Ajker Patrika

টিভি দেখার অভ্যাস নীরব ক্ষতি করছে মস্তিষ্কের

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
টিভি দেখার অভ্যাস নীরব ক্ষতি করছে মস্তিষ্কের
দৈনিক চার ঘণ্টা বা তার বেশি সময় টিভি দেখার অভ্যাস মস্তিষ্কজনিত জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ছবি: পেক্সেলস

দিনের কাজ শেষে বা অলস বিকেলে কাজ শেষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রিয় শো বা টিভি অনুষ্ঠান দেখা অনেকেরই অভ্যাস। তবে বিনোদনের এই সহজ মাধ্যমটি নিঃশব্দে আমাদের মস্তিষ্কের ক্ষতি করে চলেছে। আন্তর্জাতিক একাধিক গবেষণার ফলাফল সেই দিকেই বেশ আশঙ্কাজনক ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গবেষণায় যা উঠে এসেছে

দৈনিক চার ঘণ্টা বা তার বেশি সময় টিভি দেখার অভ্যাস মস্তিষ্কজনিত জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বিহেভিয়ারাল নিউট্রিশন অ্যান্ড ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি’-তে প্রকাশিত একটি গবেষণা। ‘ইউকে বায়োব্যাংক’-এর ডেটা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, যাঁরা দিনে এক ঘণ্টার কম টিভি দেখেন, তাঁদের তুলনায় যাঁরা চার ঘণ্টা বা তার বেশি টিভি দেখেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিনাশের ঝুঁকি ২৮ শতাংশ বেশি। এই ধরনের মানুষের বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশনের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ বেশি এবং পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি ১৬ শতাংশ বেশি। একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ’-এর অর্থায়নে পরিচালিত আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায়। ৪৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাঝবয়সে যাঁরা নিয়মিত ও অতিরিক্ত টিভি দেখতেন, দুই দশক পর তাঁদের মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যানে ভাষা ও চিন্তাশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলোর আকার তুলনামূলক ছোট পাওয়া গেছে। এমনকি তাদের মস্তিষ্কে ‘হোয়াইট ম্যাটার হাইপারইনটেনসিটি’র উপস্থিতি বেশি ছিল, যা মূলত ক্ষুদ্র রক্তনালির ক্ষতি ও স্নায়বিক ক্ষয়ের লক্ষণ।

কাজ আর টিভি দেখার পার্থক্য

যদি খেলা দেখা বা সিনেমা উপভোগ করার মাধ্যমে আমরা পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে পারি, তবে তা স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক। ছবি: পেক্সেলস
যদি খেলা দেখা বা সিনেমা উপভোগ করার মাধ্যমে আমরা পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে পারি, তবে তা স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক। ছবি: পেক্সেলস

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে, সব বসে থাকা কাজই কি সমান ক্ষতিকর? জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. লিয়ানা ওয়েনের মতে, বিষয়টিতে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। অফিসে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করার সঙ্গে টিভি দেখার একটি বড় পার্থক্য হলো মানসিক সক্রিয়তা। টিভি দেখা একটি প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয় কাজ। সেখানে মস্তিষ্ক শুধু তথ্য গ্রহণ করে। কিন্তু সেভাবে প্রসেস বা বিশ্লেষণ করে না। অন্যদিকে অফিসে বা কম্পিউটারে বসে কাজ করার সময় ই-মেইলের উত্তর দেওয়া, প্রজেক্ট সাজানো বা সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার মতো কাজে মস্তিষ্কের নেটওয়ার্কগুলো প্রতিনিয়ত সক্রিয় থাকে। এমনকি ইউকে বায়োব্যাংকের ডেটাতেও দেখা গেছে, দৈনিক ৩০ থেকে ৬০ মিনিট কম্পিউটারে মানসিকভাবে সক্রিয় কাজ করা মানুষদের মধ্যে ব্রেন-ডিসঅর্ডারের ঝুঁকি বেশ কম।

টিভি দেখার ক্ষতি পূরণ হবে কীভাবে

আমরা অনেকেই মনে করি, সকালে এক ঘণ্টা জিমে ব্যায়াম বা কসরত করে নিলে সারা দিন অলসভাবে সোফায় বসে কাটাতে কোনো বাধা নেই। বয়সের সঙ্গে শারীরিক সুস্থতা ধরে রাখতে এক্সারসাইজ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অলসভাবে নিষ্ক্রিয় স্ক্রিন টাইম কাটানোর ক্ষতি পুরোপুরি ব্যায়াম দিয়ে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। দৈনন্দিন শারীরিক চর্চার পাশাপাশি এমন নিষ্ক্রিয় অভ্যাস কমিয়ে আনা সমান জরুরি।

সমাধান কী

বিশেষজ্ঞরা টিভি দেখা সম্পূর্ণ বন্ধ করার পরামর্শ দিচ্ছেন না। ড. লিয়ানা ওয়েন জানিয়েছেন, আসল বিষয় হলো ভারসাম্য। যদি খেলা দেখা বা সিনেমা উপভোগ করার মাধ্যমে আমরা পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে পারি, তবে তা স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু টিভি দেখা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনবরত স্ক্রল করার চক্করে যদি আপনার খেলাধুলা, বই পড়া বা নতুন কিছু শেখার সময় নষ্ট হয়, তবে তা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

বার্ধক্যে মস্তিষ্ক চাঙা রাখার উপায়

দীর্ঘদিন ধরে অলস ও নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন না করে মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখাই আসল চাবিকাঠি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক সুস্থ রাখার উপায় আছে। প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় ছোট ছোট কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন ও সচেতনতার মাধ্যমে আমরা দশকের পর দশক ধরে আমাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে পারি।

  • মানসিকভাবে সক্রিয় থাকুন। নিষ্ক্রিয় স্ক্রিনটাইমের বদলে নতুন ভাষা শেখা, ধাঁধা মেলানো বা নতুন কোনো শখে মন দিন।
  • নিয়মিত শারীরিক চর্চা করার অভ্যাস করুন। এটি মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়।
  • সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করুন। একাকিত্ব ও বিষণ্নতা কাটাতে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান।
  • শারীরিক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করুন। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান বর্জন এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা দরকার।
  • নিয়মিত ফলমূল, শাকসবজি, বাদাম ও ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

সূত্র: সিএনএন, হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত