Ajker Patrika

হোটেলের ঘরে ঢুকে আমরা প্রথমে কী খুঁজি

ফিচার ডেস্ক
আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ২১
হোটেলের ঘরে ঢুকে আমরা প্রথমে কী খুঁজি
বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের নিয়ে করা গবেষণাতে দেখা যাচ্ছে, ঘরের পরিচ্ছন্নতা, আরাম, ওয়াই-ফাই, নিরাপত্তা এসব বিষয় তাঁদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ছবি: পেক্সেলস

দীর্ঘ ভ্রমণের পর অবশেষে হোটেলে পৌঁছানো। হাতে ভারী ব্যাগ, শরীরে ক্লান্তি, মাথায় একটাই চিন্তা—এবার একটু বিশ্রাম। রিসেপশনে চেক-ইন শেষ। হাতে রুমের কার্ড। দরজা খুলে ঘরে ঢোকার পর ব্যাগটা মেঝেতে রাখার আগেই চোখ ঘুরে বেড়ায় ঘরের এদিক-ওদিক।

বিছানা কোথায়? বাথরুম কোন দিকে? ওয়াই-ফাইয়ের পাসওয়ার্ড কী? ফোন চার্জ দেওয়ার সকেট আছে তো? জানালা দিয়ে বাইরে কী দেখা যায়?

মজার ব্যাপার হলো, হোটেলের ঘরে ঢুকে এসব খোঁজার অভ্যাস শুধু আপনার একার নয়। পৃথিবীর নানা দেশের পর্যটকদের মধ্যে এর মিল দেখা যায়। আর বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের নিয়ে করা গবেষণাতেও দেখা যাচ্ছে, ঘরের পরিচ্ছন্নতা, আরাম, ওয়াই-ফাই, নিরাপত্তা—এসব বিষয় তাঁদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমে বিছানা?

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হোটেলে পৌঁছানোর পর বিছানার দিকে তাকানো প্রায় স্বাভাবিক। কেউ চাদর ঠিক আছে কি না দেখেন, কেউ বালিশের অবস্থান পরীক্ষা করেন, আবার কেউ ব্যাগ নামিয়ে বিছানায় বসে পড়েন।

বুকিং ডটকমের এক আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, ভ্রমণের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ৬০ শতাংশ পর্যটক আবাসন ঘুরে দেখাকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করেন। আর ৩৬ শতাংশ বলেছেন, প্রথম দিনে তাঁরা বিছানা পরীক্ষা করেন—কেউ শুয়ে, কেউ আবার বিছানায় লাফিয়ে। একই জরিপে আরামদায়ক ম্যাট্রেসকে আবাসনের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত সুবিধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ৪৪ শতাংশ ভ্রমণকারী।

অর্থাৎ হোটেলে ঢুকে বিছানার দিকে ছুটে যাওয়া নিছক অলসতা নয়; ভ্রমণের ক্লান্ত শরীরের কাছে সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত জায়গা।

বাংলাদেশিরা অবশ্য পরিচ্ছন্নতা দেখেন আরও আগে ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৩৭৯ বাংলাদেশি ভ্রমণকারীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা হয়, তাঁরা হোটেল বেছে নেওয়ার সময় কোন বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেন।

গবেষণাটির ফল বেশ চমকপ্রদ। পাঁচ পয়েন্ট স্কেলে হোটেল ও কক্ষের পরিচ্ছন্নতার গড় গুরুত্ব ছিল ৪ দশমিক ৩২। কক্ষের আরামের গুরুত্ব ছিল ৪ দশমিক ২২ এবং বিছানা, ম্যাট্রেস ও বালিশের আরামের গুরুত্ব ৪ দশমিক ১০।

তাই হোটেলে ঢুকে প্রথমে বিছানার চাদর বা বাথরুমের পরিচ্ছন্নতা দেখে নেওয়া বাংলাদেশি পর্যটকের কাছে নিছক খুঁতখুঁতে আচরণ নয়। বরং গবেষণার তথ্য বলছে, পরিচ্ছন্নতা তাঁদের হোটেল-অভিজ্ঞতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

শুধু প্রয়োজনের জন্য নয়, বাথরুমের অবস্থা দেখে পুরো ঘর সম্পর্কে একটি ধারণাও তৈরি হয়।  ছবি:পেক্সেলস
শুধু প্রয়োজনের জন্য নয়, বাথরুমের অবস্থা দেখে পুরো ঘর সম্পর্কে একটি ধারণাও তৈরি হয়। ছবি:পেক্সেলস

