Ajker Patrika

স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে স্বর্ণপদক জিতেছেন তারেক

ইলিয়াস শান্ত, ঢাকা
আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১০: ৩৮
স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে স্বর্ণপদক জিতেছেন তারেক

নিয়মিত পরিশ্রম, শৃঙ্খলা আর শেখার প্রতি গভীর আগ্রহ—তিনটি বিষয় জীবনের মূল শক্তি হিসেবে ধারণ করে নিজের শিক্ষাজীবনকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন মো. তারেক হাসান। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) অষ্টম সমাবর্তনে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গোল্ড মেডেল অর্জন করেছেন তিনি।

এর আগেও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম সমাবর্তনে স্নাতক পর্যায়ে ভ্যালেডিক্টোরিয়ান ও গোল্ড মেডেলিস্ট হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। টানা দুই স্তরে সর্বোচ্চ সম্মান পাওয়ার এই কৃতিত্ব ইউআইইউর ইতিহাসে একটি বিরল দৃষ্টান্ত।

তারেক হাসান সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির অষ্টম সমাবর্তনে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তাঁর এই একাডেমিক যাত্রা শুরু হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, স্প্রিং-২০২৪ ট্রাইমেস্টারে। স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার পেছনে তাঁর বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন ইউআইইউর সিএসই বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মোতাহারুল ইসলাম। তাঁর উৎসাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা তাঁকে এই উচ্চতর শিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।

স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনার সময় নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট একটি মেজরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং কম্পিউটার সায়েন্সের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখা নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেছেন। প্রতিটি কোর্সই তাঁর কাছে ছিল নতুন কিছু শেখার সুযোগ। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণা ও বাস্তবভিত্তিক চিন্তাভাবনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এই কোর্সগুলো তাঁকে সহায়তা করেছে। তারেকের মতে, ‘কম্পিউটার সায়েন্স শুধু একটি বিষয় নয়, এটি চিন্তা করার একটি পদ্ধতি; যা সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলে।’

ফলাফলের দিক থেকেও তাঁর এই যাত্রা ছিল ব্যতিক্রমী। স্নাতক পর্যায়ে প্রতিটি কোর্সে তিনি ৪-এর মধ্যে ৪ জিপিএ অর্জন করেন। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে স্নাতকোত্তরেও তাঁর সিজিপিএ ছিল ৪। এই ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে তিনি ফুল স্কলারশিপে পড়াশোনার সুযোগ পান। তাঁর স্নাতকোত্তর থিসিসের বিষয় ছিল ডিপফেক ডিটেকশন; যা বর্তমান প্রযুক্তি জগতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং একটি গবেষণা ক্ষেত্র। ডিজিটাল দুনিয়ায় ভুয়া ভিডিও ও কনটেন্ট শনাক্ত করার এই গবেষণা ভবিষ্যতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। তারেকের কাছে এই পুরো যাত্রা শুধু ডিগ্রি অর্জনের গল্প নয়; বরং এটি শেখা, অনুসন্ধান, গবেষণা এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা।

মো.-তারেক-হাসান.jpg-২

এই সাফল্যের কৃতিত্ব তিনি কখনোই একা নিজের বলে মনে করেন না। জীবনের প্রতিটি ধাপে পাশে থাকা শিক্ষক, বন্ধু, সহকর্মী, সিনিয়র-জুনিয়র এবং পরিবারের সহায়তা আজকের এই অবস্থানে তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে; বিশেষ করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তারেকের পাশে ছিলেন স্ত্রী সুমায়েরা ইসলাম। তিনিও কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। ফলে তারেকের জটিল একাডেমিক আলোচনা, গবেষণাভিত্তিক ভাবনা এবং নানা আইডিয়ায় তিনি সহযোগিতা করেছেন। তাঁর বোঝাপড়া, সহমর্মিতা ও নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন এই দীর্ঘ যাত্রাকে অনেক সহজ ও মসৃণ করে দিয়েছে।

গোল্ড মেডেল পাওয়ার খবরে ছোট বোন ও বাবার আনন্দ এবং স্ত্রীর দৃঢ় বিশ্বাস তারেকের কাছে পরম প্রাপ্তি হয়ে থাকবে। খবর শুনে তাঁর বাবার বিস্ময়ভরা কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, ‘এ তো বিশাল খবর!’ আর স্ত্রী খবর শুনে দৃঢ় বিশ্বাসভরা কণ্ঠে বলেন, ‘আমি জানতাম তুমি পারবে।’ তারেক বলেন, এ ছোট প্রতিক্রিয়াগুলোই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

পড়াশোনার প্রস্তুতিতে তাঁর মূল শক্তি ছিল ধৈর্য, নিয়মানুবর্তিতা ও পরিকল্পনা। প্রতিটি বিষয়ে আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করে সময়মতো তা অনুসরণ করতেন। কোনো বিষয়ই হালকাভাবে নিতেন না। সময়ের সঠিক ব্যবহার, কঠোর নিয়ম মেনে চলা এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজের অভ্যাস তাঁকে প্রতিটি কোর্স গভীরভাবে আয়ত্ত করতে সাহায্য করেছে।

তারেক হাসানের শৈশব কেটেছে ঢাকার বুয়েট ক্যাম্পাস এলাকায়। বাবার চাকরির সুবাদে সেখানেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর হলেও পড়াশোনার শুরু গ্রিন লিভস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। পরে ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

মো.-তারেক-হাসান.jpg-৩

ছোটবেলা থেকে স্কাউটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বপ্ন ছিল আর্মি অফিসার হওয়ার। চোখের সমস্যার কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ না হলেও বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা করে নিজেকে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

বর্তমানে ইউআইইউতে ফ্যাকাল্টি হিসেবে কর্মরত তারেক হাসান। ভবিষ্যতে বিদেশে পিএইচডি সম্পন্ন করে দেশে ফিরে শিক্ষার্থীদের পাশে একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক হিসেবে থেকে যেতে চান। দেশের সিএসই খাতে এআই, ডেটা সায়েন্স, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার সিকিউরিটি, রোবোটিকস, বিজনেস অ্যানালিটিকসের মতো ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষ গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। তাঁর স্বপ্ন, নিজের দেশেই কাজ করা এবং দেশের মানুষের জন্য অবদান রাখা।

নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য তারেক হাসানের পরামর্শ হলো, সাফল্যের কোনো শর্টকাট বিষয় নেই। একজন শিক্ষার্থীকে অবশ্যই ক্লাসরুমের বাইরে অতিরিক্ত শেখার চেষ্টা, চিন্তাশীল মনোভাব এবং সমস্যা সমাধানের জন্য প্রবল ইচ্ছা থাকতে হবে। শুধু এআই টুলসের ওপর নির্ভর করলে শিক্ষার্থীরা নিজের দক্ষতা এবং শেখার সুযোগ হারিয়ে ফেলতে পারেন। তাই সব সময় চিন্তা, গবেষণা, পুনর্মূল্যায়ন এবং নিজের চেষ্টায় সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ধৈর্য, চিন্তাশীল মনোভাব ও নিয়মিত অনুশীলনই একজন শিক্ষার্থীকে অসীম সম্ভাবনার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত