Ajker Patrika

কাউটিয়ার শতবর্ষী বটগাছ

এ বি এম সিয়াম আহমেদ
কাউটিয়ার শতবর্ষী বটগাছ

বহুদিনের একটি ইচ্ছা পূরণ করার জন্য রওনা হলাম ঘিওরের কাউটিয়া গ্রামের পথে। গন্তব্য কালীগঙ্গা নদীতীরে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী একটি বটগাছ।

উত্তর-পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে কালীগঙ্গা। নদীর সেই চিরচেনা রূপের সমান্তরালে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন বটবৃক্ষ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজ পাতার এক আস্ত পাহাড় যেন চারপাশ আগলে রেখেছে। মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের কাউটিয়া গ্রামে দেখা মিলবে শতবর্ষী পুরোনো এই বটগাছের।

এর বয়স নিয়ে এলাকার মানুষের আছে নানান মত। কেউ বলেন, এর বয়স আড়াই শ বছরের বেশি; কেউ বলেন তিন শ বছর। তবে গাছটি যে শতবর্ষী, এ নিয়ে এলাকাবাসীর মতপার্থক্য নেই। প্রায় ৩ বিঘা খাসজমির ওপর এই প্রাচীন গাছ। লোকমুখে প্রচলিত আছে, বহু বছর আগে এক নারী পরম মমতায় গাছটি রোপণ করেছিলেন। স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তা দেলোয়ার জাহানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বটগাছটি নিয়ে এলাকার লোকজনের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মিথ বা পৌরাণিক বিশ্বাস। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন এই গাছের ডালপালা যদি কেউ ভাঙে, তাহলে সে কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়, এমনকি নির্বংশও হয়ে যেতে পারে! গাছটি যেন কেউ ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য এর নিচে সীমানাপ্রাচীর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।

এই বটতলা শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, এটি ধর্মীয় সম্প্রীতিরও এক অনন্য মিলনমেলা। এই বটগাছ ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিভিন্ন পূজার আয়োজন করেন। আবার মুসলিমরা এখানে বিভিন্ন ধরনের মানত নিয়ে আসেন। মাঝে মাঝে কিছু মানুষকে এই বটগাছের চারপাশে ঘুরে ঘুরে কোরাস গাইতেও দেখা যায়। গাছটি ঘিরে গড়ে ওঠা এক গ্রামীণ লোক-ঐতিহ্যের কথা জানালেন স্থানীয় বাসিন্দা কাজী লুৎফর রহমান রতন। তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, প্রায় এক দশক আগে এই এলাকায় হঠাৎ গো-মড়ক দেখা দিয়েছিল। সে সময় একের পর এক গরু-বাছুর মরে যেতে থাকে। এর পর থেকে গবাদিপশুর সুরক্ষার কথা চিন্তা করে প্রতিবছরের চৈত্র মাসে এই বটতলায় একটি বিশেষ শিরনির আয়োজন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গ্রামীণ ভাষায় এটি গাওয়াইলা শিরনি নামে পরিচিত।

শুধু লোকবিশ্বাসই নয়, স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই বটগাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশাল এই বৃক্ষ অসংখ্য লক্ষ্মীপ্যাঁচার নিরাপদ আবাসস্থল। রাতের বেলা ঘুরে বেড়ানো প্যাঁচারা ফসলের ক্ষতিকর পোকা দমনে অবদান রাখে। এ ছাড়া বটফল পাকলে এখানে বসে দেশি পাখির মেলা। বিপন্ন প্রজাতির হরিয়াল পাখিসহ নানা জাতের পাখির কিচিরমিচিরে তখন মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।

তীব্র গরমে বিশালাকৃতির এই বটগাছের নিচে লোকজন আসেন একটুখানি বিশ্রাম নিতে। যুগের পর যুগ ধরে সময় বদলে গেলেও গাছটি আগের মতোই ছায়া দিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখের সাক্ষী এই জায়গা তাই সবার কাছে কাউটিয়ার বটতলা নামে পরিচিত।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত