Ajker Patrika

হারিয়ে যাওয়া সময়ের খোঁজে শাওন

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান 
হারিয়ে যাওয়া সময়ের খোঁজে শাওন

পুরোনো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে শাওনের প্রথম প্রশ্নটা সাধারণত হয়—এই বাড়িটা কত বছরের? কিন্তু প্রশ্নটা সেখানেই শেষ হয় না। বাড়িটির দরজা কে বানিয়েছিল, জানালার নকশা এমন কেন, এই সিঁড়িতে আলপনা আঁকা হয়েছিল কেন, একসময় এখানে কারা থাকতেন—এমন নানা প্রশ্ন তাঁকে টেনে নিয়ে যায় বাড়িটির ভেতরে, তারপর সেই বাড়ি ঘিরে থাকা মানুষ ও সময়ের গল্পের কাছে। হাতে ক্যামেরা নিয়ে চট্টগ্রাম ও পুরান ঢাকার পুরোনো বাড়ি, গলি ও স্থাপনা ঘুরে বেড়ান শাওন মোহাম্মদ তোফায়েল। হারিয়ে যেতে বসা এসব জায়গার ছবি তোলেন, খোঁজেন তাদের ইতিহাস, আর সেই গল্প ভিডিওর মাধ্যমে পৌঁছে দেন মানুষের কাছে।

743186284_2025619661414698_5113187088264198086_n

পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার শাওনের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নে। প্রকৌশল পেশার বাইরে তাঁর বড় পরিচয় এখন ড্রিমার্স প্ল্যানারের মানুষ হিসেবে। ফেসবুকে এই নামে তাঁর অনুসারী প্রায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার, ইউটিউবে মূল চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি। ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকেও রয়েছে তাঁর উপস্থিতি।

পুরোনো জায়গার প্রতি শাওনের আগ্রহের শুরুটা কোনো পরিকল্পিত প্রকল্প দিয়ে নয়। চট্টগ্রামের পি কে সেন সাততলা ভবন নিয়ে করা তাঁর প্রথম ভিডিওই তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়—পুরোনো ভবন শুধু ইট, কাঠ ও চুন-সুরকির স্থাপনা নয়; এর সঙ্গে মানুষের জীবন ও স্মৃতিও জড়িয়ে থাকে।

669864078_1319803163354784_5692213146496966897_n

সেই থেকে পুরোনো শহরগুলো অন্যভাবে দেখতে শুরু করেন শাওন। বিশেষ করে পুরান ঢাকা তাঁকে টানে দারুণভাবে। তাঁর কাছে পুরান ঢাকা শুধু আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, বিউটি বোর্ডিং বা নাজিরাবাজার নয়। এসব পরিচিত জায়গার বাইরে অসংখ্য গলি, পুরোনো বাড়ি, দরজা, বারান্দা ও স্থাপনা রয়েছে, যেগুলোর গল্প খুব বেশি মানুষের জানা নেই। তাঁর চোখে পুরান ঢাকা একটি জীবন্ত জাদুঘর। এই অচেনা গলি ও হারিয়ে যেতে বসা স্থাপত্যের গল্পই তিনি মানুষের সামনে আনতে চান।

তবে ক্যামেরা নিয়ে কোনো গলিতে ঢুকে পড়লেই তাঁর কাজ শেষ হয় না। একটি জায়গা নিয়ে ভিডিও করার আগে শাওন বই পড়েন, ইন্টারনেটে খোঁজ করেন, দেশি-বিদেশি গবেষণাপত্র দেখেন। এরপর সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় প্রবীণ ও পুরোনো বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন। লোকমুখে প্রচলিত গল্পও শোনেন। সেগুলোকে তিনি ভিডিও কনটেন্টে রূপ দেন।

559343246_1178460127489089_7732440953618985415_n

শাওনের ভিডিওর বৈশিষ্ট্য পুরোনো গান। পুরোনো বাড়িগুলোর ভিডিওতে তিনি জুড়ে দেন তিনি পঞ্চাশ-ষাট কিংবা আশির দশকের গান। দৃশ্যের সময়, পরিবেশ ও গতির সঙ্গে মিলিয়ে গান বেছে নেন। তাঁর কাছে পুরোনো গান দর্শককে পুরোনো দিনের আবহের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম।

এই কাজের দর্শকও কম নয়। বেচারাম দেউড়ি, উর্দু রোড, রাতের পুরান ঢাকা ও চট্টগ্রাম রেলওয়ে বিল্ডিং নিয়ে তাঁর ভিডিওগুলো লাখ লাখ মানুষ দেখেছে। এসব ভিডিওর কয়েকটি ১২ লাখ থেকে ২৫ লাখ পর্যন্ত দর্শক পেয়েছে। ফেসবুকেও তাঁর একাধিক ভিডিও মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে।

দর্শক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ড্রিমার্স প্ল্যানার এখন শুধু শখের জায়গায় নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মনিটাইজেশন, স্পনসরশিপ ও প্রমোশনাল প্রজেক্ট মিলিয়ে তাঁর গড় মাসিক আয় লাখ টাকার আশপাশে। অর্থাৎ পুরোনো বাড়ি ও গলি খুঁজে বেড়ানোর ব্যক্তিগত আগ্রহটি এখন তাঁর সৃজনশীল কাজের পাশাপাশি আয়েরও একটি পথ তৈরি করেছে।

520469368_1114483717220064_7022459310853631318_n

একটি কাঠের জানালা, লোহার গ্রিল, পুরোনো নামফলক কিংবা কোনো প্রবীণের মুখে শোনা গল্প—শাওনের কাছে সবই ইতিহাসের অংশ। সেই ইতিহাস হয়তো কোনো বইয়ে লেখা নেই, কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে আছে। আর সেই স্মৃতিগুলো হারিয়ে যাওয়ার আগেই ক্যামেরায় ধরে রাখা তাঁর কাজ। তাই চট্টগ্রাম কিংবা পুরান ঢাকার কোনো অচেনা গলিতে আজও তাঁকে ক্যামেরা হাতে হাঁটতে দেখা যায়। সামনে পুরোনো একটি বাড়ি, আর মাথায় নতুন কোনো প্রশ্ন—এই বাড়িতে কারা থাকতেন, এই গলির গল্প কী, সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলে গেল সবকিছু? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শাওনের পথচলা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত