Ajker Patrika

সম্পর্কে গিল্ট ট্রিপিংয়ের শিকার? সঙ্গী অপরাধবোধে ভোগালে যেভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন

অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া
সম্পর্কে গিল্ট ট্রিপিংয়ের শিকার? সঙ্গী অপরাধবোধে ভোগালে যেভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন
সঙ্গী গিল্ট ট্রিপ দিলে তাঁর বারবার অন্যায় বা অযৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া বন্ধ করুন। ছবি: পেক্সেলস

সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। কিন্তু কখনো কখনো ভালোবাসার এই চাদরে জড়িয়ে পড়ে এক অদৃশ্য মানসিক চাপ, যার নাম গিল্ট ট্রিপিং। সহজ কথায়, নিজের কোনো ভুল না থাকা সত্ত্বেও সঙ্গীর কথাবার্তা বা আচরণের কারণে নিজের ভেতর একধরনের তীব্র অপরাধবোধ তৈরি হয়। এটি একধরনের সূক্ষ্ম মানসিক ম্যানিপুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ কৌশল।

অনেক সময় বুঝতেই পারি না যে আমরা গিল্ট ট্রিপিংয়ের শিকার হচ্ছি। ভালোবাসার মানুষের মুখভার কিংবা দুঃখী চেহারা দেখে ধরে নিই, ভুলটা হয়তো আমাদেরই ছিল। কিন্তু এই অপরাধবোধ যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন তা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গিল্ট ট্রিপের শিকার হয়ে নিজের অজান্তেই মানুষ নিজের আত্মবিশ্বাস হারাতে শুরু করে।

যদি সঙ্গী নিজের আচরণ পরিবর্তনে বিন্দুমাত্র আগ্রহী না হন, তবে নিজের মানসিক শান্তি ও ভবিষ্যতের স্বার্থে সম্পর্কটি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ছবি: পেক্সেলস
যদি সঙ্গী নিজের আচরণ পরিবর্তনে বিন্দুমাত্র আগ্রহী না হন, তবে নিজের মানসিক শান্তি ও ভবিষ্যতের স্বার্থে সম্পর্কটি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ছবি: পেক্সেলস

গিল্ট ট্রিপিং চেনার উপায়

সঙ্গী সরাসরি কোনো দোষ না দিয়েও আপনাকে অপরাধী বানাতে পারেন। যেমন আপনি বন্ধুদের সঙ্গে কফি খেতে যাচ্ছেন। কিন্তু সঙ্গী ঠিক বের হওয়ার আগেই আপনাকে একটা কাজ ধরিয়ে দিলেন। পরে করব জানালে তিনি হতাশের সুরে বললেন, ঠিক আছে। কাজটা জরুরি ছিল, কিন্তু তুমি তো বন্ধুদের সঙ্গে বের হচ্ছ, কী আর করা! অথবা কোনো বিষয়ে নিজের ভুল থাকলে তা স্বীকার না করে উল্টো বলা, তুমি যদি সেদিন ওভাবে কথা না বলতে, তাহলে আমি আজ এই ভুলটা করতামই না। এমনকি নীরবতাও গিল্ট ট্রিপের বড় অস্ত্র হতে পারে। কোনো কারণ না জানিয়ে দিনের পর দিন কথা বন্ধ রাখা বা এমন আচরণ করা যেন আপনি অনেক বড় কোনো অপরাধ করে ফেলেছেন। এটিও গিল্ট ট্রিপিংয়ের স্পষ্ট লক্ষণ।

অপরাধবোধে না ভুগে যা করতে পারেন

আবেগ ও বাস্তবতার পার্থক্য বুঝুন

সঙ্গী যখন আপনাকে কোনো বিষয়ে দায়ী করেন, তখন তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে একটু সময় নিন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আমি কি সত্যিই এমন কিছু করেছি, যা অন্যায়। নাকি আমাকে অপরাধী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আবেগ দিয়ে পরিস্থিতি বিচার না করে যুক্তির আলোতে বাস্তবতা যাচাই করা শিখুন।

নিজের সীমানা বা বাউন্ডারি স্পষ্ট করুন

সম্পর্কে ভালোবাসা থাকার মানে এই নয় যে আপনি নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেবেন। সঙ্গী গিল্ট ট্রিপ দিলে তাঁর বারবার অন্যায় বা অযৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া বন্ধ করুন। একবার আপনি চাপের মুখে পড়ে কোনো দাবি মেনে নিলে, সঙ্গী এটিকে আপনার দুর্বলতা ভেবে বারবার এই কৌশল ব্যবহার করবেন। শান্ত কিন্তু দৃঢ়ভাবে আপনার আপত্তি প্রকাশ করুন।

সরাসরি এবং স্পষ্ট ভাষায় কথা বলুন

সঙ্গীর আচরণ যে আপনাকে আঘাত করছে, তা তাঁকে স্পষ্ট করে জানান। তবে কথা বলার সময় আক্রমণের ভাষা ব্যবহার না করে নিজের অনুভূতির ওপর জোর দিন। যেমন তুমি সব সময় আমার খুঁত ধরো; এভাবে না বলে বলুন, তুমি যখন বিষয়টি নিয়ে বারবার কথা তোলো, তখন নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়, যা আমার ভালো লাগে না।

আত্মবিশ্বাসের চর্চা ও নিজের যত্ন

গিল্ট ট্রিপের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, এটি মানুষের আত্মবিশ্বাস ভেঙে চুরমার করে দেয়। তাই নিজের ভালো লাগার কাজগুলোতে মনোযোগ দিন। নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে বিশ্বাস করুন। বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের ইতিবাচক মানুষদের সঙ্গে সময় কাটান, যাঁরা আপনার আসল মূল্য মনে করিয়ে দেবে।

পেশাদারের সাহায্য ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

যদি দেখেন, সব চেষ্টা সত্ত্বেও সঙ্গী আপনাকে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপে রাখছেন এবং আপনার আত্মসম্মানবোধ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তবে এটি বিষাক্ত বা টক্সিক সম্পর্কের রূপ নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে একজন কাপল কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া জরুরি। আর যদি সঙ্গী নিজের আচরণ পরিবর্তনে বিন্দুমাত্র আগ্রহী না হন, তাহলে বুঝতে হবে, নিজের মানসিক শান্তি ও ভবিষ্যতের স্বার্থে সম্পর্কটি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। মনে রাখা জরুরি, সম্পর্ক আনন্দের হওয়া জরুরি, কোনো মানসিক কারাগার নয়। গিল্ট ট্রিপের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে দোষী ভাবার আগে মনে রাখুন—নিজের আত্মসম্মান রক্ষা করা কোনো অপরাধ নয়, বরং সুস্থ জীবনের অন্যতম পূর্বশর্ত।

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত