Ajker Patrika

রাবেয়া বসরি: আল্লাহর প্রেমে আত্মনিবেদিত আধ্যাত্মিক নক্ষত্র

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আন নোমান আরীফী
আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২: ২৬
রাবেয়া বসরি: আল্লাহর প্রেমে আত্মনিবেদিত আধ্যাত্মিক নক্ষত্র
ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

সুফিবাদ বা আধ্যাত্মিক সাধনার ইতিহাসে এক বিস্ময়ের নাম হজরত রাবেয়া বসরি (রহ.)। তিনি নিজের জীবনকে গড়ে তুলেছিলেন ‘ইশকে এলাহি’ বা খোদাপ্রেমের এক জীবন্ত শিক্ষাগার হিসেবে। ধনসম্পদ, বৈভব এমনকি জান্নাতের লোভ বা জাহান্নামের ভয়ও তাঁর ইবাদতকে প্রভাবিত করতে পারেনি। তিনি খুঁজেছিলেন কেবল প্রভুর সন্তুষ্টি।

জন্ম ও দাসত্ব থেকে মুক্তি

রাবেয়া বসরি ৭১৪ থেকে ৭১৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বসরায় এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে চরম অভাবের সময় তিনি অপহৃত হন এবং ক্রীতদাসী হিসেবে বিক্রি হন। কিন্তু তাঁর গভীর ধার্মিকতা এবং অলৌকিক কৃপায় মুগ্ধ হয়ে মালিক তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। এরপর তিনি বসরায় নিভৃতচারী জীবন শুরু করেন, যেখানে হজরত মালিক ইবনে দিনার ও সুফিয়ান সাওরির মতো পীর-মাশায়েখগণ তাঁর কাছে আধ্যাত্মিক শিক্ষার জন্য আসতেন।

নিঃস্বার্থ ইবাদত: জান্নাতের লোভ বা জাহান্নামের ভয় নয়

রাবেয়া বসরির আধ্যাত্মিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল আল্লাহর ভালোবাসা। তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, কেন তিনি জান্নাতের আশায় বা জাহান্নামের ভয়ে ইবাদত করেন না?

রাবেয়া বসরি জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি যদি জাহান্নামের ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করি, তবে আমি একজন হীন শ্রমিকের মতো হব। আর যদি জান্নাতের আশায় ইবাদত করি, তবে আমি হব এক লোভী বান্দা। আমি ইবাদত করি শুধু তাঁর ভালোবাসা এবং সন্তুষ্টির জন্য।’

রাবেয়া বসরির আবেগঘন সেই দোয়া

রাতের নির্জনতায় তিনি যখন আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করতেন, তাঁর শব্দগুলো হৃদয়ে নাড়া দিত। তিনি বলতেন—‘হে প্রভু, তারকাসমূহ আকাশে জ্বলজ্বল করছে, মানুষের চোখ নিদ্রিত, বাদশাহগণ তাদের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রত্যেক প্রেমিক এখন তার প্রিয়তমের সঙ্গে নিভৃতে মগ্ন, আর আমি এখানে একাকী শুধু তোমার সঙ্গে।’

বিশেষ দ্রষ্টব্য: জান্নাতের আশা বা জাহান্নামের ভয়ে ইবাদত করা ইসলামি শরিয়তে দোষণীয় নয়, তবে রাবেয়া বসরির এই উক্তিটি ছিল তাঁর পরম প্রেমের উচ্চমার্গীয় প্রকাশ।

সুফিবাদের উচ্চতায় পৌঁছানোর রহস্য

কীভাবে তিনি আধ্যাত্মিকতার এত উচ্চ শিখরে পৌঁছালেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দুটি বিষয় বলেছিলেন—

  • ১. অনর্থক বিষয় ত্যাগ: যা আমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় বা আখিরাতে কাজে আসবে না, তা বর্জন করা।
  • ২. চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব: নশ্বর পৃথিবীর মানুষের বদলে অবিনশ্বর আল্লাহর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করা।

নবীপ্রেম ও স্রষ্টার প্রতি অনুরাগের সমন্বয়

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা নিয়ে তিনি বলতেন—‘আমি নবীজি (সা.)-কে অবশ্যই ভালোবাসি, কিন্তু স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা আমার হৃদয়ে এমনভাবে পূর্ণ হয়ে আছে যে সেখানে অন্য কারও জন্য আলাদা জায়গা নেই। আমি স্রষ্টাকে ভালোবাসার মাধ্যমেই তাঁর সৃষ্টিকে ভালোবাসি।’

রাবেয়া বসরির অমর বার্তা

৮০১ খ্রিষ্টাব্দে রাবেয়া বসরি মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর জীবন আজও আধ্যাত্মিক সাধকদের জন্য আলোকবর্তিকা। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত নিঃস্বার্থ প্রেম। তাঁর ভাষায়—

‘হে পরম প্রিয়,

তোমাকে ছাড়া আমার সব আকাঙ্ক্ষা ম্লান,

তোমার সান্নিধ্যই আমার একমাত্র ধ্যান।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত