Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

ইচ্ছাশক্তি থাকলে কিছুই অসম্ভব নয়: সাইফুল ইসলাম শান্ত

ইচ্ছাশক্তি থাকলে কিছুই অসম্ভব নয়: সাইফুল ইসলাম শান্ত

হেঁটে বিশ্বভ্রমণ করছেন বাংলাদেশের সাইফুল ইসলাম শান্ত। ২০২৪ সালের ২২ মার্চ ঢাকা থেকে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন। গত ২২ মার্চ তাঁর হেঁটে বিশ্বভ্রমণের দুই বছর পূর্ণ হলো। বিভিন্ন দেশ ঘুরে তিনি এখন নেপালে। অনলাইনে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রজত কান্তি রায়

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৩৬

দুই বছর পার হয়ে গেল আপনার হেঁটে বিশ্বভ্রমণের। কী দেখলেন পথে পথে?

এই দুই বছর আমি স্বপ্নের জীবন যাপন করেছি। জানি না সামনে আর কত দিন এই জীবন চলবে। পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর মানুষের আচরণ ও সংস্কৃতি। আচরণের পার্থক্যই বিভিন্ন দেশকে বৈচিত্র্যময় করে আলাদা করেছে। আমি পথে পথে এসব মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, আন্তরিকতা এবং তাঁদের হৃদয় দেখেছি। পথের নানান প্রতিবন্ধকতা, অজানা ভয়, অজানা পথ—সবকিছুর মাঝেও দেখেছি অচেনা মানুষের নিঃস্বার্থ আন্তরিকতা। অনেক জায়গায় ভাষা বুঝিনি, কিন্তু কীভাবে যেন কথা হয়ে গেছে! কেউ কারও ভাষা বুঝতে পারছি না। কিন্তু কী বোঝাতে চাইছি, তা ঠিকই বুঝে গেছেন অন্যজন। উজবেকিস্তান আর তাজিকিস্তানে বিষয়টি খুব অদ্ভুত ভালো লেগেছে। তবে আমার চলার পথের প্রতিটি কদমে অসংখ্য গল্প দেখেছি। আরও দেখেছি, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বললেও তাদের আতিথেয়তা ও সহানুভূতি একই রকম। সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হচ্ছে, আমাদের পৃথিবীটা এখনো সুন্দর, যদি সেটাকে ভালোভাবে দেখি এবং সংরক্ষণ করি।

এই বিশ্বভ্রমণের ইচ্ছা কেন জেগেছিল?

ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিষয়ে অনার্স পড়েছি। এই দীর্ঘ চার বছর মানচিত্রের বইয়ে হাত বুলিয়েছি কতশতবার, তার হিসাব নেই। পৃথিবীটাকে যদি একবার কাছ থেকে দেখতে পারতাম! তখন কখনো সাহস হয়নি এভাবে পৃথিবীকে দেখতে চাওয়ার। কিন্তু একটা সময় এসে সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে পা বাড়িয়েছি অজানার পথে।

ইচ্ছা ছিল, ভ্রমণের সঙ্গে পরিবেশের জন্য কাজ করা; সেই থেকে যখন ২০১৮ সালে বান্দরবান জিরো পয়েন্ট থেকে হেঁটে থানচি পর্যন্ত গিয়েছিলাম, তখন উপলব্ধি করি, হেঁটে ভ্রমণের মাধ্যমে পরিবেশের জন্য কাজ করা যাবে। মানুষের খুব কাছে যেতে হেঁটে ভ্রমণ করা আদর্শ। তাই চেয়েছি, পৃথিবীর মানুষের কাছে একটা বার্তা দিতে—সেভ ট্রিজ, মিনিমাইজ গ্লোবাল ওয়ার্মিং। এই চিন্তা থেকে আমার যাত্রা শুরু। আমি চেয়েছি মানুষকে দেখাতে, একজন সাধারণ মানুষও বড় স্বপ্ন নিয়ে এগোতে পারে। এ কারণেই হেঁটে বিশ্বভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

জীবন কেমন উপভোগ করছেন?

আমি খুবই সাধারণ মানুষ। জীবন খুব অল্প সময়ের। এ মুহূর্তে প্রতিটি পদক্ষেপ উপভোগ করছি। প্রতিটি দিন, প্রতিটি সকাল শুরু হয় নতুন জায়গায়, নতুন মানুষের সঙ্গে। প্রতিদিন নতুন পথ, নতুন মানুষ, নতুন অভিজ্ঞতা—এটাই আমার আনন্দ। মনে করি, এই যাত্রাই আমাকে জীবনের প্রকৃত অর্থ শেখাচ্ছে—কমে সন্তুষ্ট থাকা এবং প্রতিটি মুহূর্ত অনুভব করা, মানুষকে সম্মান করা।

nepal

দেশে দেশে মানুষ এবং তাদের সংস্কৃতি কেমন?

একই পৃথিবী, অথচ কত পার্থক্য। মানুষের, ভাষার, সংস্কৃতির—সবকিছুতে কত পার্থক্য। এসব টিভির পর্দায় দেখা আর বাস্তবে দেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। প্রতিটি দেশ, প্রতিটি সংস্কৃতি আলাদা, কিন্তু মানুষের অনুভূতি এক। আমি দেখেছি, সব দেশেই গ্রামের মানুষ বেশি আন্তরিক। আমি বিভিন্ন দেশের খাবার, পোশাক, উৎসব এবং জীবনধারা কাছ থেকে দেখেছি। কোথাও ধর্মীয় বিশ্বাস বেশি, কোথাও আধুনিক জীবনধারা প্রবল। কিন্তু সব জায়গাই মানুষ তার নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

দেশে ফেরার ইচ্ছা এখনো আছে, নাকি নেই?

দেশ তো সব সময় হৃদয়ে। বাংলাদেশ আমার শিকড়, আমার শক্তি। পৃথিবী ভ্রমণ করতে যে অজানা পথে পা বাড়িয়েছি, সেটা এই যাত্রায় শেষ করে অবশ্যই দেশে ফিরতে চাই—নিজের গল্প, অভিজ্ঞতা আর শিক্ষা নিয়ে। তবে এখনো পথ শেষ হয়নি। সামনে আরও অনেক দেশ, অনেক গল্প অপেক্ষা করছে। সে কারণে আপাতত কোনো ইমার্জেন্সি ছাড়া দেশে ফিরতে চাই না। তবে দিন দিন ভিসা জটিলতা বাড়ছে, প্রশাসনিক কোনো সহায়তা নেই। একক চেষ্টায় এটুকু পথ এসেছি। জানি না কত দূর যেতে পারব। ভিসা জটিলতায় এক অনিশ্চয়তা সময় কাটছে। তবে এই যাত্রা এখনো শেষ হয়নি। আমার লক্ষ্য, পৃথিবীর ১৯৩টি দেশ হেঁটে ভ্রমণ করা। সেই লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চটা দিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে পথ চলতে চাই। তবে এ ক্ষেত্রে ভিসা জটিলতার সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা খুব প্রয়োজন।

যদি স্মরণীয় কিছু জানতে চাই, অনেক স্মৃতির মধ্য থেকে কোনটার কথা বলবেন?

হেঁটে কাঠমান্ডু থেকে এভারেস্ট বেসক্যাম্প। আমার এই বিশ্বভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় নেপালের কাঠমান্ডু থেকে এভারেস্ট বেসক্যাম্প পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া। পৃথিবীর ছাদে পৌঁছানোর স্বপ্ন অনেকে দেখেন। কিন্তু সেই স্বপ্নকে নিজের পায়ের শক্তিতে বাস্তবে রূপ দিতে পারা—এটি অন্য রকম এক সাহসের গল্প। এভারেস্ট বেসক্যাম্পের

ট্রেক নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এক নিরন্তর সংগ্রাম। যাত্রা শুরু করি কাঠমান্ডু থেকে। ব্যস্ত শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে যখন প্রথম পা বাড়াই, সামনে কী যে অপেক্ষা করছে, সেটি তো পুরোপুরি জানা ছিল না। প্রথম কয়েক দিন ছিল তুলনামূলক সহজ। সবুজ পাহাড়, ছোট ছোট গ্রাম, নদীর ধারে হাঁটা। প্রকৃতি যেন আমাকে স্বাগত জানাচ্ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে পথ কঠিন হতে শুরু করল। খাড়া উঁচু পথ, পাথুরে ট্রেইল আর প্রতিদিনের ক্লান্তি। যাত্রার একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উচ্চতা। আগের অভিজ্ঞতা বলতে, কাঠমান্ডু থেকে হেঁটে হেঁটে অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্পে যাওয়া। যত ওপরে উঠছি, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবে যেহেতু হেঁটে কাঠমান্ডু থেকে গিয়েছি, তাই আমার শ্বাসকষ্ট কমই হয়েছে। অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। পথে আবার শেরপাদের বিয়ের অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিলাম। গত ১৯ মার্চ আমি এভারেস্ট বেসক্যাম্পে পৌঁছাই। সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না! এই যাত্রা আমাকে মানসিকভাবে আরও শক্ত করে দিয়েছে। আমি বুঝেছি, মানুষের ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত