কাউন্সিল হলে সরকারের প্রভাবই বেশি থাকবে। এতে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। স্বাধীন ও দলনিরপেক্ষ কাউন্সিল গঠন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের এতে যুক্ত করতে হবে।
২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে দীর্ঘদিন সমালোচনা ছিল। বিভিন্ন ধারা ব্যবহার করে মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে হয়রানির অভিযোগও উঠেছিল। ২০২৩ সালে ওই আইন বদলে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হয়। পরে ২০২৫ সালে তা বাতিল করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে। চলতি বছরের ১০ এপ্রিল অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হয়। পরে ৩০ জুন সংসদে এর একটি সংশোধনী পাস হয়। তখনই আইনটি আরও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। সেই সংশোধনের খসড়া তৈরি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি) মন্ত্রণালয়ের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের খসড়া তৈরির সময় পলিসি অ্যানালিস্ট ছিলেন বর্তমানে ইনস্টিটিউট অব পলিসি ডায়নামিকসের নির্বাহী পরিচালক আসিফ শাহ্রিয়ার সুস্মিত। তিনি বলেন, ‘গত বছর সংস্কারের মধ্য দিয়ে যে জিনিসগুলোকে এড়ানোর জন্য আমরা নতুন করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ (এখন আইন) করেছিলাম, এখন সেগুলোর প্রায় সবই ফিরছে, কয়েকটা আগের চেয়ে বড় হয়ে।’ তিনি বলেন, খসড়ায় মানহানি আর ‘হেয়প্রতিপন্ন’ ঢোকানো হচ্ছে যৌন নিপীড়ন আর শিশু সুরক্ষার ধারার ভেতরে প্যাকেট করে। যদিও দণ্ডবিধির ১৮৬০-এ ইতিমধ্যে মানহানির ধারা রয়েছে। হেয়প্রতিপন্নের সংজ্ঞায় ‘ইঙ্গিত’ও আছে; আছে ‘প্রকাশ’ বা সহায়তায় সমান দণ্ড। মানে সমালোচনা মাত্রই অফেন্স, রিয়্যাক্ট-শেয়ার দিলেও জেল। তথ্য মিথ্যা না হলেও পড়তে পারে ‘গুজব-অপতথ্য’র আওতায়, শাস্তি ১০ বছর। বিচারের এখতিয়ার পাচ্ছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। যেখানে উচ্চ আদালতের বিধান অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত অসাংবিধানিক।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, আগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের যেসব ধারা নিয়ে ব্যাপক অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল, সেগুলোর কিছু নতুন খসড়ায় আবার দেখা যাচ্ছে; যা উদ্বেগজনক।
সরকারকে সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী অবিলম্বে প্রত্যাহার অথবা সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক এই সংগঠন মনে করে, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে ‘যাচাই করা হয়নি’ বলে বিবেচিত সংবাদ প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের কাজ বন্ধ করে দেওয়া এবং সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতাও কর্তৃপক্ষের ওপর ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে জাতীয় সংসদ ভবনে গত মঙ্গলবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান বলেন, গত দুই বছর ধরে দেশের রাজনীতিতে গালিগালাজের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ডে পরিণত করা হয়েছে। গালিগালাজ সভ্য বিষয় নয় এবং সমাজও তা সমর্থন করে না। এমনকি টকশোতেও গালিগালাজ করা হয়। তাই এই বিষয়গুলো সাইবার সুরক্ষা আইনে থাকা উচিত। আইনের সংশোধনীর মাধ্যমে কেউ নিপীড়িত হয়, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অ্যাভিয়েশন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে ওপেন স্কাই পলিসি, এয়ার সার্ভিস অ্যাগ্রিমেন্ট (এএসএ) সংশোধন এবং বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারের চার্জ মওকুফসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন খাতের উন্নয়নে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারত...
৭ ঘণ্টা আগে
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালসহ আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। আজ বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ জমা দেয় প্রসিকিউশন।
৮ ঘণ্টা আগে
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশ সদস্যদের নির্বাচনী দায়িত্ব পেশাদারির সঙ্গে পালনের লক্ষ্যে সারা দেশে ১১৪টি ভেন্যুতে দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। এর আগে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ নেননি এমন ৩৮ হাজার ৮৪৭ জন পুলিশ সদস্যকে এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
৮ ঘণ্টা আগে
দেশে পর্যাপ্ত সারের মজুত রয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় দাবি করলেও সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সরকার ও বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্য। তাঁরা জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের কাগজ-কলমের হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল নেই এবং তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় কৃষকেরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না...
৮ ঘণ্টা আগে