Ajker Patrika

দাম্পত্য কলহ রোধে ইসলামের দিকনির্দেশনা

মুফতি ইবরাহীম আল খলীল
দাম্পত্য কলহ রোধে ইসলামের দিকনির্দেশনা

ইসলামি জীবনদর্শনে বিয়ের মাধ্যমে একটি পবিত্র দাম্পত্য সম্পর্কের সূচনা হয়। এই সম্পর্ক আজীবন অটুট থাকা এবং পারিবারিক সুখ বজায় রাখাই ইসলামের মূল লক্ষ্য। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিবাহবিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিচ্ছেদ শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কই শেষ করে না, বরং একটি সাজানো পরিবারকে তছনছ করে দেয় এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ বিপর্যস্ত করে তোলে।

দাম্পত্য জীবনে কেন ফাটল ধরে এবং কোরআন ও হাদিসের আলোকে এই সমস্যাগুলোর সমাধান কী, তা বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো।

দাম্পত্য জীবনে ভাঙনের প্রধান কারণসমূহ

বিবাহবিচ্ছেদ সাধারণত হঠাৎ ঘটে না; এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও পুঞ্জীভূত সমস্যার ফল। নানা কারণে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনার উদ্ভব ঘটে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো—

  • বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক: দাম্পত্যের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। পরকীয়া বা বিশ্বাসভঙ্গের কারণে একবার আস্থা নষ্ট হলে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ এটি।
  • হকের অবহেলা: স্বামী ও স্ত্রীর একে অপরের প্রতি যে ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব (হক) রয়েছে, তা যথাযথভাবে আদায় না করা হলে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়।
  • আস্থার অভাব ও সন্দেহ: একে অপরকে সব সময় সন্দেহের নজরে দেখা বা কোনো কাজে বিশ্বাস না করা, পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে দেয়।
  • শ্রদ্ধাবোধের অভাব: ভালোবাসা থাকলেও শ্রদ্ধা না থাকলে সংসার টেকে না। কথায় কথায় অপমান করা বা অবমূল্যায়ন করা সম্পর্কের আয়ু কমিয়ে দেয়।
  • পারিবারিক সহিংসতা: শারীরিক, মানসিক কিংবা অর্থনৈতিক নির্যাতন সহ্য করা দীর্ঘ মেয়াদে অসম্ভব। আত্মসম্মান ও নিরাপত্তার স্বার্থে একপর্যায়ে বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
  • যৌনজীবনে অসন্তুষ্টি: দাম্পত্যের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনার অভাব বা দীর্ঘদিনের অসন্তুষ্টি সম্পর্ককে শীতল করে দেয়।
  • অর্থনৈতিক টানাপোড়েন: দারিদ্র্য নিজে থেকে সব সময় বিচ্ছেদ ঘটায় না, কিন্তু অভাব থেকে সৃষ্ট ঝগড়া ও মানসিক চাপ দাম্পত্যে ফাটল ধরায়।
  • সন্তানদের নিয়ে মতানৈক্য: সন্তানের শিক্ষা, শাসন বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর তীব্র মতভেদ অনেক সময় বিচ্ছেদ ডেকে আনে।
  • মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগ: মাদকাসক্তি কিংবা ব্যক্তিত্বগত মানসিক সমস্যা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়।

দাম্পত্য-সংকট নিরসনে ইসলামের সমাধান

ইসলাম শুধু অধিকারের কথা বলে না, বরং কর্তব্যের ওপরও জোর দেয়। বিচ্ছেদ রোধে ইসলামের কিছু অনন্য সমাধান নিচে তুলে ধরা হলো—

  • পারস্পরিক অধিকারের স্বীকৃতি: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘স্ত্রীদেরও ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের প্রতি স্বামীদের অধিকার রয়েছে।’ (সুরা বাকারা: ২২৮)। অর্থাৎ শান্তি বজায় রাখতে উভয়কে একে অপরের অধিকার সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
  • পর্যায়ক্রমিক সংশোধন পদ্ধতি: যদি সম্পর্কে ফাটল ধরার আভাস পাওয়া যায়, তবে ইসলাম সরাসরি বিচ্ছেদের পরামর্শ দেয় না। স্বামী প্রথমে বুঝিয়ে সমাধানের চেষ্টা করবেন। তাতে কাজ না হলে শয্যা ত্যাগ করা এবং সতর্ক করার মতো পদক্ষেপ নিতে পারেন।
  • সালিস বা মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ: নিজেদের মধ্যে মীমাংসা না হলে দুই পরিবার থেকে অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত দুজন সালিস নিযুক্ত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা করলে তার (স্বামীর) পরিবার থেকে একজন ও তার (স্ত্রীর) পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত করবে। তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন।’ (সুরা নিসা: ৩৫)

তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে ইসলামের সর্বশেষ পর্যায়, যা শুধু চরম অনিবার্য প্রয়োজনেই বৈধ করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু তা আলোচনার মাধ্যমে এবং প্রয়োজনে দুই পরিবারের হস্তক্ষেপে মিটিয়ে ফেলাই ইসলামের নির্দেশনা। পারস্পরিক সম্মান এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে যেকোনো দাম্পত্য জীবন দীর্ঘস্থায়ী ও সুখের হতে পারে।

লেখক: সহকারী শিক্ষাসচিব, মাদ্রাসা আশরাফুল মাদারিস, তেজগাঁও, ঢাকা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত