Ajker Patrika

শাহ সুলতান মাহমুদ বলখি মাহিসাওয়ার (রহ.)

বলখের শাসক থেকে মহাস্থানগড়ের সাধক

মো. আজিজুল হক
বলখের শাসক থেকে মহাস্থানগড়ের সাধক
ছবি: সংগৃহীত

হজরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখি (রহ.)-এর প্রকৃত নাম মীর সুলতান মোহাম্মদ। তিনি ছিলেন তৎকালীন আফগানিস্তানের বলখ (পারস্য সাম্রাজ্যের বাকট্রিয়া প্রদেশের রাজধানী) রাজ্যের প্রতাপশালী সম্রাট শাহ আলী আসগরের সন্তান। পিতার ইন্তেকালের পর উত্তরাধিকারসূত্রে শাহজাদা সুলতান মাহমুদকেই বলখের সিংহাসনে আসীন করা হয়। কিন্তু তাঁর অন্তর ছিল ভোগবিলাস ও পার্থিব ক্ষমতার মোহমুক্ত। অত্যন্ত সাদামাটা ও আধ্যাত্মিক জীবনযাপনের আকর্ষণে তিনি বিশাল সাম্রাজ্যের মায়া ত্যাগ করে দামেস্কে পাড়ি জমান এবং সেখানে কামেল অলি শায়খ তৌফিক (রহ.)-এর সান্নিধ্যে আধ্যাত্মিক শিক্ষায় ব্রতী হন।

দীর্ঘদিন দামেস্কে আধ্যাত্মিক সাধনায় লিপ্ত থাকার পর, পীর শায়খ তৌফিক তাঁকে বাংলায় ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেন। গুরুর আদেশে তিনি সমুদ্রপথে বাংলার উদ্দেশে যাত্রা করেন। বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসারে যে কয়েকজন বরেণ্য সুফি সাধক ও দরবেশ অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে শাহ সুলতান মাহমুদ বলখি (রহ.) অন্যতম।

সন্দ্বীপ থেকে মহাস্থানগড়: এক দীর্ঘ সাধনার পথ

আফগানিস্তান থেকে আগত এই মহান সাধক প্রথমে গঙ্গা নদীর মোহনায় অবস্থিত সন্দ্বীপে অবতরণ করেন। এরপর তিনি হরিরামপুর নগরে পৌঁছান। তৎকালীন সেই উপকূলীয় এলাকার শাসক ছিলেন কালী উপাসক রাজা বলরাম। শাহ সুলতানের দাওয়াতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বলরামের এক মন্ত্রীও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রাজা বলরাম ইসলাম প্রচারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। পরিস্থিতি বাধ্য করায় শাহ সুলতান জিহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হন এবং প্রবল সংঘর্ষে রাজা বলরাম নিহত হন।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

পুণ্ড্রনগরে পরশুরামের পতন ও ইসলামের প্রসার

ইতিহাসের পাতায় মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। প্রাচীনকালে এটি পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামে পরিচিত ছিল। আড়াই হাজার বছর প্রাচীন এই জনপদটিকে ২০১৬ সালে সার্কের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ ঘোষণা করা হয়। এই ঐতিহাসিক নগরীর সর্বশেষ স্বাধীন হিন্দু রাজা ছিলেন নরসিংহ, যিনি ইতিহাসে ‘পরশুরাম’ নামেই সমধিক পরিচিত।

পরশুরাম ছিলেন কট্টর ইসলামবিদ্বেষী। তাঁর শাসনামলে মুসলিমদের ওপর নির্মম অত্যাচার চলত। কথিত আছে, বোরহান উদ্দিন নামে এক নিঃসন্তান মুসলিম দীর্ঘ প্রার্থনার পর একটি পুত্রসন্তান লাভ করেন। আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ে তিনি একটি গরু জবাই করে সন্তানের আকিকা দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পরশুরাম বোরহান উদ্দিনের পরিবারের সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করেন।

এই চরম জুলুমের পর বোরহান উদ্দিনের আর্তনাদে সাড়া দিয়ে, মহান আল্লাহর ইচ্ছায় পুণ্ড্রনগরে শাহ সুলতানের আগমন ঘটে। তিনি শিষ্যদের নিয়ে ফকিরবেশে করতোয়া নদীপথে একটি মাছ আকৃতির বিলাসবহুল নৌকায় (বজরা) মহাস্থানগড়ে এসেছিলেন। এ জন্য তাঁর নামের সঙ্গে ‘মাহিসাওয়ার’ (মাছের পিঠে আরোহণকারী) উপাধি যুক্ত হয়। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে তিনি সত্যিই এক বিশাল মাছের পিঠে চড়ে করতোয়া পাড়ি দিয়েছিলেন, যা ছিল তাঁর অন্যতম কেরামত।

মহাস্থানগড়ে পৌঁছে তিনি রাজা পরশুরামসহ সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। দলে দলে মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে শুরু করলে পরশুরাম চরম ক্রোধান্বিত হয়ে শাহ সুলতানকে হত্যার নির্দেশ দেন। শুরু হয় এক অসম যুদ্ধ। কিন্তু সেই যুদ্ধে দাম্ভিক রাজা পরশুরামের শোচনীয় পরাজয় ও মৃত্যু ঘটে। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে তাঁর বোন শীলাদেবী করতোয়া নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সেই স্থানটি আজও ‘শীলাদেবীর ঘাট’ নামে পরিচিত।

শেষ বিশ্রামস্থল ও দর্শনীয় স্থান

শাহ সুলতানের ইন্তেকালের সঠিক তারিখ জানা না গেলেও, ধারণা করা হয় বাংলা সনের কোনো এক বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার তিনি ইন্তেকাল করেন। মহাস্থানগড়ে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের আমলে এই দরগাকে খাজনামুক্ত ঘোষণা করা হয় এবং মাজারে ‘বুড়িকা দরজা’ নামে একটি বিশেষ প্রবেশদ্বার নির্মিত হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত