Ajker Patrika

দীর্ঘ সময় বসে থাকার ১০টি প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি, জেনে নিন প্রতিকার

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ১৭: ০৩
দীর্ঘ সময় বসে থাকার ১০টি প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি, জেনে নিন প্রতিকার
দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা আমাদের শরীরে মাথা থেকে পা পর্যন্ত মারাত্মক স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিসাধন করে। ছবি: পেক্সেলস

আমরা যখন বসি, তখন শরীর ও পেশিগুলো হাঁটা বা দাঁড়িয়ে থাকার তুলনায় অনেক কম শক্তি খরচ করে। আধুনিক জীবনযাত্রায় অনেকের বসে কাজ করতে হয়। অফিসে ডেস্ক জব, গাড়ি চালানো কিংবা স্ক্রিনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটানোর কারণে আমাদের দিনের একটি বড় অংশ বসেই কেটে যায়। আপাতদৃষ্টে এই আচরণ স্বাভাবিক মনে হলেও দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা আমাদের শরীরে মাথা থেকে পা পর্যন্ত মারাত্মক স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিসাধন করে। জেনে নিন, দীর্ঘ সময় বসে থাকার ১০টি প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা।

দীর্ঘ সময় বসে থাকার স্বাস্থ্যঝুঁকি

পা ও নিতম্বের পেশি দুর্বল হওয়া

সারা দিন বসে থাকলে শরীরের নিচের অংশের শক্তিশালী পেশিগুলোর ওপর কোনো চাপ পড়ে না। এর ফলে পেশির ক্ষয় বা ‘মাসল অ্যাট্রোফি’ ঘটে। নিতম্ব ও পায়ের এই স্থিতিশীল পেশিগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে শরীরে চোট বা আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

ওজন বৃদ্ধি ও ধীর মেটাবলিজম

শারীরিক নড়াচড়ার ফলে পেশি থেকে ‘লাইপোপ্রোটিন লাইপেজ’-এর মতো মলিকিউল নিঃসৃত হয়। এটি খাদ্যের চর্বি ও চিনি প্রক্রিয়াজাত করতে সাহায্য করে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে এই মলিকিউল কম উৎপন্ন হয়, যা মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অলস বসে থাকার সঙ্গে উচ্চ বিএমআই, কোমরের পরিধি বৃদ্ধি এবং ভিসেরাল ফ্যাট (অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের চারপাশে চর্বি জমা) বাড়ার সরাসরি সংযোগ রয়েছে, যা ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের অন্যতম কারণ।

কোমর, পিঠ ও নিতম্বে ব্যথা

একটানা বসে থাকলে হিল বাক্সর বা নিতম্বের পেশিগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে; বিশেষ করে সঠিক চেয়ার ব্যবহার না করলে বা বসার ভঙ্গি খারাপ হলে মেরুদণ্ডের ডিস্কগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং দীর্ঘস্থায়ী পিঠ ও কোমরব্যথা শুরু হয়।

উদ্বেগ ও বিষণ্নতা

বসে থাকার প্রভাব শুধু শরীরে নয়, মনেও পড়ে। যাঁরা শারীরিক সক্রিয়তার ন্যূনতম লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেন না, তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার ঝুঁকি যথাক্রমে ৮৯ থেকে ১৪৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে এই মানসিক ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।

ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি

অতিরিক্ত বসে থাকার ফলে শরীরে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং ক্রনিক ইনফ্লামেশন বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হতে পারে; যা টিউমার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাস জরায়ু, কোলন এবং ওভারিয়ান ক্যানসারের ঝুঁকি ২৫ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে দেয়।

হৃদ্‌রোগের আশঙ্কা

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পায়ে রক্ত জমে যায়। ফলে হার্টে রক্ত ফিরে আসার পরিমাণ কমে যায় এবং হার্টের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা ব্যাহত হয়; বিশেষ করে টেলিভিশনের সামনে দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস উচ্চ রক্তচাপ, করোনারি হার্ট ডিজিজ, হার্ট ফেইলিউর এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ডায়াবেটিসের জটিলতা

টেলিভিশনের সামনে দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ১৩৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। আর যাঁদের আগে থেকে ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই অলস জীবনযাপন স্ট্রোক এবং চোখের রোগের মতো মারাত্মক শারীরিক জটিলতা তৈরি করে।

ভ্যারিকোজ ভেইন

দীর্ঘ সময় পা ঝুলিয়ে বসে থাকায় পায়ে রক্ত জমে শিরাগুলো ফুলে ওঠে এবং চামড়ার ওপর দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। একে ভ্যারিকোজ বা স্পাইডার ভেইন বলে। এটি যেমন অস্বস্তিকর, তেমনি বিরল ক্ষেত্রে এর থেকে রক্ত জমাট বাঁধার মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে।

ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস

দীর্ঘ পথযাত্রায় বা একটানা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পায়ে রক্ত জমাট বেঁধে মারাত্মক ‘ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস’ হতে পারে। এই জমাট বাঁধা রক্তের অংশ যদি ভেঙে ফুসফুসে চলে যায়, তাহলে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে ‘পালমোনারি এমবোলিজম’ ঘটায়; যা একটি জরুরি চিকিৎসাধীন অবস্থা এবং এর ফলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

ঘাড় ও কাঁধ শক্ত হয়ে যাওয়া

কম্পিউটার বা ফোনের স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে ঘাড়, কাঁধ ও পিঠের ওপরের অংশে তীব্র টান পড়ে ও ব্যথা হয়। এই সমস্যা পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

যেভাবে নড়াচড়া শুরু করবেন

গবেষকদের মতে, যাঁরা দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি অলস বসে থাকেন, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি স্থূলতা ও ধূমপানের মতোই বিপজ্জনক। আশার কথা হলো, দৈনিক ৬০ থেকে ৭৫ মিনিটের মাঝারি ধরনের অ্যারোবিক শারীরিক ক্রিয়াকলাপ এই ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ থাকতে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরনের শারীরিক কসরত করা উচিত।

সহজ কিছু টিপস

  • প্রতি ৩০ মিনিট পরপর বসা থেকে উঠে দাঁড়ান এবং অন্তত ৫ মিনিটের জন্য একটু স্ট্রেচিং করুন বা হেঁটে আসুন।
  • ফোনে কথা বলার সময় বা টিভি দেখার সময় দাঁড়িয়ে থাকুন। অফিসে সম্ভব হলে ‘স্ট্যান্ডিং ডেস্ক’ বা উঁচু টেবিল কাউন্টার ব্যবহার করুন।
  • সহকর্মীদের সঙ্গে কনফারেন্স রুমে না বসে হাঁটতে হাঁটতে মিটিং বা আইডিয়া শেয়ার করতে পারেন।
  • টিভি দেখার সময় যখনই বিজ্ঞাপন বা কমার্শিয়াল ব্রেক দেবে, তখন সোফা থেকে উঠে ঘরের মধ্যে খানিকটা নড়াচড়া করুন।
  • গাড়ি বা বাইক গন্তব্য থেকে একটু দূরে পার্ক করুন, যাতে যাওয়া ও আসার পথে কিছুটা বাড়তি হাঁটার সুযোগ তৈরি হয়।
  • দৈনিক হাঁটার ধাপ বা স্টেপস ট্র্যাক করার জন্য এবং দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে সজাগ করার জন্য ফিটনেস ট্র্যাকার বা স্মার্টওয়াচের সাহায্য নিতে পারেন।

সূত্র: হেলথ লাইন, মায়ো ক্লিনিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত