সমুদ্রের বুকে দক্ষিণ কোরিয়ার এক বেগুনি দ্বীপ

কল্পনা করুন এমন এক দ্বীপের কথা, যেখানে বিশাল সমুদ্রের নীল পানির ওপর দিয়ে প্রসারিত কাঠের দীর্ঘ সেতু। সেখানে ঘরবাড়ির ছাদ, রাজপথ, টেলিফোন বুথ, সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে রাস্তার বেঞ্চ পর্যন্ত সবকিছুই রাঙানো বেগুনি রঙের নানা মায়াবী শেডে। কোনো ফ্যান্টাসি সিনেমা বা রূপকথার বইয়ের পাতা থেকে যেন বাস্তব জগতে নেমে এসেছে এক স্বপ্নিল ক্যানভাস। দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ জোল্লা প্রদেশের সিনান কাউন্টিতে অবস্থিত পার্পল আইল্যান্ড বা বেগুনি দ্বীপ আজ বিশ্বের অন্যতম অনন্য ও রহস্যময় পর্যটন গন্তব্য। মূলত আনজোয়াদো প্রধান ভূখণ্ডের সঙ্গে কাঠের দীর্ঘ সেতু দিয়ে যুক্ত দুটি ক্ষুদ্র দ্বীপ। বানয়োল ও বাকজিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এই বেগুনি দুনিয়া।
বেগুনি রঙের মোহময় রূপকথা
পার্পল আইল্যান্ডে পা রাখা মাত্রই মনে হবে আপনি বাস্তব জগৎ ছেড়ে এক বেগুনি রঙের সাগরে ডুব দিয়েছেন। দ্বীপে প্রায় ৪০০টি ভবনের ছাদ রাঙানো হয়েছে হালকা বেগুনি ও লিলাক রঙে। স্থানীয়ভাবে জন্মানো বেগুনি ঘণ্টার মতো দেখতে বেলফ্লাওয়ার এবং বেগুন ও কোহলরাবির মতো ফসলের উৎসাহে এই রঙের পরশ ছড়ানো হয়। বসন্তকালে যখন দিগন্তজোড়া মাঠে ল্যাভেন্ডার ফুল; শরতে যখন বেগুনি অ্যাস্টার ফুটে ওঠে, তখন সমুদ্রের নীলাভ জলরাশি আর উপকূলীয় সবুজ প্রকৃতির মাঝে এই রঙের খেলা রূপ নেয় এক পরাবাস্তব দৃশ্যে।

সমুদ্রের ওপর বেগুনি সেতুর পদচারণা
দ্বীপটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় কেন্দ্রবিন্দু হলো পার্পল ব্রিজ। নীল সমুদ্রের বুক চিরে চলে যাওয়া প্রায় ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কাঠের পায়ে হাঁটার সেতুটি বানয়োল ও বাকজি দ্বীপকে যুক্ত করেছে। জোয়ারের সময় বেগুনি সেতুর নিচ দিয়ে জলরাশি বয়ে যায় কিংবা ভাটার সময় চারপাশের বিশাল কাদা-চর জেগে ওঠে। তখন সেতুর ওপর হেঁটে যাওয়ার অনুভূতি রূপকথার কথা মনে করিয়ে দেয়। হেঁটে বা বাইকে চড়ে শান্ত হাওয়ায় এই সেতু পার হওয়া যেকোনো ভ্রমণকারীর হৃদয়ে এক অপার্থিব প্রশান্তি জোগায়।
নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার রূপান্তর
আইকনিক এই সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক সামাজিক পুনর্জাগরণের গল্প। একসময় বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যা ও লোকসংখ্যা হ্রাসের সংকটে পড়া এই দ্বীপের বাসিন্দারা ও স্থানীয় সরকার একে আকর্ষণীয় করার সিদ্ধান্ত নেয়। শুরু হয় এক ঐতিহাসিক রূপান্তর। ৩০ হাজার অ্যাস্টার ফুল ও ২১ হাজার ৫০০ বর্গমিটারজুড়ে ল্যাভেন্ডার রোপণ করে সাজানো হয় দ্বীপ দুটি। এই অভূতপূর্ব উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালে জাতিসংঘ পর্যটন সংস্থা একে বিশ্বের সেরা পর্যটন গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করে।

বিটিএস ভক্ত ও ‘বোরাহে’ সংযোগ
সমুদ্র আর বেগুনির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই দ্বীপ শান্ত ও স্নিগ্ধ। মানুষের সৃজনশীলতা কীভাবে প্রকৃতির বুকে নতুন এক স্বপ্নের জন্ম দিতে পারে, পার্পল আইল্যান্ড তারই এক উজ্জ্বল সাক্ষী। দ্বীপটির আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ বিশ্বখ্যাত পপ ব্যান্ড বিটিএস ও তাদের ভক্তদের আর্মি ভালোবাসা। ২০১৬ সালে বিটিএস সদস্য কিম তাইহিয়ুং (ভি) প্রথম তৈরি করেছিলেন বোরাহে বা আই পার্পল ইউ শব্দটি। কোরিয়ান বোরা অর্থাৎ বেগুনি রংকে ভালোবাসা ও চিরন্তন বন্ধনের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। বিশ্বজুড়ে উদ্যাপিত সেই ভালোবাসার স্মারক হিসেবে দ্বীপে স্থাপন করা হয়েছে সুবিশাল বেগুনি আই পার্পল ইউ ভাস্কর্য এবং ছোট রাজপুত্র ও শিয়ালের সুন্দর ভাস্কর্য-সংবলিত ’পার্পল মুন’।
যদি যেতে চান, জেনে নিন
অবস্থান: সিনান কাউন্টি, দক্ষিণ জোল্লা প্রদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া। সিউল থেকে বাস বা গাড়িতে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৬ ঘণ্টা।
বিশেষ আকর্ষণ: দর্শনার্থীরা যদি বেগুনি রঙের পোশাক বা অনুষঙ্গ পরে যান, তবে নিখরচায় দ্বীপে প্রবেশের বিশেষ সুযোগ মেলে।
সুযোগ-সুবিধা: পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য রয়েছে ক্যাফে, ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ, সাইকেল রেন্টাল ও ছোট হোটেল।
সূত্র: ভিএন এক্সপ্রেস, দ্য কোরিয়া পোস্ট