তারপরই বাথরুম

দীর্ঘ বাসযাত্রা, ট্রেনযাত্রা কিংবা বিমান ভ্রমণের পর বাথরুমের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা খুবই স্বাভাবিক। তাই ঘরে ঢুকে অনেকে প্রথমে বাথরুমটি দেখে নেন।

কিন্তু শুধু প্রয়োজনের জন্য নয়, বাথরুমের অবস্থা দেখে পুরো ঘর সম্পর্কে একটি ধারণাও তৈরি হয়। তোয়ালে কোথায়, গরম পানি আসে কি না, সাবান-শ্যাম্পু আছে কি না—চোখ কয়েক সেকেন্ডে এসব তথ্য সংগ্রহ করে নেয়।

বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের গবেষণাতেও কক্ষের গন্ধ, পরিচ্ছন্নতা ও আরামকে আলাদা করে বিবেচনা করা হয়েছে। গবেষণায় কক্ষের গন্ধের গুরুত্বের গড় স্কোর ছিল ৪ দশমিক ৮।

অর্থাৎ দরজা খোলার পর নাকে যদি প্রথমে অস্বস্তিকর গন্ধ আসে, পুরো ঘর সম্পর্কে ধারণাটাই বদলে যেতে পারে।

ওয়াই-ফাই কোথায়?

একসময় হোটেলে ঢুকে মানুষ টেলিভিশনের রিমোট খুঁজত। এখন তার জায়গা নিয়েছে ওয়াই-ফাই।

ঘরে ঢুকে ফোন বের করা, নেটওয়ার্ক খোঁজা, পাসওয়ার্ড কোথায় লেখা আছে দেখা—এটি এখন অনেকের স্বাভাবিক রুটিন।

বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের ওপর করা গবেষণাটিও এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় হোটেলের সাধারণ সুযোগ-সুবিধার মধ্যে ওয়াই-ফাইয়ের গুরুত্বের গড় স্কোর ছিল ৫-এর মধ্যে ৪ দশমিক ১৯। আর কক্ষের ওয়াই-ফাইয়ের গুরুত্ব ছিল ৫-এর মধ্যে ৪ দশমিক ১২।

অর্থাৎ বাংলাদেশি পর্যটকের কাছে ওয়াই-ফাই এখন আর বিলাসিতা নয়; হোটেল-অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আন্তর্জাতিকভাবেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ইউগভের ২০২৩ সালের জরিপে ৭৯ শতাংশ ব্রিটিশ উত্তরদাতা বলেছেন, সাধারণ হোটেল রুমেও তাঁরা ওয়াই-ফাই এবং চা-কফির সুবিধা আশা করেন।

চার্জার লাগানোর জায়গা কোথায়?

হোটেলের ঘরে ঢুকে আধুনিক ভ্রমণকারীর আরেকটি অনুসন্ধান—সকেট।

ফোনের চার্জ ১৫ শতাংশ। পাওয়ার ব্যাংকও প্রায় শেষ। তখন বিছানার পাশে হাত বাড়িয়ে দেখা—সকেট আছে তো?

না থাকলে শুরু হয় অভিযান। টেবিলের নিচে, টেলিভিশনের পেছনে, ডেস্কের পাশে—যেখানে পাওয়া যায়, সেখানেই মোবাইল ফোন চার্জে বসানোর চেষ্টা।

কারণ ভ্রমণে মোবাইল ফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। টিকিট, মানচিত্র, ক্যামেরা, অনুবাদক, ব্যাংকিং—সবকিছুই এখন এই একটি যন্ত্রে। ফলে চার্জ শেষ হয়ে যাওয়া মানে অনেক সময় ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ অচল হয়ে যাওয়া।

জানালার ওপাশে কী?

হোটেলের ঘরে ঢুকে পর্দা সরানোর অভ্যাসটিও বেশ মজার।

সামনে সমুদ্র? পাহাড়? নদী? শহরের আলো?

নাকি কয়েক হাত দূরে আরেকটি ভবনের দেয়াল?

বিশেষ করে যে পর্যটক সমুদ্র বা পাহাড়ের দৃশ্য দেখার জন্য বেশি দাম দিয়ে ‘ভিউ রুম’ নিয়েছেন, তাঁর কাছে জানালার ওপাশের দৃশ্য ঘরের অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বুকিং ডটকমের জরিপে ৩৯ শতাংশ ভ্রমণকারী তাঁদের আবাসনে উপভোগ করার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সুন্দর দৃশ্যের কথা বলেছেন।

আলমারি খুলে দেখা

কয়েক রাত থাকার পরিকল্পনা থাকলে অনেকে ঘরে ঢুকে আলমারি খুলে দেখেন। হ্যাঙ্গার আছে কি না, সেফটি বক্স কোথায়, অতিরিক্ত কম্বল আছে কি না; এসব দেখে নেন অনেকে।

তবে এই জায়গা আবার ভ্রমণ শেষে সবচেয়ে বেশি জিনিস ফেলে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানও বটে।

পাসপোর্ট, চার্জার, ঘড়ি, গয়না—কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সেফটি বক্সে রেখে মানুষ হোটেল থেকে বেরিয়ে যান। পরে বিমানবন্দরে গিয়ে মনে পড়ে, ফেলে এসেছি তো!

মিনিবার: কৌতূহলের ছোট্ট বাক্স

হোটেলের মিনিবারও কম আকর্ষণীয় নয়। ভেতরে কী আছে—একটু দেখার ইচ্ছা হয় অনেকেরই।

সমস্যা হলো, মিনিবারে থাকা পানীয় বা খাবারের দাম সাধারণ দোকানের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। তাই ‘একটু দেখি’ থেকে শুরু করে ‘একটা খেয়েই ফেলি’ পর্যন্ত গেলে, বিলের পাতায় কৌতূহলের মূল্য দিতে হতে পারে।

টেলিভিশন চালানোও একধরনের স্বস্তি অচেনা ঘরে ঢুকে টেলিভিশন চালিয়ে দেওয়া অনেকের পুরোনো অভ্যাস।

কেউ সংবাদ দেখেন, কেউ সিনেমা, কেউ শুধু পরিচিত কোনো চ্যানেলের শব্দ চালু রাখেন।

এর মধ্যে একধরনের মানসিক স্বস্তি কাজ করতে পারে। নতুন জায়গায় পরিচিত শব্দ, দৃশ্য কিংবা অনুষ্ঠান ঘরটিকে কিছুটা পরিচিত করে তোলে।

আসলে আমরা কী খুঁজি—নিরাপত্তা না আরাম?

হোটেলের ঘরে ঢুকে আমাদের আচরণকে যদি একটু গভীরভাবে দেখা যায়, তাহলে বোঝা যায়, আমরা শুধু জিনিসপত্র খুঁজি না। আমরা খুঁজি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও আরাম।

অচেনা একটি ঘরে ঢুকে মস্তিষ্ক দ্রুত জানতে চায়—

কোথায় ঘুমাব?

বাথরুম কোথায়?

বের হওয়ার পথ কোন দিকে?

ফোন কোথায় চার্জ দেব?

আমার জিনিসপত্র কোথায় রাখব?

জানালা দিয়ে বাইরে কী দেখা যায়?

এই তথ্যগুলো জানা হয়ে গেলে অচেনা জায়গাটিও ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশি পর্যটকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কী?

বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের ওপর করা গবেষণাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। হোটেল বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল স্টাফ ও সেবার মান। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, তৃতীয় অর্থের সঠিক মূল্য, এরপর অবস্থান ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। গবেষণায় ৩৭৯ জন উত্তরদাতার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই ক্রম পাওয়া যায়।

হোটেল বা রিসোর্টের ঘরে ঢোকার পর আমরা হয়তো বিছানা, বাথরুম বা ওয়াই-ফাই খুঁজি। কিন্তু পুরো হোটেল-অভিজ্ঞতার বিচারে বাংলাদেশি পর্যটক আরও বড় কিছু খোঁজেন—ভালো ব্যবহার, নিরাপত্তা এবং টাকার সঠিক মূল্য।

তাহলে হোটেলে ঢুকে আমরা প্রথমে কী খুঁজি?

এই প্রশ্নে সবার উত্তর এক নয়।

কেউ খোঁজেন বিছানা।

কেউ বাথরুম।

কেউ ওয়াই-ফাই।

কেউ চার্জিং পয়েন্ট।

কেউ জানালার দৃশ্য।

আর কেউ হয়তো সোজা মিনিবার খুলে বসেন।

কিন্তু এসবের আড়ালে রয়েছে একটি সাধারণ চাহিদা—অচেনা জায়গাটিকে নিজের মতো করে নেওয়া।

হোটেলের ঘরে ঢোকার প্রথম কয়েক মিনিট আসলে ছোট্ট পরিচিতি পর্ব। কোথায় কী আছে বুঝে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভ্রমণকারীর মনও ধীরে ধীরে বলে ওঠে—এখন ঠিক আছে, এখানে থাকা যাবে।

আর সে কারণে হয়তো হোটেলের দরজা বন্ধ করার পরই দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি প্রথমবারের

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত