Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তুলতে দক্ষ শিক্ষক তৈরি করতে হবে

ড. মোহাম্মদ জুলফিকার আলী।

গ্রামের মেঠোপথ, বনবাদাড় আর কাদামাটির শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে বেড়ে ওঠা এক জীবন। তিনি লেখক, শিক্ষক ও সফট স্কিল প্রশিক্ষক ড. মোহাম্মদ জুলফিকার আলী। সংক্ষেপে ড. জে আলী। দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দেড় যুগের অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি দেশ-বিদেশে সফট স্কিল ও সেলস প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য লেখা তাঁর আত্ম-উন্নয়নমূলক বইগুলো পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বর্তমানে তিনি প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত। শিক্ষকতা, লেখালেখি ও প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, চাকরির প্রস্তুতি ও ক্যারিয়ার উন্নয়ন নিয়ে তিনি কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক খান

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ২০: ০৯

প্রশ্ন: ছোটবেলায় যে স্বপ্ন দেখতেন, তা কি পূরণ হয়েছে? আপনার জীবনের এই দীর্ঘ যাত্রা সম্পর্কে জানতে চাই।

ড. জে আলী: আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামে। মেঠোপথ, সরিষা ফুলের খেত, পাকা ধানের শিষে বাতাসে দোল খাওয়া এবং দূরে কোথাও বিয়েবাড়ির মাইকে ভেসে আসা বাংলা সিনেমার সেই পুরোনো গান শুনে। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঘরোয়া খেলাধুলা, গাছ থেকে মৌসুমি ফল পেড়ে খাওয়া—এসবই ছিল আমাদের দিনলিপি। স্কুল-কলেজ শেষ করেছি টাঙ্গাইলে। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়টাও ছিল স্মরণীয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষে ঢাকায় এসে কিছুদিন সেলস পেশায় কাজ করি। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করি। লেখালেখির অভ্যাস ছোটবেলা থেকে। এটি পেয়েছি বাবার কাছ থেকে। তিনি টাঙ্গাইলের শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্কুলজীবনে লেখা কবিতা প্রকাশিত হতো সাপ্তাহিক হক কথায়। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে গল্প, উপন্যাস ও মোটিভেশনমূলক লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘আপনি খুঁজছেন চাকরি কিন্তু নিয়োগকর্তা খুঁজছেন কী?’, ‘সফলতার প্রথম পাঠ’, ‘সফলতার দ্বিতীয় পাঠ–চাবুক’, ‘ইঁদুরের পকেট মানি’, ‘কিংবদন্তির নীরব ধন’, ‘স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট’। একপর্যায়ে শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। এরপর দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করেছি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে। সেখান থেকে স্কলার্স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিয়ে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেজারার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। প্রায় সাত বছর সেখানে কাজ করার পর ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিই। বর্তমানে এখানেই ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত আছি। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখি ও করপোরেট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।

প্রশ্ন: শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য লেখা আপনার বই ‘সফলতার প্রথম পাঠ’—আপনার মতে সফলতার প্রথম পাঠটি আসলে কী?

ড. জে আলী: আমাদের দেশের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ছাত্রজীবনে কীভাবে পড়াশোনা করলে ভালো ফল করা যায়, কর্মজীবনে কোন যোগ্যতাগুলো প্রয়োজন এবং কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণার অভাবে পিছিয়ে পড়ে। এই বইয়ে মূলত সেই বিষয়গুলোই তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি কর্মজীবনে কীভাবে সফল হওয়া যায়, বস ম্যানেজমেন্ট ও অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকার কৌশল নিয়েও দিকনির্দেশনা রয়েছে। এককথায়, ছাত্রজীবন থেকে কর্মজীবন পর্যন্ত সফলতার একটি সমন্বিত গাইডলাইন এই বই।

প্রশ্ন: পিছিয়ে পড়া ও হতাশাগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য লেখা ‘সফলতার দ্বিতীয় পাঠ—চাবুক’ বইটিতে মূলত কী বার্তা দিতে চেয়েছেন?

ড. জে আলী: ছাত্রজীবন মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের অনেক শিক্ষার্থী এই সময়টির গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করে না। তারা বড় স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সে অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেয় না। নিজের সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন না হয়ে তারা সময় ব্যয় করে মোবাইল ফোন, আড্ডা ও অনর্থক কাজে। অথচ পৃথিবীর সফল মানুষেরা ছাত্রজীবনেই কঠোর পরিশ্রম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে নিজেদের তৈরি করেছেন। এই বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করানো এবং নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করাই মূল উদ্দেশ্য।

প্রশ্ন: সেলস ও মার্কেটিং নিয়ে আপনার লেখা ‘ইঁদুরের পকেট মানি’—এই খাতে যাঁরা ক্যারিয়ার গড়ছেন বা গড়তে চান, তাঁদের জন্য বইটি কীভাবে সহায়ক?

ড. জে আলী: সেলস ও মার্কেটিং পেশায় কাজ করতে আগ্রহী বা ইতিমধ্যে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য এই বইটি সহায়ক। এখানে কীভাবে নিজেকে সেলস পেশার উপযোগী করে গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি করপোরেট পরিবেশে টিকে থাকার জন্য বস ম্যানেজমেন্ট, সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও পেশাগত সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়গুলোও আলোচিত হয়েছে। গ্রাহক পণ্য নয়, বিশ্বাস কেনে—এই বিশ্বাস কীভাবে তৈরি করা যায়, সেটিই বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রতিটি অধ্যায়ে বিক্রির বিভিন্ন কৌশল বাস্তব উদাহরণসহ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রশ্ন: ছাত্ররা কেন সৃজনশীল হচ্ছে না? কেন শুধু আজ্ঞাবহ কর্মী তৈরি হচ্ছে?

ড. জে আলী: সৃজনশীল জাতি গঠনের পূর্বশর্ত হলো সৃজনশীল মানুষ তৈরি করা, আর সৃজনশীল মানুষ তৈরির প্রধান কারিগর হচ্ছেন শিক্ষক। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীল শিক্ষক গড়ে তোলার প্রক্রিয়াটি উপেক্ষিত। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমত, সৃজনশীল শিক্ষক হতে হলে পাঠ্যবইয়ের বাইরে বিস্তৃত পড়াশোনা জরুরি। দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, বিজ্ঞানচিন্তা ও সমসাময়িক বিশ্ব সম্পর্কে ধারণা না থাকলে শিক্ষক কেবল তথ্য পরিবেশনে সীমাবদ্ধ থাকেন, চিন্তার অনুপ্রেরণা দিতে পারেন না। বাস্তবতা হলো, অনেক শিক্ষক পাঠ্যবইয়ের বাইরে খুব বেশি পড়াশোনা করেন না। ফলে শ্রেণিকক্ষ হয়ে ওঠে মুখস্থনির্ভর, প্রশ্নহীন ও একঘেয়ে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও একটি বড় কারণ। আমাদের দেশে শিক্ষক নিয়োগে একাডেমিক ফলের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ভালো ফল করা আর চিন্তাশীল হওয়া এক নয়। দীর্ঘদিন মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় এগিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা শিক্ষক হলে অনেক সময় সেই একই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের ওপর প্রয়োগ করেন। এতে প্রশ্ন করার মানসিকতা ও ভিন্নভাবে ভাবার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, আবার কেউ কেউ মনে করেন তাঁদের নতুন করে শেখার প্রয়োজন নেই। অথচ শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। যে শিক্ষক নিজে শেখার আগ্রহ হারান, তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও শেখার আগ্রহ তৈরি করতে পারেন না। চতুর্থত, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের কাঠামোও সৃজনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষককে কর্তৃত্বের প্রতীক এবং শিক্ষার্থীকে নীরব শ্রোতা হিসেবে দেখা হয়। এই পরিবেশে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে, ভুল করতে বা নতুন কিছু ভাবতে সংকোচ বোধ করে। অথচ সৃজনশীলতা বিকশিত হয় প্রশ্ন, অনুসন্ধান ও ভিন্ন চিন্তার মধ্য দিয়ে।

সবশেষে বলা যায়, যে ব্যবস্থায় সৃজনশীলতা চর্চার সুযোগ নেই, সেখান থেকে সৃজনশীল শিক্ষার্থী তৈরি হওয়া কঠিন।

পাঠ্যবইনির্ভর ও প্রশিক্ষণহীন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কেবল সীমিত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী তৈরি হয়।

পরিশেষে একজন শিক্ষক হিসেবে বলতে চাই—যদি আমরা সত্যিই সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, তবে আগে সৃজনশীল শিক্ষক তৈরি করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে ফলাফলের পাশাপাশি পড়ার অভ্যাস, চিন্তার গভীরতা ও শেখার আগ্রহ বিবেচনায় আনতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মুক্তচিন্তার পরিবেশ এবং আজীবন শেখার সংস্কৃতি গড়ে তুললেই শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

১২০ বছরে ৩৬ দেশের সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র, পরিণতি ভয়াবহ

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমছে না, প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা

তারেক রহমানের সঙ্গে শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের বৈঠক

ব্যবসায়ী নেতাদের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিল বিএনপি

প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা: বিকেলে নেওয়ার সিদ্ধান্তে দুশ্চিন্তায় পরীক্ষার্থীরা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত