Ajker Patrika

সুপারিশের এক বছর পরও হয়নি স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস

এস এম নূর মোহাম্মদ, ঢাকা  
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

সারা দেশের জেলা আদালত ও উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিয়োগে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস করার সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি এক বছরেও। বিলুপ্ত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় হলেও স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস হয়নি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দলীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিযুক্ত হওয়ায় মামলা পরিচালনায় কখনো কখনো অবহেলা দেখা যায়। আন্তরিকতার অভাবে মামলার সংখ্যা ও দীর্ঘসূত্রতা বাড়ছে। স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিসের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিয়োগ হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পাশাপাশি মামলা নিষ্পত্তিতে গতি আসবে।

আইন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ‘জাতীয় অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ’ নামে আইন করার জন্য প্রথম খসড়ার কিছু বিষয় সংশোধনের পর দ্বিতীয় খসড়ার কাজ চলছে। আইনটি চূড়ান্ত করে আগামী মাসেই (ফেব্রুয়ারি) অধ্যাদেশ জারি হতে পারে।

জেলা আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জিপি, এজিপি ও পিপি-এপিপি হিসেবে পরিচিত। উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা হলেন অ্যাটর্নি জেনারেল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল। অ্যাটর্নি জেনারেল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা। সরকার উচ্চ ও অধস্তন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের নিয়োগ করে থাকে। প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারই এসব পদে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দিয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. শাহজাহান সাজু আজকের পত্রিকাকে বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ হওয়ার কারণে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে তাঁদের দলের স্বার্থ বেশি চিন্তা করেন। তাঁদের চাকরির স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা যায় না।

কারণ, তাঁরা পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ হন। অথচ দুই বছর, এক বছর পর কাউকে বাদ দেওয়া হয় অথবা কেউ নিজেই পদত্যাগ করেন। কিন্তু এর কোনো জবাবদিহি থাকে না। স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস হলে সবাই চাকরির আওতায় আসবেন। এখান থেকে তাঁদের পদোন্নতি হবে। তখন শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যাবে। তিনি দ্রুত স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।

দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে এবং আদালত ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিসের দাবি জানিয়ে আসছেন বিচারকসহ সংশ্লিষ্টরা। তবে অতীতের কোনো সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন গঠন করলে কমিশনে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিসের বিষয়ে লিখিত প্রস্তাব দেয় জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। ওই প্রস্তাবে বলা হয়, সরকারি আইনজীবীদের অসততা, অবহেলা, দূরদর্শিতা ও জবাবদিহির অভাব, অসহযোগিতার মনোভাব, সর্বোপরি আন্তরিকতার অভাবের কারণে মামলার সংখ্যা ও দীর্ঘসূত্রতা বেড়ে চলেছে। এ ছাড়া অনেকে ব্যক্তিগত মামলা পরিচালনায় ব্যস্ত থাকার কারণে রাষ্ট্রপক্ষের মামলায় প্রস্তুতি গ্রহণের সময় পান না, সাক্ষীদের প্রস্তুত করেন না এবং অনেক ক্ষেত্রে দরকারি প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করেন না, যার ফলে অপরাধীরা খালাস পায়।

পরে বিলুপ্ত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস করার সুপারিশ করে। ওই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, অ্যাটর্নি সার্ভিসের জন্য সুনির্দিষ্ট কাঠামো, নিয়োগ পদ্ধতি, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা, বেতন কাঠামোসহ আর্থিক সুবিধাদি এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে যথাযথ বিধানসংবলিত আইন থাকবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপক্ষের সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর জামিন ঠেকাতে যথেষ্ট তৎপরতা না থাকায় অনেক অপরাধী, সন্ত্রাসী জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর আদাবর থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ওই অস্ত্র মামলায় তিনি গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। ওই জামিনের সময়সীমা বাড়াতে ১২ অক্টোবর আবেদন করলে উচ্চ আদালত তাঁর এক বছরের জামিন মঞ্জুর করেন। তবে এই জামিন বাতিল চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার আদালতে যায়নি। হাদি হত্যাকাণ্ডের পর বিষয়টি সামনে আসে।

জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে প্রসিকিউটরদের সহায়তায় তদন্তের গুণগত মান বাড়বে এবং তদন্তে বিদ্যমান পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার একচ্ছত্র আধিপত্য কমবে। এতে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমবে। এ ছাড়া সরকারি কৌঁসুলিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করায় বিচারকাজে গতি আসবে, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে, বিচারপ্রার্থীদের অর্থ ও সময় সাশ্রয় হবে। তাই দ্রুত স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ করেন তিনি।

স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস করার ব্যাপারে অগ্রগতি জানতে চাইলে বিলুপ্ত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ও আইন মন্ত্রণালয়ের স্পেশাল কনসালট্যান্ট ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জাতীয় অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ’ নামে আইন করার জন্য একবার খসড়া করা হয়েছিল। সেখানে কিছু বিষয় সংশোধন করার পর দ্বিতীয় খসড়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তাঁরা আশা করছেন, আইনটি চূড়ান্ত করে চলতি মাসেই অধ্যাদেশ জারি করা যাবে। এই আইন হলে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ হবে বিচারক নিয়োগের মতো পরীক্ষার মাধ্যমে। এতে দক্ষ আইনজীবী যেমন আসবেন তেমনি বাড়বে মামলা নিষ্পত্তিও। কমবে রাজনৈতিক প্রভাব। এ ছাড়া মামলা তদন্তেও গতি বাড়বে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নির্বাচনের পর কী করবেন ড. ইউনূস, জানাল প্রেস উইং

বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের নতুন ব্যাখ্যা দিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন

৫১ বছর পর মার্কিন আকাশে ডুমসডে প্লেন, পারমাণবিক যুদ্ধের শঙ্কায় কাঁপছে সোশ্যাল মিডিয়া

নিজের চরকায় তেল দাও—মামদানিকে ভারতের তিরস্কার

বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে খুন হন মুছাব্বির, পাঠানো হয় ১৫ লাখ টাকা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত