Ajker Patrika

নারী প্রার্থীর লড়াই পদে পদে

রাহুল শর্মা ও অর্চি হক, ঢাকা
নারী প্রার্থীর লড়াই পদে পদে
প্রতীকী ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার তালিকার প্রায় অর্ধেকই নারী। অথচ ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীদের মধ্যে নারী মাত্র ৪ শতাংশ। আবার নানা বাধা ঠেলে যাঁরা প্রার্থী হয়েছেন, তাঁদের লড়াই শুধু দলীয় প্রতীক বা আদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নানা রকম বৈষম্য, পীড়ন, নিরাপত্তাহীনতা এবং সর্বোপরি প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হচ্ছে তাঁদের।

রংপুর থেকে রাঙামাটি, বরিশাল থেকে ঢাকা—ভৌগোলিক অবস্থান যেটাই হোক, সর্বত্র নারী প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা প্রায় একই। অধিকাংশ নারী প্রার্থী বলেছেন, নারী হওয়ার কারণে তাঁদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হচ্ছে। দৈনন্দিন চলাফেরা থেকে ভোটের প্রচারণা, সময় ব্যবস্থাপনা থেকে নিরাপত্তা—প্রতিটি ধাপেই পুরুষ প্রার্থীদের তুলনায় বাড়তি ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে এগোতে হচ্ছে তাঁদের।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ২০ জন নারী প্রার্থীর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

আসন্ন নির্বাচনে মোট প্রার্থী ২ হাজার ১৭ জন। তবে নারী প্রার্থী মাত্র ৮৫ জন। মোট প্রার্থীর তুলনায় নারীর অংশগ্রহণের হার মাত্র ৪ শতাংশের কাছাকাছি, যা আগের নির্বাচনের তুলনায় কম।

নারী প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির ১০ জন, জাতীয় পার্টির ৬, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ২, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) ১০, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের ৬, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ৫, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) ৬, গণসংহতি আন্দোলনের ৪, গণফোরামের ৩, গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) ৩, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ২, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) ১, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) ১, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের ১, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ১, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) ১, নাগরিক ঐক্যের ১, আম জনতার দলের ১ জন, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ১ জন ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ১ জন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী রয়েছেন ১৯ জন। ১১ দলীয় জোটের নেতৃত্বে থাকা পুরোনো দল জামায়াতে ইসলামীর একজনও নারী প্রার্থী নেই।

অবিরাম পীড়ন, হুমকি ও সাইবার আক্রমণ

ঢাকার তাসলিমা আখতার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রুমিন ফারহানা, বরিশালের মনীষা চক্রবর্তী কিংবা খাগড়াছড়ির মিথিলা রোয়াজা—সবাই বলছেন, ভোটারদের কাছ থেকে তাঁরা সাড়া পাচ্ছেন। তবে বিভিন্ন রকম বুলিং (পীড়ন বা ভয় দেখানো), হুমকি ও সাইবার আক্রমণের শিকার হচ্ছেন তাঁরা। কারও প্রতি প্রকাশ্যে তির্যক, আপত্তিকর মন্তব্য করা হচ্ছে। কেউবা সরাসরি তির্যক মন্তব্যের সম্মুখীন না হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেয় করা হচ্ছে তাঁদের।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ এর স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা বলেন, ‘প্রকাশ্য জনসভায় আমার পোশাক-আশাক নিয়ে...‘রুমিন ফারহানা টিস্যু পেপার হয়ে গেছে, টিস্যু পেপার কাজে লাগে না’— এ রকম অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে।’

নাটোর-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাঁর সমর্থকদের মাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অশালীন মন্তব্য তাঁকে চরম মানসিক চাপে ফেলেছে।

ঢাকা-৮ আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মেঘনা আলম অভিযোগ করে বলেছেন, নারী হওয়া, আপোসহীন অবস্থান নেওয়া এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলাই পরিকল্পিতভাবে তাঁর চরিত্র হননের কারণ। তাঁর মতে, উন্নয়ন বা নীতিগত বিতর্কের বদলে নারী প্রার্থীদের ব্যক্তিগত আক্রমণই বেশি করা হয়।

বরিশালের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে নিয়মিত সাইবার আক্রমণ চলছে। ‘মৌলবাদী’ দলের প্রার্থীদের কাছ থেকে অসম্মানজনক আচরণ ও টিভি টক শোতেও অবমাননাকর আচরণের অভিযোগ তুলেছেন তিনি।

প্রায় সব নারী প্রার্থীর বক্তব্যেই উঠে এসেছে, নারী হিসেবে তাঁদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে। ঝালকাঠির প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো বলেছেন, প্রচারণা শান্তিপূর্ণ হলেও নিরাপত্তা ও যাতায়াতে বাড়তি সতর্কতা নিতে হচ্ছে, যা একজন পুরুষ প্রার্থীর ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায় না।

ঢাকা-২০ আসনের নাবিলা তাসনিদ প্রশাসনিক বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর ব্যানার-ফেস্টুন ছেঁড়া হলেও অভিযোগের কার্যকর কোনো প্রতিকার তিনি পাননি।

প্রতিপক্ষের আচরণ প্রায়শই আক্রমণাত্মক

নারী প্রার্থীরা বলেছেন, দেশের কিছু কিছু এলাকায় প্রতিপক্ষের আচরণ তুলনামূলক সহনশীল। যেমন ঝালকাঠি ২, রাঙামাটি ও রংপুর-৬ আসনে নারী প্রার্থীরা বলেছেন, তাঁরা সরাসরি কোনো হয়রানির মুখে পড়েননি।

কিন্তু বরিশাল, ঢাকা ও নাটোরের কয়েকজনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। বরিশালের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী অভিযোগ করেছেন, তিনি ক্যাম্প করতে বাধা পেয়েছেন। এজেন্ট হতে চাইলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মেঘনা আলমের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের একাংশ সরাসরি ভয় দেখানো ও কুৎসার আশ্রয় নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। মেঘনার নারী প্রচার কর্মীদের ধর্ষণের হুমকির পাশাপাশি নানাভাবে হেনস্তার চেষ্টা হয়েছে।

শেরপুর-১ (সদর) আসনের বিএনপি প্রার্থী ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘একজন নারী প্রার্থী হিসেবে বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছ থেকে যতটা সম্মান পাওয়ার কথা, ততটুকু পাচ্ছি না। বিভিন্ন জায়গায় তিনি আমাকে নিয়ে কটূক্তি করছেন। আমি খুবই হতাশ। যদি এমপি প্রার্থী হিসেবে তাঁর কাছ থেকে সম্মান না পাই, তাহলে সদর আসনের ৫২ শতাংশ নারী ভোটার কীভাবে সম্মান পাবে!’

পাহাড়ি জেলা রাঙামাটির প্রার্থী জুঁই চাকমা বলেছেন, এবারের নির্বাচনী পরিবেশ তাঁর আগের অভিজ্ঞতার চেয়ে ভালো। সাতজন প্রার্থীর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের একজন নারী প্রার্থীর এমন আত্মবিশ্বাস আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।

মোট প্রার্থী বাড়লেও নারীর প্রতিনিধিত্ব কমেছে

স্বাধীনতার পর থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ সেই হারে বাড়েনি। বিভিন্ন নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট প্রার্থীর তুলনায় নারী প্রার্থীর সংখ্যা এখনো খুবই সীমিত।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০০১) মোট প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৯৩৫ জন। তাঁদের মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৩৭ জন। নবম সংসদ নির্বাচনে (২০০৮) মোট প্রার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৬৭ জনে, তবে নারী প্রার্থীর সংখ্যা সামান্য বেড়ে হয় ৫৯ জন।

গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ তিনটি নির্বাচন ব্যাপকভাবে বিতর্কিত। বিরোধী দলের বর্জন ও কারচুপির অভিযোগের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এসব নির্বাচনের পরিসংখ্যান স্বাভাবিক প্রবণতার বাইরে বলে মনে করা হয়। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। এসব আসনে মোট প্রার্থী ছিলেন ৩৯০ জন। তাঁদের মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ২৯ জন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে (২০১৮) আবার প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৬৫ জনে। সেবার নারী প্রার্থী ছিলেন ৬৯ জন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মোট ১ হাজার ৯৭০ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ১০১ জন; যা সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

সহায়ক পরিবেশ তৈরির তাগিদ

সার্বিক বিষয়ে দৃষ্টি আর্কষণ করা হলে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক গতকাল বুধবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, নির্বাচনে যে প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন, নিরাপত্তা, সহিংসতা, পেশিশক্তির বিপরীতে তাঁদের অনেকে ভোগান্তির মুখে পড়ছেন। তবে পুরুষ প্রার্থীদের তুলনায় এ ক্ষেত্রে নারী প্রার্থীদের ভোগান্তি বেশি। পুরুষ প্রার্থীরা অনেক বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। আর নারীদের ক্ষেত্রে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা বেশি।

এই মানবাধিকারকর্মী আরও বলেন, জনপ্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখনো অনেক কম। এর অন্যতম কারণ রাজনৈতিক দলগুলোয় গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকা। এ ছাড়া সামাজিক কারণ, নিরাপত্তাহীনতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন—এগুলোর কারণেও অনেক নারী রাজনীতিতে আসতে পারেন না।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ভোটার তালিকায় নারীর হার প্রায় ৫০ শতাংশ হলেও প্রার্থী তালিকায় নারীদের অংশগ্রহণ এখনো প্রান্তিক। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক দলের অনীহা, নিরাপত্তাঝুঁকি, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রচারণায় ভয়ভীতি—এসব নারী প্রার্থীদের জন্য বড় বাধা হয়ে আছে।

ফওজিয়া মোসলেম আরও বলেন, প্রচারে নারীর প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল। এ ধরনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘এ জন্য একটি কমিটি রয়েছে। প্রার্থীরা অবমাননাকর বক্তব্য বা ভয়ভীতি প্রদর্শন এ ধরনের যেকোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে পারেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর প্রতিনিধি এবং নিজস্ব প্রতিবেদকেরা।]

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিএনপি সরকার গঠন করলে এনসিপির অবস্থান কী হবে, যা জানালেন নাহিদ ইসলাম

নওগাঁয় হাসপাতালের সামনে পড়ে ছিল রাজস্ব কর্মকর্তার রক্তাক্ত লাশ

যেভাবে হত্যা করা হয় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পুত্র সাইফকে

ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব: জিতলেও ফল ঝুলবে বিএনপির ২ প্রার্থীর

অনলাইন গেমের নেশা: নিষেধ করায় গভীর রাতে ৯ তলা থেকে ঝাঁপ দিল ৩ বোন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত