Ajker Patrika

জাতীয় সংসদ নির্বাচন: দলগুলোর কাঠগড়ায় ইসি

মো. হুমায়ূন কবীর, ঢাকাতানিম আহমেদ
ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ নষ্ট করার অভিযোগ তুলেছে রাজনৈতিক দলগুলো। দলগুলোর এই অভিযোগের কাঠগড়ায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন দল ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে।

কোনো কোনো দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব, নিরাপত্তা ব্যর্থতা, পোস্টাল ব্যালটে প্রতীকের বিন্যাস ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে ইতিমধ্যে ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দল বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন কমিশনে গিয়েও অভিযোগ করেছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের সময় ইসিকে পক্ষপাতিত্বসহ বিভিন্ন অভিযোগ সব সময় মোকাবিলা করতে হয়। ইসির সিদ্ধান্ত কোনো দলের পক্ষে না গেলেই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে অতীতে নির্বাচনের দু-এক দিন আগে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল এমন অভিযোগ তুললেও এবার তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন অভিযোগ করছে দলগুলো। প্রতিটি অভিযোগের বিষয়ে আইন ও বিধি মেনে ব্যাখ্যা দিলে মানুষের আস্থা বাড়বে।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রতিটি নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের অভিযোগ করে। এ ক্ষেত্রে কমিশন সেগুলো খতিয়ে দেখে সত্যতা দেখতে পারে। তবে এমন অভিযোগ খুব সাধারণ মনে হয়। এ জন্য কমিশনের তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা ঠিক হবে না। আইন ও বিধি মেনে করা কমিশনের কর্মকাণ্ড কারও পক্ষেও যেতে পারে, আবার বিপক্ষেও যেতে পারে।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘অভিযোগ থাকবেই। কিন্তু নির্দিষ্ট করে বললে আমাদের বোঝা ও ব্যবস্থা নেওয়া সহজ। কিন্তু ঢালাও অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া মুশকিল।’

বিএনপির অভিযোগ, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে ধর্মীয় অনুভূতির ধারাবাহিক অপব্যবহার করছে, যা নির্বাচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে শত শত পোস্টাল ব্যালট একটি নির্দিষ্ট দলের কর্মীদের কাছে থাকার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

সংঘবদ্ধভাবে ব্যালট সংগ্রহ ও ভোট দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। কোথাও কোথাও একজনের তথ্য ব্যবহার করে অন্যজনের পোস্টাল ব্যালট সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। পোস্টাল ব্যালটে ধানের শীষ প্রতীকের অবস্থান নিচের দিকে, যা সহজে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

পোস্টাল ব্যালটে প্রতীকের বিন্যাস নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, অনেক আসনে পোস্টাল ভোটের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি, যা বিজয় নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই ভোট যাতে কৌশলে কোনো পক্ষের অনুকূলে না যায়, তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল। কিন্তু প্রবাসী ভোটারদের পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে ৫ কলাম ও ১৪ লাইনের বিন্যাসে বিএনপির প্রতীক শেষ লাইনের মাঝামাঝি রাখা হয়েছে। ফলে ব্যালট ভাঁজ করলে প্রতীকটি আংশিক বা স্পষ্টভাবে দেখা যায় না।

বিএনপির কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগের বিষয়ে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফ্যাসিবাদের আমলে বিএনপির বেশ কয়েকজন প্রার্থী দেশের বাইরে ছিলেন, সেখানে নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁরা নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের আবেদন করেন। কিন্তু আবেদন থাকার পরও তাঁদের প্রার্থিতা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই অভিযোগের তিরও ইসির বিরুদ্ধে।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উত্তরবঙ্গ সফর প্রসঙ্গে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে শান্তির জন্য আমরা কর্মসূচি স্থগিত করেছি। নির্বাচন কমিশন এবং একটি রাজনৈতিক দল মনে করেছে এটা আমাদের দুর্বলতা। না, এটা আমাদের ভদ্রতা। তার পর থেকে নির্বাচন কমিশন এবং একটি রাজনৈতিক দল যেভাবে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় এবং পারতপক্ষে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চায় বিভিন্ন কৌশলে।’

জামায়াতের একটি প্রতিনিধিদল গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে ভোটের মাঠে সমান সুযোগ না থাকার অভিযোগ করে। দলটির অভিযোগ, নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীরা একটি দলের পক্ষে কাজ করছেন।

ভোটের মাঠে সব রকমের অসামঞ্জস্যতা নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে বিস্তারিত বলা হয়েছে বলে জানান জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বেশি দরকার। দলগুলোর সঙ্গে সরকারের আচরণ সমান হতে হবে। নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকা কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ নন। মাঠপর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তাদেরও একই অবস্থা, কারও বাতিল করে, কারও ‘ওকে’ করে। মাঠপর্যায়ের বেশির ভাগ কর্মকর্তা পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করছেন। একই দেশে দুই আইন। এমন অসামঞ্জস্যতাগুলো রয়েছে। এগুলো দূর করলেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে।

জামায়াতের অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আবার যাঁরা আইন মেনে কাজ করছেন, তাঁদের অহেতুক হয়রানি করছে। অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে না, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আছে, বিভিন্ন জায়গায় বাধা দিচ্ছে। এগুলো নিয়ে অভিযোগ দেওয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা নেই।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গড়া দল এনসিপিও তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন সময় ইসির বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণ, প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতাসহ নানা অভিযোগ তুলেছে। গত শুক্রবার রাতে দলটির মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সংবাদ সম্মেলনে ইসির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার অভিযোগ করেন। তিনি নির্বাচন কমিশনের গেটের সামনে একজন আপিলকারীর ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের পাশেই এমন ঘটনা ঘটা মানে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁদের প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁরা শঙ্কিত।

আসিফ মাহমুদ গতকাল শনিবার বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনেও ইসির সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় থেকেই ইসি একপক্ষীয় অবস্থান নিচ্ছে।

এনসিপির মুখপাত্র বলেন, কোনো দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিকে তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিতে দেবেন না। অনেকে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনে গিয়ে গুন্ডামি করছেন। শত শত আইনজীবীদের নিয়ে যাচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ প্রয়োগ করার জন্য। নির্বাচন কমিশনেরও নানা ধরনের ফাঁকফোকর দিয়ে তাঁদের বৈধতা দিতে একধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। এটি দেশের জন্য, সংবিধানের জন্য, নির্বাচনব্যবস্থার জন্য এবং সর্বোপরি গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। তিনি বলেন, তাঁরা কোনোভাবেই এই নির্বাচন কমিশনকে পূর্ববর্তী তিনটি নির্বাচন কমিশনের মতো একটা দায়সারা নির্বাচন এবং একপক্ষীয় নির্বাচন আয়োজন করার সুযোগ দেবেন না।

ইসির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম আজকের পত্রিকাকে বলেন, সবাই যখন অভিযোগ করে, তখন বুঝতে হবে সেগুলো রাজনৈতিক। কিন্তু তারপরও নির্বাচন শব্দটা খুবই স্পর্শকাতর। তাই নির্বাচনসংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ সঙ্গে সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে। খতিয়ে দেখে জনগণকে জানাতে হবে। সেখানে বলতে হবে–বিএনপি, জামায়াত এই অভিযোগ করেছিল, কিন্তু ইসি এটা পেয়েছে। তখন নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে জনগণের আস্থা বাড়বে। অভিযোগ ছোট হোক, বড় হোক, খতিয়ে দেখতে হবে।

গত শুক্রবার শেরপুর-২ আসনের বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপিল শুনানিতে একজন অভিযোগ দিতে এলে আপিলকারীকে বেশ কয়েকজন মারতে মারতে নির্বাচন কমিশনের বাইরে নিয়ে যান। বিএনপির প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে এই মারধরের অভিযোগ উঠলেও অস্বীকার করেছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা।

ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ঘটনাটি ইসির গেটের বাইরে রাস্তার ওপর ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে ইসি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। কিন্তু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তো কিছুই বলেননি।

ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা স্বাভাবিক বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, এটা সব সময় ছিল। এখনো উঠছে এবং ভবিষ্যতেও উঠবে। কিন্তু কতগুলো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলো আমলে নেওয়া দরকার। যেমন ইসির চোখের সামনে একজনকে পিটিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে, তা তো হতে পারে না। এ বিষয়ে তাদের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘আপু’ বলায় খেপলেন ইউএনও

ডালে ৩০ শতাংশ শুল্ক দিয়ে প্রতিশোধ নিয়েছেন মোদি, টেরই পাননি ট্রাম্প

কুমিল্লা-৪: বিএনপির প্রার্থী মনজুরুল অবৈধ, হাসনাত বৈধ— আপিলে ইসির সিদ্ধান্ত

চট্টগ্রামে ‘দুষ্কৃতকারী’র তালিকায় সাবেক মন্ত্রী–মেয়র, আ.লীগ–বিএনপি নেতা, আছেন চিন্ময় কৃষ্ণও

চট্টগ্রামে হাসনাত আবদুল্লাহর ওপর হামলা নিয়ে যা বললেন বিএনপি প্রার্থী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত