Ajker Patrika

হাজিদের সেবায় এক মহীয়সী নারীর অমর কীর্তি

আরওয়া তাসনিম
হাজিদের সেবায় এক মহীয়সী নারীর অমর কীর্তি

মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশি চিরে বয়ে যাওয়া এক দীর্ঘ পথরেখা। ইতিহাসের পাতায় যা ‘দর্বে জুবাইদা’ বা ‘জুবাইদা পথ’ নামে অম্লান হয়ে আছে। কয়েক শতাব্দী ধরে এই পথটি ছিল হজে গমনেচ্ছুদের পরম ভরসা, সংস্কৃতির সেতুবন্ধ আর বিশ্ব বাণিজ্যের এক ব্যস্ততম করিডর।

এক মহীয়সী নারীর কীর্তি

এই রাজকীয় পথের নামকরণের নেপথ্যে রয়েছেন আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশিদের বিদুষী পত্নী জুবাইদা বিনতে জাফর। তাঁরই বিশেষ উদ্যোগে ও পৃষ্ঠপোষকতায় এই প্রাচীন পথটি সংস্কার এবং আধুনিক অবকাঠামোয় সজ্জিত করা হয়। তৎকালীন এটি ছিল প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য উদাহরণ, যা বৈরী মরু পরিবেশেও হাজিদের সেবা নিশ্চিত করতে গড়ে তোলা হয়েছিল।

ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও মানচিত্র

ইরাকের কুফা থেকে শুরু হওয়া এই পথটি উম্মুল কুরুন, আশ-শারাফ এবং আল-আকবার মতো গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত স্টেশন পার হয়ে সৌদি আরবের বর্তমান রাফহা অঞ্চলে প্রবেশ করে। উত্তর সীমান্ত থেকে মক্কা পর্যন্ত বিস্তৃত এই দীর্ঘ পথটির দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটারের বেশি। এটি সৌদি আরবের বর্তমান পাঁচটি অঞ্চল—উত্তর সীমান্ত, হাইল, আল-কাসিম, মদিনা মুনাওয়ারা এবং মক্কা মোকাররমা—কে সংযুক্ত করেছে।

জাহেলিয়াত থেকে আব্বাসীয় যুগ

এই পথের ইতিহাস ইসলামের আবির্ভাবের চেয়েও পুরোনো। প্রাক্‌-ইসলামি যুগে এটি ছিল স্রেফ একটি বাণিজ্যিক কাফেলা পথ। তবে খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলে এর গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে এবং উমাইয়া শাসনের পথ ধরে প্রথম আব্বাসীয় আমলে (৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) এটি পূর্ণ জৌলুশ ফিরে পায়।

পথটির প্রতিটি বাঁকে ছিল রাজকীয় আতিথেয়তার ছাপ। প্রায় ২৭টি প্রধান স্টেশন এবং সমসংখ্যক উপ-স্টেশন নিয়ে গঠিত ছিল এই পথ। প্রতিটি বড় স্টেশনের মাঝামাঝি ছিল বিশ্রামাগার, জলাধার (বারকা), বাঁধ, মসজিদ এবং জমজমাট বাজার। পর্যটক ও ইতিহাসবিদ ইবনে জুবায়ের, ইবনে বতুতা থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের ইউরোপীয় পরিব্রাজক লেডি অ্যান ব্লান্ট পর্যন্ত সবাই এই পথের স্থাপত্যশৈলীর প্রশংসা করেছেন।

মরুভূমির প্রকৌশল বিস্ময়

দর্বে জুবাইদার সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল এর জলধারা ব্যবস্থাপনা। বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢল সংরক্ষণের জন্য নিখুঁত জ্যামিতিক নকশায় খনন করা হয়েছিল বৃত্তাকার, বর্গাকার ও আয়তাকার বিশাল সব বারকা বা জলাধার। বালুময় বা কর্দমাক্ত পথে কাফেলার যাত্রা সহজ করতে পাথর দিয়ে বাঁধানো হয়েছিল দীর্ঘ রাস্তা।

পথের দিশা দিতে খলিফা আবু আব্বাস আল-সাফফাহর আমলে নির্মাণ করা হয়েছিল ‘আলাম’ বা পাথুরে মিনার। প্রায় তিন মিটার উঁচু এই মিনারগুলো অন্ধকার রাতে আগুনের আলো বা দিনের আলোয় দিকচিহ্ন হিসেবে হাজিদের পথ দেখাত।

স্মৃতির মিনারে অবিনশ্বর উত্তরাধিকার

১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তাতারদের হাতে বাগদাদের পতনের পর এই পথের গুরুত্ব কমতে শুরু করে। অযত্ন আর কালের বিবর্তনে অনেক স্টেশন আজ ধ্বংসস্তূপ। তবু মরুভূমির বুকে জেগে থাকা প্রাচীন কুয়া আর পাথুরে বাঁধগুলো আজও সেই সোনালি যুগের মুসলিম স্থপতিদের মেধার সাক্ষ্য দিচ্ছে। আধুনিক সৌদি আরবে বাদশাহ আবদুল আজিজ থেকে শুরু করে বর্তমান বাদশাহ সালমানের আমলে এই ঐতিহাসিক রুটটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ধর্ষক মসজিদের ইমাম নয়, বড় ভাই—ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় শনাক্ত

ইলন মাস্কের শুক্রাণু নিয়ে চার সন্তানের জন্ম দেন সহকর্মী জিলিস

অনলাইন জুয়ার দেড় কোটি টাকার ভাগ-বণ্টন নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের পর সরকারি কর্মচারীর আত্মহত্যা

এমএলএ বাগিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা বিরোধীদের, বিজয়ের দলের বিধায়কদের গণপদত্যাগের হুমকি

১২ মে থেকে শপিং মল-দোকানপাট খোলা রাখার নতুন সময় নির্ধারণ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত