Ajker Patrika

আদিম পাথারিয়া পাহাড়ের আলিঙ্গনে

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম
আদিম পাথারিয়া পাহাড়ের আলিঙ্গনে

উঁচু পাহাড়। গভীর অরণ্য। দিগন্তছোঁয়া গাছগাছালি আর বানর-উল্লুকের হাঁকডাক। এখানে দিনদুপুরে ঝিঁঝি পোকার মন্ত্রমুগ্ধ শব্দ। শিলাকূপের গভীরতায় ঝিরির নিঃশব্দ জমে থাকা শীতল পানি। আবার কখনো দূর থেকে ভেসে আসা ঝরনার গান। কখনোবা কলকল শব্দ তুলে দ্রুত বেগে ঝিরির স্বচ্ছ পানির অবিরাম ছুটে চলা। কখনোবা আবার পাহাড়ের ছোট ছোট খাঁজে থাকা পানিতে মাছেদের সাঁতরে বেড়ানোর নয়ন জুড়ানো দৃশ্য। যেতে যেতে একটা সময় আপনাকে নৈঃশব্দ্য ঘিরে ফেলবে। এমনই মায়াবী পরিবেশে প্রকৃতির মাঝে ডুবে মন-প্রাণ বিলীন হয়ে যাওয়ার পর চেতনা ফিরে আসবে মহিষা আর টাইগার জোঁকের উৎপাতে। তবু গহিন থেকে আরও গহিনে যেতে কোনো বাধাই বাধা মনে হবে না। কিছুদিন আগেই ঘুরে এসে লিখেছি প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি বছর বয়স্ক, সীমান্তঘেঁষা আদিম পাথারিয়া পাহাড়ের ভ্রমণগল্প।

যাত্রা শুরুর পথে

দে-ছুট ভ্রমণ সংগঠনের বন্ধুরা একদিন রাতের গাড়িতে চলে যাই মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার ডিমাই বাজার। প্রচণ্ড যানজটে গাড়ি পৌঁছায় নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে। এতে ভ্রমণ পরিকল্পনার বারোটা বাজে। তাও যে রক্ষা গাইড সময়মতোই হাজির ছিলেন। কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পোশাক বদলে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে আহমদপুর গ্রামের পথে রওনা হই। সেখানে পৌঁছে অটোরিকশা ছেড়ে হেঁটে ডিমাই গ্রাম পেরিয়ে মোকামপুঞ্জি ধরে এগোতে থাকি। যেতে যেতে পাথারিয়া পাহাড়ের জঙ্গলে নিজেদের আবিষ্কার করি। সুনসান নীরবতা চারপাশ গ্রাস করেছে। আরেকটু এগোতেই ঝরনার গান কানে ভেসে আসে। পাথুরে ঝিরিতে ক্ষিপ্রগতি তুলে বয়ে যায় স্বচ্ছ পানি। চোখমুখে সেই পানি ছিটাতেই উবে যায় সব ক্লান্তি। হালকা নাশতা সেরেই পুরোদমে আবার হাইকিং।

ঝরনার পথে পথে

যাত্রার শুরুতেই চোখে ধরা দেয় ঝেরঝেরি ঝরনা। সেখানে বুনো পরিবেশে বেশ উঁচু পাহাড় থেকে দুপাশ থেকে ছড়িয়ে পড়ছে পানি। প্রথম দেখাতেই ঝেরঝেরি নজর কেড়ে নেয়। তাই তার পানিতে ভেজার লোভ সামলাতে না পেরে নেমে পড়ি জলকেলিতে। শুরুতেই এক ঝরনায় ইচ্ছেমতো ভিজি। সামনে রয়েছে আরও কয়েকটা। শরীরের অবস্থা এবার কেমন হয় কে জানে। তা যা হোক আবারও হাইকিং। অল্প কিছু দূর যেতেই চোখ আটকায় পানজুমাই ঝরনায়। ঝরনার কাছাকাছি পৌঁছাতেই এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা দৃশ্য। সামনে পানজুমাই ঝরনা। প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে ঘেরা ঝরনাটির আরও কাছাকাছি চলে যাই। লোভাতুর মন শ্বেতশুভ্র পানিতে নিজেদের সমর্পণ করি। বিলিয়ে দিই পানজুমাইর শীতল আলিঙ্গনে। ভিজতে ভিজতে যেন শরীরে জলবিদ্যুৎ সঞ্চয় হলো। এক অদ্ভুত শক্তিতে পিচ্ছিল পাথুরে বোল্ডার পেরিয়ে ঝরনার ওপরে উঠে যাই।

বন্ধুর পথ পেরিয়ে শান্ত ঝরনার দেখা

পানজুমাই ঝরনার ওপরটা সত্যিই অসাধারণ সৌন্দর্যে ঘেরা। পাহাড়ের গায়ে রয়েল বেঙ্গলের মতো ডোরাকাটা সোনালি রেখা। ঝরনার পানি পড়তে পড়তে প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্ট বাথটাব। গলাসমান টলটলে পানি। আবারও ইচ্ছেমতো ভিজলাম। জলাশয়ে বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কেটে এবার পাহাড়ের সরু পথ দিয়ে আরও ওপরে ওঠার প্রস্তুতি নিই। কিন্তু কিছু দূর যেতেই বাধা হয়ে দাঁড়াল শত শত টাইগার জোঁকের ঝাঁক। গাইডের পরামর্শে দুঃসাহস পরিহার করে, বরং আমরা চললাম পানবাগিছার ডর। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাই পানবাগিছার ডর ঝরনার প্রান্তরে। খুবই শান্তভাবে অবিরাম ধারায় রিমঝিম ছন্দ তুলে, শুভ্র ফেনা তুলে স্বচ্ছ টলটলে পানি বয়ে যায় আপন মনে। ঝরনার পরিবেশটা কেন যেন শান্ত শান্ত মনে হলো। এটা মনের একপ্রকার অনুভূতি, যা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। অথচ ঝরনাটির নামের শেষে ডর। সত্যিই বিষয়টা অদ্ভুত। পানবাগিছার ডর ঝরনার সান্নিধ্যে এসে আমরাও কেমন যেন শান্ত হয়ে উঠেছিলাম। তাই সেখানে ভেজার উল্লাসে না মেতে নয়নভরে দেখে সঞ্জীত ঝরনার দিকে এগোই। টিপটিপ বৃষ্টি। পাথারিয়া পাহাড়ের মাটি পিচ্ছিল হয়ে উঠল। জোঁকের উপদ্রব বেড়ে গেল কয়েকগুণ। এমতাবস্থায় ঝোপঝাড় পেরিয়ে পাহাড় ট্রেকিং। একসময় ঠিকই সঞ্জীত ঝরনার প্রান্তরে পৌঁছে যাই।

প্রকৃতির ডাকে প্রকৃতির সঙ্গে

কাছ থেকেই ফিরে না এসে পাহাড়ের ওপর থেকে কিছুটা নিচে নেমে সঞ্জীত ঝরনার গায়ে নিজেদের দেহটাও আলতো করে মিলিয়ে দিই। অবিশ্বাস্য! কিছুটা সময় পেরোতেই মায়াজালে আটকে গেলাম। অলসভাবে বসে থাকতে থাকতে সন্ধ্যা নেমে এল। এবার ছুটলাম আরেক পাহাড়ের ওপর থাকা জুমঘরে। রাতটা সেখানেই কাটাব। জুমঘরটা কিছুটা অগোছালো হলেও উপায় নেই। লোকালয়ে ফেরার তখন কোনো সুযোগ ছিল না। পরদিন ভোরে আশপাশের নৈসর্গিক পরিবেশ মন শান্ত করে দিল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে উল্লুকের হাঁকডাক বেশ লাগল। আরও ভালো লাগার মতো ব্যাপার, মহাবিশ্বের খোলা ক্যানভাসের নিচে সব কৃত্রিমতার সীমানা ছাড়িয়ে প্রকৃতির ডাকে প্রকৃতির সঙ্গেই একাত্ম হওয়ার এক অন্য রকম স্বাধীনতা। যাই এবার আতরবাগান ছাড়িয়ে কাঁকড়াছড়া ঝরনার প্রান্তরে। হাইকিং-ট্রেকিং করতে করতে ঢুকে যাই বুনো এক ঝিরিতে। একের পর এক পাথারিয়ার পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা নানা সৌন্দর্য চোখে ধরা দিয়েই যাচ্ছে। প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়। ঝিরিপথে থাকা গাছে গাছে ঢাউস সাইজের পাকা ডুমুর, যা দেখতে একেকটা বড়সড় লাল আনারের মতো। অন্যান্য ঝিরির চেয়ে কাঁকড়াছড়া ঝিরির পাথরগুলোও বেশ বড় ও গোলাকার। এমনই নজরকাড়া ঝিরিপথ ধরে যেতে যেতে কাঁকড়াছড়া ঝরনার প্রান্তরে হাজির। প্রথম দেখাতেই নয়নজোড়া মোর মুগ্ধ। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এর চেয়ে ভালো পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিলাম। তারাই নাহয় ঘুরতে গিয়ে নিজের চোখে দেখে আসুক। আর এই সুযোগে আমরাও দিনের শুরুতেই কাঁকড়াছড়া ঝরনায় অবগাহনে মেতে উঠি। হুট করেই আকাশ মেঘলা হয়ে বিকট গর্জন। আচমকা হরকাবানের ভয়ে দ্রুত ফিরতি পথ ধরি।

যাতায়াত

ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে দিনে-রাতে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলাগামী বিভিন্ন পরিবহনের বাস ছেড়ে যায়। বাস থেকে বড়লেখা উপজেলার ডিমাই বাজারে নেমে যেতে হবে। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে আহমেদপুর গ্রাম। এরপর স্থানীয় কাউকে সঙ্গে নিয়ে হাইকিং-ট্রেকিং।

থাকা-খাওয়া

উপজেলা সদরে মানভেদে বেশ কিছু আবাসিক ও খাবারের হোটেল রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত